সৈরিন্ধ্রী মেকলা পাঁচকের হাতে শিশুপুত্র দিয়ে রাজাদেশ জানাল। পাঁচক কঠিন নিষ্ঠুর মানুষ, রাজার ভোজনের জন্য সে বহু প্রাণী জবাই করেছে নিজের হাতে। আয়ুপুত্র ছোট্ট শিশুটিকে কাটার জন্যও সে খঙ্গ উঠিয়েছিল। কিন্তু খঙ্গ উঁচু করতেই নিরীহ অবোধ শিশুর মুখে ভেসে উঠল মধুর এক ঝলক হাসি। শিশুর মুখে মিষ্টি হাসি দেখে পাঁচক-ঠাকুরের মন একেবারে গলে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সৈরিন্ধ্রী মেলা। সুন্দর, অসাধারণ সুন্দর আয়ুপুত্রের শিশু-মুখখানিতে ফুটফুটে অবোধ হাসিরভেচ্ছতা দেখে মেকলা-সৈরিষ্ক্রীর মন বিচলিত হল। সে পাঁচককে সাবেগে অনুরোধ জানাবাচ্চাটাকে মেরো না, ঠাকুর। না জানি এমন দিব্যলক্ষণসম্পন্ন ছেলে কার ঘরে জন্মেছে
পাঁচক সৈরিন্ধ্রী মেলার কথা শুনল এবং দুজনেই মায়াপরবশ হয়ে আয়ুর শিশুপুত্রটিকে রক্ষা করল সযত্নে। রাত্রি আঁধার হয়ে এল। হুণ্ড-দৈত্য রাতের খাবার খাবে। পাঁচক-ঠাকুর নিজে হাতে একটি হরিণ মেরে নিয়ে এল। সেই হরিণের মাংস রান্না করে হৃত শিশুর মাংস বলে হু-দৈত্যকে খেতে দিল। এদিকে রাজ-অন্তঃপুরের সৈরিন্ধ্রী মেকলা শিশুটিকে কোলে। নিয়ে রাতের অন্ধকারে পথ চলতে চলতে বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে পৌঁছল। সমস্ত আশ্রম তখন শান্ত সুপ্ত। মেলা বশিষ্ঠ-মুনির কুটীর-দ্বারে শিশুটিকে শুইয়ে দিয়ে চলে এল নিজের বাড়িতে।
হরিণের মাংস খেয়ে হুণ্ড ভাবল নহুষকে সে খেয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে বশিষ্ঠ মুনি কুটীর-দ্বারে পরিত্যক্ত নহুষকে পরম আদরে তুলে নিলেন মানুষ করার জন্য। তিনি ধ্যানযোগে জানতে পারলেন মহাত্মা আয়ুর পুত্র তাঁর আশ্রমে পরিত্যক্ত হয়েছেন। তিনিই আয়ুর শিশু-পুত্রের নাম রাখলেন নহুষ। তিনি বলেছিলেন–বালক অবস্থাতেও তোমাকে, হুষিত করা যায়নি অর্থাৎ পরাভূত করা যায়নি বলেই তোমার নাম হল নহুষ হুষিতে নৈব কেনাপি বালভাবৈ নরাধিপ। বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে মানুষ হতে থাকলেন আয়ুপুত্ৰ নহুষ। শুধু বেদবিদ্যাই নয়, অন্য সমস্ত শাস্ত্র এবং অস্ত্র-শস্ত্রের সমস্ত কৌশল শিখে নহুষ অদ্বিতীয় ধনুর্ধর হয়ে উঠলেন।
যেদিন আয়ুর বাড়ি থেকে নহুষ হারিয়ে গেলেন, সেদিন থেকেই নহুষের মা ইন্দুমতীর দিন আর কাটে না। এতদিন তিনি পুত্রহীনা ছিলেন, সেও এক রকম ছিল। কিন্তু পুত্ৰমুখ দেখার পর সে পুত্র হারিয়ে গেলে কোন জননী সইতে পারেন? রানি চোখের জল রাখতে পারেন না। দিন-রাত তিনি শুধু কাঁদেন আর ভাবেন কবে তাঁর ছেলে ফিরে আসবে। ওদিকে নহুষ মানুষ হচ্ছেন বশিষ্ঠের বাড়িতে। বঙ্কাল পরে ইন্দুমতীর ঘরে এসে উপস্থিত হলেন দেবর্ষি নারদ। সেকালের দিনে সংবাদ পাওয়ার সবচেয়ে বড় উৎস ছিলেন মুনি-ঋষিরাই। তারা যজ্ঞ-দান উপলক্ষে অন্য মুনি-ঋষিদের আশ্রমে যেতেন, আর যেতেন ভারতবর্ষের নানা তীর্থক্ষেত্রে। সংবাদ জোগাড় হয়ে যেত স্বাভাবিক ভাবেই। নারদ এসে ইন্দুমতাঁকে বললেন–তার ছেলে বশিষ্ঠের বাড়িতে মানুষ হচ্ছে। তার জন্য কোনও চিন্তা নেই। নারদ আস্তে আস্তে অশোকসুন্দরীর প্রাণান্তক তপস্যার কথা, হুণ্ড-দৈত্যের চক্রান্ত এবং নহুষের শক্তিধর হয়ে ওঠার সমস্ত বিবরণ দিলেন ইন্দুমতাঁকে। তিনি আশ্বস্ত হলেন এই ভেবে যে, তার প্রিয় পূত্রটি আবার ফিরে আসবে–আগমিষ্যমাজ্ঞায় নহুষং তনয়ং পুনঃ।
