আমরা যেমন আজকের যুগেও বলি- ভূতে পেয়েছে, পেচোয় পেয়েছে, এও অনেকটা সেই রকম। বৃহদারণ্যক উপনিষদে ভুজু লাহায়নির কথা পড়েছি। তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে বলছেন–আমরা মদ্র-দেশীয় মানুষদের মধ্যে শিক্ষার্থী হয়ে ঘুরছিলাম। তারপর আমরা পতঞ্চল কাপ্যের বাড়িতে পৌঁছোলাম। তার একটি মেয়ে আছে, তাকে গন্ধর্বয় পেয়েছে–তস্যাসী দুহিতা গন্ধর্বগৃহীতা। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম–তোমার নাম কী? সে বলল–আমার নাম সুধন্ব, অঙ্গিরাগোত্রীয় সুধন্থ।
ভাবুন একবার। ঠিক ভূতে পাওয়ার মতোই। প্ল্যাঞ্চেট করতে গেলে ‘মিডিয়াম’ কিন্তু নিজের নাম বলে না। জীবিত অবস্থায় প্রেত ব্যক্তির যে নাম ছিল অর্থাৎ যাকে আপনি ডাকছেন বা স্মরণ করছেন ‘মিডিয়াম’ তারই নাম লেখে। পতঞ্চল কাপ্যের মেয়ে একটি ব্রাহ্মণ-পুরুষের নাম করছে এবং উপনিষৎকার স্পষ্টতই বলছেন–মেয়েটাকে গন্ধর্বয় ধরেছে–গন্ধর্বগৃহীত। পতঞ্চল কাপ্যের ভাগ্য মোটেই ভাল নয়। একটি মাত্র মেয়ে তাকে গন্ধর্বয় ধরেছে, আবার খানিক পরে ওই বৃহদারণ্যক উপনিষদেই দেখতে পাচ্ছি তার বিবাহিত পত্নীও গন্ধর্বাক্রান্ত। উদ্দালক আরুণি ওই মদ্রদেশের উল্লেখ করেই যাজ্ঞবল্ক্যকে বললেন–আমরা ওই মদ্রদেশেই যজ্ঞবিদ্যা অধ্যয়ন করার জন্য পতঞ্চল কাপ্যের ঘরে কিছুদিন ছিলাম। দুঃখের বিষয় তার স্ত্রীটিকে গন্ধর্বয় ধরেছে–তস্যাসীদ ভার্যা গন্ধর্বগৃহীতা। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম–কে তুমি? গন্ধর্ব উত্তর দিল– আমি অথর্বণের পুত্র। আমার নাম কবন্ধ।
ওই একই ব্যাপার। গন্ধর্বক্রান্ত একটি বিবাহিতা রমণী এবং একটি গন্ধর্বাক্রান্ত কন্যা–এই দুই অস্বাভাবিক রমণী নিয়ে কপিবংশীয় পতঞ্চলের সংসার। উপনিষদের ভুজ্ঞ হ্যায়নি এবং উদ্দালক আরুণি–এই দুই ব্রহ্মজিজ্ঞাসু ঋষি উপরি-উক্ত দুই গন্ধর্বাক্রান্ত রমণীর কাছে ব্রহ্ম বিদ্যা শুনতে পেয়েছেন। কারণ গন্ধর্ব লোকাতীত জীব। তাদের বিদ্যা-বুদ্ধি মানুষের চেয়ে বেশি। কিন্তু পুরূরবার গন্ধর্ব হয়ে যাওয়ার মধ্যে পণ্ডিতেরা এই দুটি উদাহরণের অন্য তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছেন। বৃহদারণ্যকের ভাষায় এ কথা যথেষ্টই পরিষ্কার যে, গন্ধর্বগৃহীতা রমণী মানেই সেই রমণীর ওপর কোনও অমানুষ সত্ত্বের আবেশ ঘটেছে।
