কথায় বলে–নিজের নামে যে মানুষ জন-সমাজে পরিচিত, তিনিই সত্যিকারের কৃতী এবং উত্তম পুরুষ। যিনি পিতার নামে বিখ্যাত হন, তাকে মধ্যম আখ্যায় অভিহিত করা হয়েছে–স্বনামা পুরুষো ধন্যঃ পিতৃনামা তু মধ্যমঃ। মায়ের নামে যার পরিচিতি, তাকে অধম বলেছেন নীতিশাস্ত্রকারেরা। চতুর্থ কোনও আখ্যা তাদের অভিধানে নেই, তবে ভাবে বুঝি–পুত্রের নামে যদি কেউ বিখ্যাত হন, তবে নীতিকারদের হাতে তার বিশেষণ জুটত ‘অধমাধম’।
নীতিকথার প্রসঙ্গ এল পুরূরবা-উর্বশীর পুত্র আয়ুর কথায়। আয়ু নিজে তেমন কোনও বিখ্যাত রাজা নন। পুরূরবার পুত্র হিসেবে তাকে বড় জোর মধ্যম মাপের পুরুষ বলা যেতে পারে। আর যদি তার পুত্রের নাম করি তাহলে আয়ুকে একেবারে ‘অধমাধম’ বলতে হবে। আয়ুর পুত্র নহুষ। মহাভারতের বিরাট পরিসরে নহুষ এতটাই বিখ্যাত রাজা যে তার পরিচয়েই আয়ু খানিকটা বিখ্যাত হয়েছেন। আয়ুর পুত্র নহুষ বললে নহুষের মর্যাদা কিছু বাড়ে না। কিন্তু নহুষের পিতা আয়ু বললে নহুষের মর্যাদা নাই বাড়ুক, আয়ুর মর্যাদা তাতে বাড়ে। আয়ু রাজ্যে অভিষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্র এবং বল-বর্ণনা অন্য রাজার তুলনায় কিছুই হয়নি, উপরন্তু পৌরাণিকেরা আরম্ভেই বলেছেন- মুনিরা উর্বশীর সন্তান আয়ুকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করলেন এবং লোকে এই রাজাকে নহুষের বাবা বলে জানে নহুষস্য মহাত্মানং পিতরং যং প্রক্ষিতে।
পৌরাণিক যেভাবে কথাটা বললেন তাতে আয়ুর মর্যাদা কিছু বাড়ল না, অর্থাৎ তার অবস্থাটা প্রায় ‘অধমাধম’ গোছের হয়ে দাঁড়াল। এবারে উপরিউক্ত নীতিবাক্য এবং পৌরাণিকের কথার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতি-বক্তব্য পেশ করি। প্রথমেই বলি–সব মানুষই বিখ্যাত হন না, হাতে পারেন না। কিন্তু কীর্তিমান পুত্রের পিতা হওয়ার জন্য পিতার যে তপস্যা থাকে, যে প্রাণ থাকে সেই তপস্বী প্রাণটুকুকে অস্বীকার করি কী করে? শাস্ত্রে বলে উপযুক্ত এবং কৃতী সন্তানের জন্য পিতা-মাতাকে তপস্যা করতে হয়, ভাবনা করতে হয়। এই তপস্যা। এবং ভাবনা শুরু হয় পুত্রজন্মের বহু পূর্ব থেকে এবং তা চলে সারা জীবন ধরে।
আমি যখন একেকটি বাবা-মাকে পরম আগ্রহে তার সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যেতে দেখি, পুত্র-কন্যার জন্য সারাদিন স্কুলবাড়ির আশে-পাশে বসে থাকতে দেখি, তাদের জন্য ভাবনা করতে দেখি, তখনই বুঝি সেই প্রাচীন তপস্যা চলছে। একশো জনের মধ্যে একটি সন্তান হয়তো ভবিষ্যতে কৃতী হবে, কিন্তু তার জন্য কল্যাণকামী পিতা-মাতার সম্ভাবনার পরম এবং চরম কষ্টকর তপস্যাকে অস্বীকার করি কী করে? কী করেই বা সেই অনামা পিতা-মাতাকে অধমাধম’ বলি? মহামতি বিদ্যাসাগরের জন্য ঠাকুরদাস বা ভগবতী দেবী বিখ্যাত হয়েছেন হয়তো, কিন্তু বিদ্যাসাগরের বীজ ছিল ওই জনক-জননীর তপস্যা, ভাবনা বা ইচ্ছার মধ্যে ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে। এই জনক-জননীকে কোন যুক্তিতে আমরা ‘অধমাধম’ বলব?