নহুষ বশিষ্ঠের আশ্রমে অস্ত্রশিক্ষা এবং বিদ্যাশিক্ষায় দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, তিনি চন্দ্রবংশীয় মহারাজ আয়ুর পুত্র এবং ইন্দুমতী তার জননী। একদিন বশিষ্ঠ নহুষকে আদেশ দিলেন-বাছা। বনে যাও তো একবার। ফলমূল যা পাও নিয়ে এসো। নহুষ গেলেন বনে। সেখানে গিয়ে তিনি শুনতে পেলেন–কারা যেন বলছে–এই নহুষ হলেন আয়ুর ছেলে। এই ছেলের জন্য কেঁদে কেঁদে মরছেন এর জননী ইন্দুমতী। শিবসুতা অশোকসুন্দরী তপস্যা করছেন এই নহুষের জন্যই। সব শুনে নহুষ ফলমূল নিয়ে উপস্থিত হলেন বশিষ্ঠের আশ্রমে এবং সত্য যাচাই করে নিলেন মুনির কাছে। মুনি প্রথম থেকে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন নহষকে এবং তাকে প্ররোচিত করলেন- হুণ্ড-দৈত্যকে বধ করে তপস্বিনী অশোকসুন্দরীকে উদ্ধার করার জন্য।
নহুষ ইন্দ্রদত্ত রথে চড়ে রওনা দিলেন কার্যসিদ্ধির জন্য। অশোকসুন্দরীর সঙ্গেই তার প্রথম দেখা হল। তারপর হুশু-দৈত্যকে হত্যা করে নহুষ অশোকসুন্দরীকে সঙ্গে নিয়ে বশিষ্ঠের আশ্রমে এলেন। সেই আশ্রমেই বিধিমতো তাদের বিয়ে-থা হয়ে গেল। নহুষ এবার নব বিবাহিতা বধুকে নিয়ে পৌঁছলেন বাবা-মায়ের কাছে। মহারাজ আয়ু এবং ইন্দুমতীর আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল স্নেহে, মানে, দানে। বীর পুত্রের সাহায্যে আয়ু তার পিতৃদত্ত রাজ্য আরও সুদৃঢ় করে নিলেন। বয়স পরিপক্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দান-যজ্ঞ, ব্ৰত-নিয়মেই আয়ুর দিন কাটতে লাগল। তারপর যখন মৃত্যু ঘনিয়ে এল আয়ু-ইন্দুমতীর জীবনে, তখন চন্দ্রবংশের অধস্তন নহুষই রাজা হলেন।
আরও একবার জানাই, নহুষের জন্মলগ্নেই লৌকিক-অলৌকিক নানা ঘটনার এই বিচিত্র উপন্যাস মহাভারতে নেই। বরং মহাভারতে চন্দ্রবংশের অধস্তন হিসেবে নহুষই বোধহয় প্রথম ব্যক্তিত্ব, যার মধ্যে চন্দ্র কিংবা বুধের দেব-ধর্ম নেই, অতিলৌকিক জগতের সঙ্গে পুরূরবার যে মিলন-সাংকর্য, তাও নেই। ঐল পুরূরবার পুত্র আয়ু ধর্মাত্মা পুরুষ নির্বিরোধী ব্যক্তিত্ব। রাজা হিসেবে তিনি বিরাট কিছু ছিলেনও না। কিন্তু নহুষ পরম বিক্রান্ত রাজা। এমন একজন রাজার জন্ম-বৃত্তান্ত একেবারে সামান্য এবং লঘু-জনোচিত হবে– এ কথা পুরাণকারেরা ভাল করে মানতে পারেননি। নহুষের খ্যাতি এবং প্রতিপত্তির নিরিখে আমরাও পৌরাণিকদের বৃত্তান্ত এখানে লিপিবদ্ধ করলাম এবং তা করলাম এইজন্যে যে, এরমধ্যে নহুষের জন্মের মাহাত্মের থেকেও ঐল পুরূরবার পুত্র আয়ুর সন্তানের তপস্যাটাই মূল্যবান। কৃতী সন্তানের জনক হিসেবে আয়ু যে মোটেই কোনও অধমাধম ব্যক্তিত্ব নন, সেটা বোঝনোর জন্যই এই নহষ-কাহিনীর অবতারণা।
