.
২৬.
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তখন ভাইদের সঙ্গে বিশাখ-যুপ নামে একটি বনে বাস করছেন। এই কিছুদিন আগে অর্জুন মহাদেবকে তুষ্ট করে পাশুপত অস্ত্র নিয়ে, ইন্দ্র-ভবন ঘুরে বাড়ি ফিরেছেন। সবার মনে তাই ভারি খুশি খুশি ভাব। মধ্যম পাণ্ডব ভীম তো আনন্দে শিকার করতেহবেরিয়ে পড়েছেন। সুস্থ এবং স্বাস্থ্য-সমুজ্জ্বল উদ্দাম বালকের মধ্যে যে অফুরন্ত প্রাণশক্তি থাকে, সেই প্রাণশক্তিই দুষ্টুমির আকার নেয়। সেই দুষ্টুমি যেমন কোনওভাবেই বালক চেপে রাখতে পারে। না, ভীমের অতিলৌকিক শক্তিও তেমনই তাকে কিছুতেই চুপ করে বসে থাকতে দেয় না। তিনি এ বনে-সে বনে হরিণ-বরাহ মেরে, গাছ উপড়ে, ডাল ভেঙে সমস্ত বনভূমি যেন তোলপাড় করে তুললেন। হিমালয় সন্নিহিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যুধিষ্ঠিরকে যেখানে আরও নিবিষ্ট করে রেখেছে, সেখানে ওই একই সৌন্দর্য ভীমকে আরও পাগল করে তুলেছে। বৃক্ষভঙ্গ, পশুমারণের সঙ্গে সঙ্গে তার কখনও দৌড়ানো, কখনও দাঁড়ানো, কখনও হাততালি কখনও বা বিনা কারণে গর্জনও চলছে-চিৎ প্ৰধাবংস্তিষ্ঠংশ্চ কুচিচোপবিশংস্তথা।
বনের পথে চলতে চলতে ভীম মহাবনে এসে পৌঁছলেন। সেখানে গুহার মধ্যে দেখলেন এক বিশাল অজগর সাপ। বিশাল তার শরীর, বিচিত্রবর্ণ, মুখখানা বড় এবং তামাটে। ক্ষণিকের মধ্যে সেই অজগর ভীমকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ভীমের নড়বার শক্তিও রইল না। ভীম নিজের অসহায়তায় নিজেই অবাক হলেন। মহাসর্পকে বললেন–আপনি কোনও দেবতার বরলাভ করেছেন, নাকি কোনও বিদ্যা জানা আছে আপনার কিছু বিদ্যাবলং কিছু বরদানমথো তব? নইলে রাক্ষস, পিশাচ, নাগ–কেউই আমার শক্তি সহ্য করতে পারে না। সেখানে আমি চেষ্টা করেও আপনাকে কিছুই করতে পারছি না।
সর্প বলল– ভাগ্যবশে আজ তুমি আমার আহার নির্দিষ্ট হয়েছ। তবে সত্যিই আমি আসলে কোনও সাপ নই। ব্রাহ্মণের অভিশাপে আজ আমার এই অবস্থা। এবারে ভীমকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে অজগর মনুষ্যকণ্ঠে বলল- আমি তোমারই পূর্বপুরুষ। রাজর্ষি নহুষের নাম তোমার কানে এসে থাকবে। আমি তোমার বহু পূর্বপুরুষ আয়ুর পুত্র নহুষ–তবৈব পূর্বঃ সর্বেষামায়োর্বংশধরঃ সুতঃ।
ভীম এই মহাসর্পের হাত থেকে মুক্তি পাননি এবং জীবন সম্বন্ধে এই সময়ে তার মুখ দিয়ে রীতিমতো দার্শনিক কথাবার্তা বেরিয়েছে। ভীম ফিরছেন না দেখে যুধিষ্ঠিরকে ওই সর্পগুহায় উপস্থিত হতে হয়েছিল। রক্ষার উপায়-চেষ্টাহীন ভীমকে সর্পবেষ্টিত অবস্থায় দেখে যুধিষ্ঠিরের মনেও ওই একই প্রশ্ন উদয় হল–আপনি কি দেবতা, দৈত্য, নাকি সত্যিই এক মহাসর্প? অজগরের দিক থেকে আবারও সেই একই উত্তর–আমি ষ। তোমারই পূর্বপুরুষ। ভগবান চন্দ্র থেকে পঞ্চম পুরুষ আমি নহুষ, আয়ুর পুত্র–প্রথিতঃ পঞ্চমঃ সোমাদার্টেঃ পুত্রো নরাধিপ। যজ্ঞ, দান, তপস্যা এবং আপন বিক্রমে এই তিন ভুবনের অধিকার লাভ করেছিলাম। তারপর ব্রাহ্মণের অভিশাপে আমার এই অবস্থা। তবে সাপই হই, আর যাই হই, আমার মাথাটা কিন্তু ঠিক আছে। পূর্বের স্মৃতি আমার কিছু নষ্ট হয়নি।
