আগেই বলেছি–পুরূরবার পুত্র আয়ু ছিলেন ধর্মাত্মা। দান-যজ্ঞ, ব্রত-হোমেই তার দিন কেটে যেত। কিন্তু ধর্ম-কর্ম, রাজকার্যে অনেক ধ্যান দিয়েও তার মন ভাল থাকে না। তিনি পুত্রহীন। যাকে তিনি বিবাহ করেছেন তিনি যথেষ্টই সুলক্ষণা রমণী এবং স্বামীর উপযুক্তা সহধর্মিণী। মহাভারতে তার নাম স্বর্ভাবী। এটা ঠিক নাম নয়, এর মানে তিনি স্বর্ভানু রাজার কন্যা। পৌরাণিকেরা তাকে কেউ ইন্দুমতী বলে ডেকেছেন, কেউ বা ডেকেছেন প্রভা বলে। নাম যাই হোক, আয়ুপত্নী স্বর্ভানবীর কোলে ছেলে নেই–রাজা-রানির তাই বড় দুঃখে দিন কাটে। পুত্রলাভের জন্য নানা প্রযত্ন করেও যখন আয়ুর ছেলে হল না, সেই সময়ে একদিন তিনি দত্তাত্রেয় মুনির আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন।
মহর্ষি দত্তাত্রেয় অত্রির পুত্র এবং অনেক পুরাণেই তাকে ভগবানের অংশ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেকালের মহর্ষি-দেবর্ষিদের মধ্যে অনেক সময়েই লোকাতীত মহিমা এবং ঐশ্বর্যের সঙ্গে ইন্দ্রিয়-পরায়ণতা এবং তথাকথিত অসংযমের সংমিশ্রণ দেখা যেত। লোক-সংস্রব ত্যাগ করার জন্যই হোক অথবা স্বেচ্ছাকৃতই হোক, এই অশোভন অসংযম তাদের অন্তর বিচলিত করত না। ভারতবর্ষে সাধু-মহাত্মাদের এই লোক-জুগুঙ্গিত আচরণ অনেকভাবে দেখা যায়। যাঁর যেরকম দৃষ্টি। মহারাজ আয়ু ঘুরতে ঘুরতে মহর্ষি দত্তাত্রেয়র আশ্রমে এসে দেখলেন–তিনি স্ত্রী-পরিবৃত হয়ে বসে আছেন। তার চক্ষু দুটি মদিরারুণ। তিনি হাসছেন, গাইছেন মোদো-মাতাল লম্পটের মতো–গায়তে নৃত্যতে বিপ্রঃ সুরাঞ্চ পিবতে শম্। কাঁধে-ঝোলা যজ্ঞোপবীত খুলে পড়ে গেছে কখন, বেশ-ভূষাও মোটেই মুনিজনোচিত নয়। মহর্ষি দত্তাত্রেয়র এ কী রূপ?
রাজা আয়ু শ্রদ্ধা হারালেন না। তিনি সমাহিতচিত্তে মুনিকে প্রণাম করলেন। মুনি রাজার সঙ্গে একটাও কথা বললেন না। সদাচার আতিথ্য সব যেন তিনি ভুলে গেছেন। দেশের রাজা এসেছেন তার কাছে–এসব কথা গ্রাহ্য না করে, তাকে অনাদর করেই যেন তিনি মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বিলাস ছেড়ে ধ্যানমগ্ন হলেন। রাজা কোনও কথা বলারই সুযোগ পেলেন না। রাজা বহুদিন সেই আশ্রমে বসে থাকলেন- কবে মুনির ধ্যান ভাঙবে সেই আশায়। বসেই রইলেন, বসেই রইলেন, মুনি তবু নির্বিকারচিত্ত, ধ্যানমগ্ন। বহুদিন পর দত্তাত্রেয় মুনির বাহ্যজ্ঞান ফিরে এল। তখনও রাজা তার আশ্রমে বসে আছেন দেখে মুনি বললেন–মহারাজ! আপনি কেন এত কষ্ট করছেন? ব্রাহ্মণের আচার আমি কিছুই পালন করি না। নারী-সঙ্গ, সুরাপান এবং মাংস-ভক্ষণ আমার অন্তরঙ্গ বিলাস। আপনাকে কোনও বর দেওয়ার শক্তিও আমার নেই। আপনি বরং উপযুক্ত অন্য কোনও মহৎ ব্রাহ্মণের শুশ্রূষা করুন–বরদানে ন মে শক্তিরন্যং শুশ্রূষ ব্রাহ্মণ।