আয়ুর মতো অনামা পিতার জন্য, আরও পরিষ্কার করে বলি- যে পিতা তার অসাধারণ পুত্রের জন্যই শুধু বিখ্যাত, তার জন্য কিছু সমব্যথা আছে আমার। নীতিশাস্ত্রকার একটি পুরুষকে কৃতী হওয়ার উদ্দীপনা জোগান দিতেই অমন নীতিবাক্য রচনা করেছেন, তা বেশ বুঝি, নইলে হাজারো অনামা জনক-জননীর তপস্যা থেকেই একটি বিবেকানন্দ, কি একটি বিদ্যাসাগরের জন্ম হয়। পুরূরবার পুত্র আয়ু এই রকমই অসহায় তপস্বী পিতার উদাহরণ। বস্তুত যে পৌরাণিক তাচ্ছিল্যভরে বলেছিলেন– ওই যাঁকে নহুষের পিতা বলে লোকে বলে–এই উক্তির প্রতিবাদেই যেন অন্য এক পৌরাণিক আয়ুর কথা কিছু লিখেছেন। মহাভারত এবং অন্যান্য মহাপুরাণের উপেক্ষার জবাব দিতেই যেন আয়ুর এই কাহিনী। মুশকিল হল- ভাগ্যের এমনই চক্রান্ত যে,আয়ুর কথা সামান্য বলতে গেলেও আমাদের নহুষকে একবার ছুঁয়ে যেতে হবে।
তাবে তারও আগে মনে রাখতে হবে–যে পুরাণ থেকে এই কাহিনী আমরা সংগ্রহ করেছি, তা অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন পুরাণ। দেখা যাচ্ছে–ত্রিলোকসুন্দরী পার্বতী একবার মহাদেবকে সপ্রেমে বলেছিলেন–আমাকে একবার নন্দন-কাননে নিয়ে যাবে? কাছে গিয়ে একবার দেখতে ইচ্ছে করে কেমন সেবন? মহাদেব তার প্রমথগণ আর ভূতপ্রেতের বাহিনী সঙ্গে নিয়ে প্রেমানন্দে পার্বতাঁকে নন্দনকাননে নিয়ে গেলেন। স্বৰ্গশোভার সার সেই অপূর্ব বনভূমি দেখে শিবপ্রিয়া পার্বতী একেবারে মোহিত হয়ে গেলেন। নন্দনকাননের সব চেয়ে বড় আকর্ষণ হল মধ্যিখানে থাকা কল্পবৃক্ষটি। সে বৃক্ষের কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। শিব বললেন-তোমার মনের যা অভিলাষ আছে, জানাও এই কল্পতরুর কাছে, তোমার বাসনা পূরণ হবে।
পার্বতী শিবের অনুমতি নিয়ে তরুরাজ কল্পদ্রুমের কাছে চেয়ে নেবেন বলে অসামান্য রূপবতী গুণবতী রমণীর ভাবনা করলেন মনে মনে। কল্পনামাত্রেই রূপে চারদিক আলো করে বেরিয়ে এল এক কন্যা। পার্বতীর ভাবনা আর কল্পতরুর ঋদ্ধি আত্মসাৎ করে সেই কন্যা এসে প্রণাম করল পার্বতীর পদদ্বন্দ্বে। পার্বতী বললেন-কল্পতরুর কাছে সত্যিই চেয়ে পাওয়া যায় কিনা– সে কৌতূহল আমার তৃপ্ত হল তোমাকে দেখে। তোমার নাম হবে অশোকসুন্দরী। জগতে তুমি আমার কন্যা বলে পরিচিত হবে–সর্বসৌভাগ্যসম্পন্না মম পুত্রী ন সংশয়ঃ।