আধুনিক যুগে ‘ভূতে পাওয়া’, ‘পেচোয় পাওয়ার মতো গন্ধর্ব-গৃহীতা’ শব্দটিকেও আমরা হয়তো বিশ্বাস করব না, কিন্তু কোশাম্বীর কথা মতো গন্ধর্ব ব্যাপারটাকে–the spirit that caused their hystera অর্থাৎ গন্ধর্বকে ‘হিস্টিরিয়ার’ অধিদেব ভাবতে কোনও ক্ষতি নেই। কোশাম্বীর ভাষায়-Hence, though the Gandharvas posses a separate minor heaven of their own, a human being can attain it only as a spirit. 7091401914, বায়ু পুরাণ এবং অন্যান্য প্রাচীন সাহিত্যিক প্রমণে থেকে কোশাম্বী বিশ্বাস করেন অর্থলোভ এবং স্বর্ণগৃধুতার জন্য পুরূরবা কোনও যজ্ঞভূমিতেই মারা যান অথবা তিনি স্পিরিট’ হয়ে যান, যাকে শতপথ বলেছে- তিনি গন্ধর্ব হয়ে গেলেন।
আমদের বক্তব্য গন্ধর্ব শব্দের অর্থে ‘হিস্টিরিয়ার কাছাকাছি গিয়েও কেন শেষ রাখতে পারলেন না কোশাম্বী? বস্তুত গন্ধর্বের আবেশ এখানে উর্বশীর ওপরে নয়। বরং পুরূরবার ওপরেই। পুরূরবা গন্ধর্ব হয়ে গেলেন মানে তাকে হিস্টিরিয়ার রোগীর মতো বিকারগ্রস্ত দেখা গেল। কালিদাসে উর্বশীর বিরহে পুরূরবার যা অবস্থা হয়েছে তা কাব্যিক দিক দিয়ে যথেষ্ট মূল্যবান হলেও বিকারের কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা বেদের মধ্যে দেখেছি পুরূরবা নিজেই বলছেন–আমিই যখন মানুষ হয়েও অমানুষী অপ্সরাদের আলিঙ্গন করেছিলাম, তখন তারা বস্ত্র উন্মোচন করে রেখে হরিণীর মতো, অশ্বের মতো আমার কাছ থেকে ছুটে পালাল- অপ স্ম মৎ তরসন্তি ন ভূস্তা অসান্ রথস্পৃশো নাশ্বাঃ।
অপ্সরাসুন্দরীদের পিছনে ছোটার এই বিকার পুরূরবার জীবনে পরিণত হয়েছে উর্বশীকে পাওয়ার পর। পুরূরবা উর্বশীর সমস্ত শর্ত মেনে নিয়ে তাকে বিবাহ করেছেন। পৃথিবীতে স্বীকামী ব্যক্তির বিকারের ইতিহাস কিছু অপ্রাপ্য নয়। কিন্তু উর্বশীকে পাওয়ার পর রাজার চিরাভীষ্ট সিদ্ধ হওয়ায় তার রাজকার্য মাথায় উঠেছিল, এবং স্বর্গসুন্দরীর তোষণে-পোষণে তার অর্থগৃধুতাও বেড়ে গিয়েছিল। হয়তো এই সময়েই কোনও যজ্ঞভূমিতে তিনি ব্রাহ্মণদের দ্বারা আক্রান্ত হন। আমরা জানি–উর্বশী রাজাকে ছেড়ে চলে যান এবং বেদ, শতপথ তথা অন্যান্য পুরাণের বিবরণ থেকে বোঝা যায় তার বিকার প্রায় পাগলামিতে পরিণত হয়েছিল। বেদের বিবরণে পুরূরবার নিজ-মুখের স্বীকারোক্তি–আমার তৃণীর থেকে আর বাণ নির্গত হয় না। রাজকার্য বীরশূন্য, তার কোনও শোভা নেই-অবরে ক্রতৌ বি দবিদ্যুতন্নোরা।
আমাদের ধারণা হয়–উর্বশীকে নিয়ে রাজার যে এই অসহায় বিকারগ্রস্ত (hysteria) অবস্থা, এই অবস্থা থেকেই তার অর্থগৃধুতা এবং ব্রাহ্মণ বিরোধিতারও চরম বিন্দু স্পর্শ করে। ব্রাহ্মণরা অথবা আরও সাধারণভাবে বললে প্রজারা তার এই বিকারগ্রস্ত অবস্থা মেনে নেননি। তাকে রাজ্যচ্যুত করেছেন। আগে যেমন অত্যাচারী বেণের ব্যাপারে দেখেছি, তার বাহুমন্থনের ফলে পৃথু জন্মালেন এবং পৃথুকে রাজপদে বসালেন ব্রাহ্মণেরা, এখানেও তেমনই পুরূরবাকে রাজ্যচ্যুত করে তার উর্বশীগর্ভজাত পুত্র আয়ুকে সিংহাসনে বসালেন ব্রাহ্মণেরা উর্বশেয়ং ততস্তস্য পুত্রং চক্রুপং ভুবি।
