ফিরিবে না, ফিরিবে না অস্ত গেছে সে গৌরবশশী,
অস্তাচলবাসিনী উর্বশী।
তাই আজি ধরাতলে, বসন্তের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে
কার চিরবিরহের দীর্ঘশ্বাস মিশে বহে আসে,
পূর্ণিমানিশীথে যবে দশ দিকে পরিপূর্ণ হাসি
দূরস্মৃতি কোথা হতে বাজায় ব্যাকুল করা বাঁশি
ঝরে অশ্রুরাশি।
তবু আশা জেগে থাকে প্রাণের ক্রন্দনে,
অয়ি অবন্ধনে।
.
২৪.
পুরূরবার প্রাণের ক্রন্দনে যে আশা জেগে ছিল, সে আশা পূরণ হল একবার এবং ঠিক সেইখানেই ঋগবেদে উর্বশী-পুরূরবার সংলাপ সূক্ত আরম্ভ হয়েছে। উর্বশীর অন্বেষণে বনে বনান্তরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মহাভারতের পূর্বকালের কুরুক্ষেত্রে এসে এক পদ্ম-সরোবরের মধ্যে অবগাহনরত উর্বশীকে দেখতে পেলেন রাজা বিকশিত বিশ্ববাসনার/ অরবিন্দ মাঝখানে পাদপদ্ম রেখেছ তোমার অতি লঘুভার। এই পদ্ম দিঘির নাম ‘অন্যতঃক্ষা। এ খবর আছে শতপথ ব্রাহ্মণে। স্বর্গসুন্দরী সেই শীতল দিঘির মধ্যে পা ভাসিয়ে স্নান করছিলেন অন্য অপ্সরাদের সঙ্গে। সরোবরের তীরে উদভ্রান্ত পুরূরবাকে উর্বশী প্রথমে দেখতে পেয়েছেন। রাজাকে দেখা মাত্রই তিনি বন্ধুদের জানিয়েছেন–এই হলেন সেই মর্ত্য রাজা। যার সঙ্গে আমি এতকাল সহবাস করেছি–অয়ং বৈ স মনুষ্যো যস্মিন্নহমবাৎস ইতি।
অন্য অপ্সরা-সুন্দরীরা উর্বশীর কথা শুনে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন পুরূরবার দিকে। প্রায় ঈর্ষাকাতর ভাষায় বললেন- ইচ্ছে হয় যেন আমরাও এই মর্ত্য রাজার সঙ্গসুখ লাভ করি। উর্বশীকে তারা বললেন–চল, একবার দাঁড়াই গিয়ে রাজার সামনে–তা হোচতু স্তস্মৈ বা আবিরসামেতি। উর্বশী অপ্সরা সখীদের কথা শুনে রাজার দৃষ্টিপথে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরূরবা তাকে আবার বাহু-বন্ধনে বেঁধে ফেলেন আর কি! উর্বশী জানেন অথবা এতদিন পুরূরবার সহবাস-পরিচয়ের ফলে জেনেছেন যে, মর্তের বন্ধন দেবতার চেয়েও অনেক বেশি, হয়তো মধুরতরও বটে। সে বন্ধনে একবার জড়ালে দেবতাকেও মায়া সৃষ্টি করতে হয় বন্ধন-মুক্তির জন্য। উর্বশী দাঁড়ালেন না। প্রিয়তম স্বামীকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে তার অলস-গমন শুরু হল। কিন্তু অলস-গমনা রমণীর সেই ললিত গতি পুরূরবার মনে প্রাপ্তির। আকাক্ষা জাগিয়ে তুলল পুনর্বার। কথাটা ঝবেদের জবানীতে এইরকম–