যুধিষ্ঠির বেশি বিস্তারের মধ্যে যাননি। কবে, কোথায়, কেন–এ সব প্রশ্নে তার অভীষ্টসিদ্ধিতে বড় দেরি হয়ে যাবে। সর্প তার সর্পত্বের কারণ বলেছে সংক্ষেপে। যুধিষ্ঠির আর কিছু শুনতে চান না। প্রিয় ভাইটিকে তার বাঁচাতে হবে এবং বাঁচানোর উপায় একটিই। সর্প বলেছে– যদি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পার তবেই তোমার ভাই মুক্তি পাবে আমার হাত থেকে। যুধিষ্ঠির কালবিলম্ব না করে বলেছেন– রূহি সর্প–আপনি বলুন। চেষ্টা করে দেখি, যদি আপনার প্রীতি হয় তাতে অপি চেয়াং প্রতিমাহর্তুং তে ভুজঙ্গম।
কিন্তু এই মহাসর্পের প্রশ্ন বড় অদ্ভুত। তার জিজ্ঞাসা- ব্রাহ্মণ কাকে বলে? যুধিষ্ঠির যখন পূর্বে ইন্দ্রপ্রস্থে রাজত্ব করেছেন অথবা এখন যে বনবাসে আছেন অথবা তার জন্ম থেকে এই বনবাসের বয়স পর্যন্ত তিনি কম ব্রাহ্মণ দেখেননি। ব্রাহ্মণের চরিত্র, গুণ এবং হৃদয় কেমন হবে, সে সম্বন্ধে তার শাস্ত্রীয় এবং ব্যবহারিক জ্ঞানও কিছু কম নেই। এখানে লক্ষণীয় বিষয় আছে আরও দুটি। যিনি প্রশ্ন করেছেন ব্রাহ্মণ কাকে বলে–ব্রাহ্মণঃ কো ভাবে রাজন্–তিনি পূর্বসংস্কারে চন্দ্রবংশীয় রাজা হলেও এখন নাগ-জনজাতির একতম পুরুষ প্রায় শূদ্রসংজ্ঞক। যাকে তিনি প্রশ্ন করছেন তিনি আগে রাজা ছিলেন এবং এখন তিনি বনবাসের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট। উপরন্তু এখন তার নাচার অবস্থা। তার ভাইকে এই মহাস আটকে রেখেছে। ভাইয়ের মুক্তিপণ এই প্রশ্ন–ব্রাহ্মণ কাকে বলে আগে বলুন।
একজন রাজা হিসেবে যুধিষ্ঠিরের সবচেয়ে বেশি সংস্রব ঘটেছে ব্রাহ্মণদের সঙ্গে। জাতি হিসেবে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় একে অন্যতরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ জাতি। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের চেয়ে উচ্চবর্ণ বটে, কিন্তু মহাভারতের সময়ের রাজনীতি এবং সমাজের রীতিতে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সব সময় ওঠা-বসা, বিবাহ, একে অপরের বৃত্তি গ্রহণ–সবই চলে। অতএব অন্য সময়ে যদি যুধিষ্ঠিরের কাছে এই প্রশ্ন আসত তবে ব্রাহ্মণমাত্রেরই প্রশংসা বেরুত তার মুখ দিয়ে। কিন্তু এখন তাঁর সময় ভাল নয়। তার ভাই অসীম বলশালী বৃকোদর এই মহাসর্পের আক্রমণে নিষ্ক্রিয়। তাঁকে বাঁচাতে হবে–অতএব তার অভিজ্ঞতায় এবং মননে সবচেয়ে নিরপেক্ষ উত্তরটি এই সময়েই বেরিয়ে আসবে।
