শতপথ ব্রাহ্মণ এবং বিষ্ণু পুরাণে আমরা দেখেছি–উর্বশী এক বছর পর এক রাত্রি পুরূরবার সঙ্গে মিলনে স্বীকৃত হন এবং ওই এক বছর পরেই উর্বশী তার প্রথম পুত্রকে পুরূরবার হাতে দেবেন বলে প্রস্তাব করেন। বস্তুত উর্বশী পূর্বাহ্নেই গর্ভবতী ছিলেন। এর পরেই গন্ধর্বদের দেওয়া সেই অরণিকাষ্ঠ এবং অগ্নিস্থালী নিয়ে পুরূরবা স্বগৃহে আসেন। অরণিমন্থনে যে পবিত্র অগ্নি জন্মায়, সেই অগ্নিই পরবর্তী পুরাণগুলিতে বেদ-বিখ্যাত অগ্নির তিন স্বরূপ- গার্হপত্য অগ্নি, দক্ষিণাগ্নি এবং আহবনীয় অগ্নি নামে বিখ্যাত হয়েছে। পুরূরবা এই অগ্নির প্রণেতা বলেই তিনি বেদে অগ্নিদেবের বন্ধু বলে প্রশংসিত হয়েছেন।
আমাদের বক্তব্য কিন্তু পুরূরবার অগ্নি আহরণের তাৎপযেই সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের ধারণা যে ব্রাহ্মণ-বিরোধিতা পুরূরবার রাজ-জীবনে ভীষণ বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, উর্বশীর পরামর্শে এবং গন্ধর্বদের অনুকম্পায় ব্রাহ্মণ্যের প্রতীক অগ্নি আহরণ করে পুরূরবা সেই বিপর্যয় খানিকটা ঠেকাতে পেরেছেন। কাম-বিকারগ্রস্ত অর্থগৃধু পুরূরবা সাময়িকভাবে রাজ্যচ্যুত হলেও ব্রাহ্মণ্য-বিরোধিতা ত্যাগ করে অগ্নি-উপাসনার পথে তৎকালীন ব্রাহ্মণ-সমাজের সঙ্গে আপস করে নেন। মহাভারতের কবি তাই উর্বশী-পুরূরবার প্রেম-কাহিনীর বর্ণনায় মন দেননি। তিনি পুরূরবার উৎকট ব্রাহ্মণ্য বিরোধিতার সামাজিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেই দুই পংক্তিতে। বলেছেন– পুরূরবা তারপর উর্বশীর সঙ্গে মিলিত হয়ে যজ্ঞাদি ক্রিয়া সম্পাদন করার জন্য গন্ধর্বলোক থেকে নিয়ে আসেন অগ্নিকে—যে অগ্নির তিন রূপ গার্হপত্য, দক্ষিণাগ্নি এবং আহবনীয়।
স হি গন্ধর্বলোকস্থান উর্বশ্যা সহিতে বিরাট। আনিনায় ক্ৰিয়ার্ধেগীন যথাবদ বিহিতংস্ত্রিধা৷৷ এই অগ্নি আনয়নের পথ ধরেই হয়তো ব্রাহ্মণ সমাজের সঙ্গে যাঁর বিবাদ-বিসংবাদ মিটে যায়, এবং সেই কারণেই তার পুত্র আযুর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয় বিনা বাধায়। আরও একটা কথা। উর্বশীর অন্তর্ধানের পর যেমন তার কাম-বিকার শান্ত হয় একই সঙ্গে তার ব্রাহ্মণ্য-বিরোধিতাও শেষ হয়। এরই ফলে হয়তো ঋগবেদে তিনি সুকৃতি’ বলে আখ্যা লাভ করেছেন, পরিচিত হয়েছেন অগ্নিদেবের বন্ধু বলেও।
উর্বশীর গর্ভে পুরূরবার প্রথম পুত্রের নাম আয়ু। এই জ্যেষ্ঠ পুত্রের জন্ম এবং রাজ্যাভিষেকের পরেও পুরূরবা হয়তো বেঁচেই ছিলেন নইলে অধিকাংশ পুরাণেই দেখা যাবে–পুরূরবা উর্বশীর গর্ভে দুটি পুত্র লাভ করেছিলেন। মহাভারতের বিবরণেও তাই। আয়ু, ধীমান, অমাবসু, দৃঢ়ায়ু, বনায়ু এবং শতায়ু–এই ছয় পুত্র। শেষ তিনটি নামের শেষে ‘আয়ু থাকায় পণ্ডিতেরা কেউ কেউ বলেছেন যে, it may be admitted that an Ayu’ tribe derived their descent from Urvasi and Pururavas. নামের অন্তে আয়ু-শব্দের প্রয়োগে কোনও আয়ু-গোষ্ঠীর জন-জাতির উদ্ভব অনুমান করা যায় কিনা জানি না। তবে প্রতি বৎসর এক রাত্রির যে মিলন-বাসর রচিত হত উর্বশী-পুরূরবার জীবনে, তাতে যে রাজার আরও পাঁচটি পুত্র হয়েছিল, সে খবর পৌরাণিকেরাও স্বীকার করেন, মহাভারতের কবিও তা মেনে নিয়েছেন।
