পার্বতী কন্যাকে আর্শীবাদ করে বললেন- চন্দ্রবংশে ইতুল্য এক রাজা জন্মাবেন। তিনিই তোমার স্বামী হবেন–নহুষশ্চৈব রাজেন্দ্র স্তব নাথো ভবিষ্যতি।
রাম না জন্মাতেই রামায়ণ হয়ে গেল। নহুষের জন্মের কোনও লক্ষণই দেখিনি এতক্ষণ, কিন্তু জগজ্জননী তাঁর কল্পকন্যার স্বামী নির্ধারিত করে রাখলেন আগে থেকে। অশোকসুন্দরী’ নামটার মধ্যে আধুনিকতা আছে বলেই বড় বেশি কাব্যগন্ধী। বস্তুত এই রকম একটা আধুনিক নাম মহাভারত কিংবা প্রাচীন পুরাণগুলিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। পদ্ম পুরাণ যেহেতু তুলনায় কিছু অর্বাচীন তাই নহুষের স্ত্রী হিসেবে অশোকসুন্দরীর নাম আমরা উপাখ্যানের তাড়নায় মেনে নিলাম। আরও একটা নাম গল্পের খাতিরেই আমাদের মেনে নিতে হবে। সেটি একটি পুরুষ-নাম। তার নাম দৈত্যপতি হুণ্ড পদ্ম পুরাণ এবং আরও দু-একটি পুরাণে হুণ্ড দৈত্যের মরণের কাহিণী বর্ণিত আছে। পণ্ডিতদের মতে হুণ্ড একটি ছোট উপজাতির নাম এবং হণদের সঙ্গেও একে এক করে দেখা যেতে পারে। অনেকে আবার হুণ্ড’ শব্দটাকে ‘পৌন্ড্র’ শব্দের অপভ্রংশ বলে মনে করেন। পৌন্ড্র অর্থ প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধনের লোক, আর পুণ্ড্রবর্ধন মানে এখনকার বাংলাদেশের পাবনা-রাজশাহীর খানিকটা নিয়ে উত্তরবঙ্গ এলাকা। এই সব জায়গার লোককে সেকালের আর্য পুরুষেরা অসুর, রাক্ষস, বর্বরই বলতেন, যদিও তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কিছু কম ছিল না। অতএব হুণ্ড কোনও বিজাতীয় লোক নন, অনার্য-জাতীয় কোনও প্রভাবশালী পুরুষ।
পদ্মপুরাণ বলেছে– হুণ্ড ছিলেন বিচিত্তির ছেলে। শিব-পার্বতীর কল্পকন্যা অশোকসুন্দরী যখন রূপের আলোয় নন্দন-কানন ভরিয়ে রেখেছেন, সেই সময় স্বেচ্ছাচারী হুন্ড এসে প্রবেশ করলে সেই বনভূমিতে। অপরূপা রমণীরত্ব দেখে হুণ্ডের মাথাটাই ঘুরে গেল। অশোকসুন্দরীর কাছে আপন অন্তর্ভেদী কামনা প্রকাশের আগে সে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল–আমি বিচিত্তির ছেলে। শৌর্যে-বীর্যে এবংণে আমার মতো দ্বিতীয় কোনও সুলক্ষণ রাক্ষস নেই এই তিন ভুবনে। তোমাকে দেখেই আমার সর্বাঙ্গ শিহরিত কামনায়। তোমাকে আমি বিয়ে করতে চাই এবং এ ব্যাপারে তোমার প্রসন্নতা চাই আমি–প্রসাদসুমুখী ভব। ভবস্ব বল্লভ ভার্যা মম প্রাণসমা প্রিয়া।
অশোকসুন্দরী শান্ত মনে হণ্ড-দৈত্যকে নিজের অপার্থিব জন্মকথা শোনালেন। জানালেন শিব-পার্বতীর সঙ্গে তার সম্পর্ক। শেষ পর্যন্ত পার্বতীর নির্দেশ জানিয়ে অশোকসুন্দরী বললেন–আমার জন্মলগ্নেই জগজ্জননী পার্বতী আমার স্বামী নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। চন্দ্রবংশে সর্বগুণসম্পন্ন রাজা নহুষ জন্মাবেন। তার সঙ্গেই আমার বিয়ে হবে। এবারে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, দৈত্যরাজ, তুমি যার সঙ্গে কথা বলছ, সে আসলে পরস্ত্রী। তুমি আর ভুল কোরো না, যাও এখান থেকে–অতঃ ত্বং সর্বথা হুণ্ড ত্যজ ভ্রান্তিমিতো ব্রজ।