আয়ু বললেন–মুনিবর! আপনার থেকে শ্রেষ্ঠতর কোনও ব্রাহ্মণ আমার জানা নেই। আপনাকে সাক্ষাৎ ভগবান বলে আমি মনে করি। দত্তাত্রেয় রাজার কথায় একটুও বিচলিত না হয়ে বললেন–তাহলে আমার কথা শোন–যে আমার এই নর-কপালের পাত্রে মদ এনে দাও, আর রান্না-করা মাংস নিয়ে এসো আমার জন্য–কপালে মে সুরাং দেহি পাচিতং মাংসভোজন। রাজা অসীম শ্রদ্ধায় কালবিলম্ব না করে মুনিকে সুরা-মাংস এনে দিলেন। দত্তাত্রেয় ভেবেছিলেন–অনাচার-কু-আচার করতে দেখলেই রাজার ভক্তি নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু স্থিরচিত্ত আয়ু সব কাজ সমাধা করলেন দ্বিধাহীনভাবে, সশ্রদ্ধে।
দত্তাত্রেয় খুশি হলেন এবার। বললেন–বর চাও, রাজা! তোমার যা মনে চায়, বলো। রাজা বললেন–আমার একটি পুত্র চাই, মুনিবর! সর্বজ্ঞ সর্বগুণান্বিত দেব-দানবের অজেয় একটি পুত্র চাই-পুত্রং দেহি গুণেপেতং সর্বজ্ঞং গুণসংযুত। মুনি রাজরানি ইন্দুমতাঁকে দেবার জন্য রাজার হাতে একটি ফল দিলেন আর বললেন–যেমন চেয়েছ, সেইরকম অমিত শক্তিধর পুত্র লাভ করবে তুমি। সে হবে ইন্দ্রের তুল্য সার্বভৌম রাজা।
মহারাজ আয়ু রাজপ্রাসাদে এসে মুনিদত্ত ফল খেতে দিলেন ইন্দুমতাঁকে। সময়ে তিনি গর্ভ ধারণ করলেন। পদ্মপুরাণের উপাখ্যানে এরপর রীতিমতো হিন্দি সিনেমার ‘প্লট’আছে। নহুষের জন্ম হল ইন্দুমতীর গর্ভে। হুণ্ড-দৈত্যের নিজের মেয়ে ইন্দুমতীর বাড়ির চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহর্ষি দত্তাত্রেয়র আর্শীবাদ এবং ইন্দুমতীর গর্ভধারণের খবর শুনতে পেল। হুণ্ড নিজপুত্রীর মুখে ইন্দুমতীর গর্ভসঞ্চারের খবর শুনে বিশ্বস্ত লোক পাঠালেন গর্ভ নষ্ট করার জন্য। কিন্তু বহুঙ্কাল। পুত্রহীন অবস্থায় থেকে পরিণত বয়সে পুত্রের সম্ভাবনা হলে পিতা-মাতা গর্ভ রক্ষায় যে যত্ন নেন, আয়ুও রাজবাড়িতে ইন্দুমতীর গর্ভরক্ষার কারণে তেমনই নিবিড় সুরক্ষা-ব্যবস্থা চালু করলেন। হুণ্ডের চক্রান্ত ব্যর্থ হল–বিফলো দানবো জাত উদ্যমশ্চ নিরর্থক।
ইন্দুমতী রাত্রিকালে পুত্র প্রসব করলেন। শুভলক্ষণ পুত্র জন্মাল বটে, কিন্তু ছিদ্রান্বেষী দৈত্য তালে তালেই ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই মঙ্গল-উচ্চারণকারিণী এক দুষ্ট দাসীর মাধ্যমে হও-দৈত্য আয়ু-ইন্দুমতীর শিশুপুত্রটিকে হরণ করে নিয়ে এল। রাজবাড়িতে এনে হুণ্ড তার স্ত্রী বিপুলাকে বলল–এই শিশুটি আমার শত্রু। রাধুনে ঠাকুরকে বলো–এই বাচ্চাটিকে কেটে রান্না করে আমাকে পরিবেশন করতে। সুন্দর ছোট্ট শিশুটিকে দেখে দৈত্যরানি বিপুলার প্রথমে বেশ মায়াই হল। স্বামীকে সে একবার বললও- সে কী মহারাজ? এই দুধের বাছাকে চিবিয়ে খাবার ইচ্ছে হল কেন তোমার–পুনঃ পপ্ৰচ্ছ ভর্তারং কস্মাত্ ভক্ষসি বালক? পরে যখন সে। শুনল যে, এই শিশুপুত্রের মৃত্যু না হলে তার স্বামীর মৃত্যু অনিবার্য, তখন সে গিয়ে তার চুল-বাঁধার দাসী মেলাকে বলল-যা গিয়ে এই বাচ্চাটিকে দিয়ে আয় রাঁধুনে ঠাকুরের হাতে। একে কেটে সে যেন রান্না করে নিয়ে আসে, মহারাজ খাবেন–হুণ্ডভোজনহেতবে।