প্রধানত চন্দ্রবংশের ধারাটি বোঝানোর জন্য মহাভারতের কবি আপাতত পুরূরবার প্রথম পুত্র আয়ুর বংশধরদের কথাই বলে গেছেন: কিন্তু তাই বলে অন্যেরাও খুব সামান্য নন। যেমন অমাবসুর বংশে স্বয়ং জন্তু মুনির জন্ম হয়, যার সাহচর্যে ভারতাত্মা জননী জাহ্নবী। পুরূরবার অন্য পুত্রদের ঔরসে বহুতর ব্রাহ্মণদের দেখা যাবে এবং এই ঘটনায় আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সেকালের ক্ষত্রিয় বংশে অনেকেই এরকম ব্রাহ্মণ হয়ে যেতেন কারণ, জন্মের দ্বারা তখন ব্রাহ্মণ্য নির্ধারিত হত না। এ সব কথা পরে আসবে। আমরা আয়ুর কথা বলি।
ঐল পুরূরবার পুত্র আয়ু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। পুরূরবার রাজত্বকালে যে ব্রাহ্মণ্য-বিরোধিতা আমরা লক্ষ্য করেছি, আযুর আমলে তা সম্পূর্ণ তিরোহিত। বায়ুপুরাণ জানিয়েছে–দ্বাদশ-বার্ষিক যে বিশাল যজ্ঞটি পুরূরবার রাজত্বকালে আরম্ভ হয়েছিল, পুরূরবার। মৃত্যুর পর আয়ুর তত্ত্বাবধানে সেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয়। পুরূরবার ব্রাহ্মণ্য বিরোধিতার প্রতিক্রিয়ায় তার পুত্র আয়ু মুনি-ঋষি ব্রাহ্মণদের সম্পূর্ণ বশংবদ হন। ব্রাহ্মণরাও পিতৃহারা আয়ুকে যথোচিত সান্ত্বনা প্রদান করে যজ্ঞ আরম্ভ করলেন। অন্যদিকে লক্ষণীয়, এই যজ্ঞে গন্ধর্বরাও দেবতা এবং পিতৃগণের সঙ্গে যথেষ্ট মর্যাদার সঙ্গে পৃজিত হন–আর্নচুশ্চ যথাজাতি গন্ধর্বাদী যথাবিধি। এ ব্যাপারটা পুরূরবার গন্ধর্ব হয়ে যাওয়ার একটা ফল কি না কে জানে? মর্যাদা লাভ করে। গন্ধর্বরাও প্রতিদান দিয়েছেন তুল্যতায়। তারা এই বিশাল যন্ত্রে সামগান করেন, নৃত্য পরিবেশন করেন অপ্সরারা– জণ্ডঃ সামানি গন্ধর্বা নতুশ্চালরোগণাঃ। অবশ্য সেকালের কোনও বিশাল যজ্ঞ ভূমিতে গন্ধর্বদের গান এবং অপ্সরাদের নাচ কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এবং তা থেকে কিছু প্রমাণও করা যায় না। কিন্তু প্রমাণ করার মতো বড় কিছু ঘটনা না হলেও গন্ধর্ব-অপ্সরাদের বিশেষ অংশগ্রহণ এখানে খানিকটা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। অন্তত পুরূরবা-উর্বশীর জীবন-চর্চার নিরিখে বায়ুপুরাণে উল্লিখিত গন্ধর্ব-অপ্সরাদের মর্যাদা এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এখানে খানিকটা তাৎপর্যপূর্ণই বটে।
০২৫. পুরূরবা-উর্বশীর পুত্র আয়ু
২৫.