দৈত্য বলল–যত সব গাঁজাখুরি কথা। যেমন তুমি, তেমনই তোমার দেবদেবীর কথা। চন্দ্রবংশে কবে নহুষ জন্মাবেন? আর কবে তুমি তার বউ হবে? বরের থেকে বউ বয়সে বড়–এ কি খুব ভাল কথা? মেয়েদের যতদিন যৌবন থাকবে, তারুণ্য থাকবে, ততদিনই তারা রূপবতী। তোমার এই রূপ-যৌবন একেবারে বৃথা যাবে। কবে মহারাজ আয়ুর পুত্র জন্মাবেন? কবে সে ছোট থেকে বড় হবে? আর কবে সে তোমাকে বিয়ে করার বয়সে পৌঁছবে-কদাসৌ যৌবনোপেস্তব যোগ্যা ভবিষ্যতি। তার চেয়ে ওসব কল্পকথা, স্বপ্ন দেখা থাক। আমার সঙ্গে রসে-রমণে তোমার দিন কাটবে আরও ভাল ময়া সহ বিশালাক্ষি রমস্ব ত্বং সুখেন বৈ। চলো তুমি।
একটা কথা এখনই বলে নেওয়া ভাল, কারণ পরেও এসব কথা আসবে। আমাদের বিশ্বাস-সেকালে যখন বয়সে বড় কোনও মেয়ের সঙ্গে বয়ঃকনিষ্ঠ পুরুষের বিয়ে হত, তখনই এই ধরনের উপাখ্যান কিছু তৈরি হত। কৃষ্ণজ্যেষ্ঠ বলরামের বিয়ে হয়েছিল রেবতীর সঙ্গে এবং রেবতী বয়সে বড় ছিলেন। তাকে নিয়েও পুরাণ-ইতিহাসে অনুরূপ উত্তম উপাখ্যান রচিত হয়েছে, যার হাস্যরসাত্মক রূপ পরশুরামের লেখা “রেবতীর পতিলাভ”। যাই হোক, অশোকসুন্দরী নিজের পাতিব্ৰত্য প্রতিষ্ঠা করে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করলেন হুণ্ডকে এবং অভিশাপের ভয়ও দেখালেন নাচার হয়ে। হুও আপাতত প্রস্থান করল বটে–কিন্তু ছলে, কৌশলে এবং মায়ায় সে অশোকসুন্দরীকে শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়িতে এনে তুলল। অশোকসুন্দরী যখন বুঝলেন যে, তিনি অপহৃত হয়েছেন, তখন ক্রোধভরে অভিশাপ দিলেন–আমার স্বামীই তোকে মারবে। আরও বললেন–তোর মরার জন্য আমি তপস্যা করব। কথাটা বলেই অশোকসুন্দরী গঙ্গাস্নান করে গঙ্গার তীরে তপস্যায় বসে গেলেন আর অভিশপ্ত হয়ে হুণ্ড এসে মন্ত্রণায় বসল তার প্রধান মন্ত্রী কম্পনের সঙ্গে। সব কথা মন্ত্রীর কাছে খুলে বলতেই মন্ত্রী কম্পন বললেন-আয়ুর পুত্র নহুষকে আর জন্মাতে হবে না। হয় গর্ভিণী অবস্থায় আয়ুর স্ত্রীকে আমরা হরণ করব এবং ভয় দেখিয়ে তার গর্ভপাত ঘটাব, নয়তো নহুষ জন্মালে তাকে তুলে এনে মেরে ফেলব। মন্ত্রী দৈত্যরাজকে অভয় দিয়ে নিজের কাজে নেমে পড়ল।
অশোকসুন্দরীর জন্মকথা থেকে আরম্ভ করে হণ্ড-দৈত্যের কুমন্ত্রণা পর্যন্ত ঘটনা আমরা না বললেই পারতাম। কারণ, এ কাহিনী অর্বাচীন এবং হয়তো এসব ঘটনা ঘটেনি। অপি চ নহুষের জন্মও হয়নি এখনও, কিন্তু কাহিনীটি এই জন্যই শুধু বলতে হচ্ছে যে, পুরূরবার পুত্র আয়ু তার পুত্রজন্মের জন্য কী করেছিলেন? এ ঘটনাও মহাভারতে নেই; কিন্তু নহুষের কীর্তি-কাহিনী যেহেতু মহাভারতে বারবার বলা হয়েছে, তাই নহুষের জন্মের মধ্যে তার পিতার তপস্যাটুকু আমরা শুনে নিতে চাই। আর শুনে নিতে চাই এইজন্য যে, পিতা-মাতার হাজারো সম্ভাবনা থাকলেও পুত্রের জীবন-চর্চা কত ভিন্নতর হয়, সেটা এই কাহিনী থেকে বোঝা যাবে।