পুরূরবা বললেন–এত তাড়াতাড়ি তুমি চলে যেও না উর্বশী। তোমার হৃদয় কি এতই নিষ্ঠুর, আমাদের দু’জনের কিছু কথাবার্তা এখনই যে হওয়া উচিত–হয়ে জায়ে মনসা তিষ্ঠ ঘরে বচাংসি মিশ্রা কৃণবাবহৈ নু। উর্বশী নিজের চারপাশে স্বর্গীয় উদাসীনতা সৃষ্টি করে বললেন–কী হবে তোমার সঙ্গে কথা বলে–কিমেতা বাঁচা কৃণবা তবাহং–আমি তো চলে এসেছি প্রথম উষার মতো। তুমি ফিরে যাও পুরূরবা। তুমি আমাকে ধরে রাখতে পারবে না। হাওয়াকে যেমন হাত দিয়ে ধরা যায় না, তেমনই আমাকেও তুমি ধরে রাখতে পারবে না–দুরাপনা বাত ইবাহমস্মি। পুরূরবা উর্বশীর সঙ্গলাভের জন্য আকুতি প্রকাশ করলেন। বললেন–এখন তুমি নেই, আর আমার তুণ থেকে বাণ নির্গত হয় না। তুমি আসার পর থেকে কোনও যুদ্ধে যাইনি। ললাটে অঙ্কিত হয়নি কোনও জয়টীকা। রাজকার্যে কোনও উৎসাহ নেই। আমার সৈন্যেরা পর্যন্ত সিংহনাদ করে না। পুরূরবা এইটুকু বলেই থামলেন না। স্মরণ করলেন পুরনো দিনের কথা। এমনকি দিনে-রাতে তার সোহ্লাস সম্ভোগ-স্মৃতিও পুনরুক্ত হলদিবানং থিতা বৈতসেন।
স্বর্গসুন্দরী উর্বশী। কথা তিনি কিছু কম জানেন না। তিনি চলে এসেছেন, তাতে যে পুরূরবার কোনও দোষ ছিল না, রাজা যে তাকে যথেষ্ট মর্যাদায় প্রেমে এবং আদরে রেখে ছিলেন, সে কথা তিনি সাবেগে স্বীকার করে নিলেন। বললেন–দিনের মধ্যে তিনবার তুমি আমায় আলিঙ্গন করতে রাজা। আমার কোনও সতীন আমার সমান আদর পায়নি তোমার কাছে, আমাকেই তুমি প্রতিনিয়ত সন্তুষ্ট করেছ। তুমি আমার রাজা, আমার বীর।
সন্দেহ নেই পুরূরবার স্ত্রী ছিলেন আরও কয়েকজন–সুজুর্নি, শ্রেণি, আপি, গ্রন্থিনী প্রমুখ। কিন্তু উর্বশী চলে আসার পর তাদের কারও সাহস হয়নি বিরহে আকুল রাজাকে সঙ্গ দেওয়ার। উর্বশী সে সব কথা জানেন। রাজাকে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন–পৃথিবী পালনের জন্য আমার গর্ভে পুত্র লাভ করেছ তুমি। কিন্তু তুমি তো আমার কথা শোেননি। আমি তো বারবার বলেছি, কী হলে আমি তোমার সঙ্গে থাকব। তুমি শোননি। এখন আর এত কথা বলে কী লাভ-অশাসং বা বিদুষী সস্মিন্নহঃ ম আশৃণোঃ কিমভুগবদাসি।
উর্বশী পূর্বশর্তের কথা স্মরণ করিয়েও পুত্র জন্মের সান্ত্বনা দিয়ে পুরূরবার দর কয়ে সুখের কোমল প্রলেপ দিয়েছেন এবং শেষ কথা বলেছেন নির্দ্বিধায়–তুমি ঘরে ফিরে যাও। আর তুমি আমাকে পাবে না–পরে হ্যস্তং নহি মূঢ়মাপঃ। উর্বশীর কথা শুনে পুরূরবা মরতে চেয়েছেন। বলেছেন–তোমার প্রণয়ী দূর হয়ে যাক তোমার সামনে থেকে। সে যেন মরণের কোলে শয়ন করে, হিংস্র নেকড়েরা খেয়ে নিক তাকে–অধা শয়ীত নিয়তেরুপস্থে অধৈনং বৃকা রভসাসো, অদ্যুঃ। উর্বশী সপ্রণয়ে বলেছেন–এমন করে মরতে চেয়ো না পুরূরবা, এমন করে নষ্ট কোরো না নিজেকে। তুমি কি জান না মেয়েদের মন কেমন কঠিন। স্ত্রীলোকের হৃদয় এবং নেকড়ের হৃদয় একই রকম, স্ত্রীলোকের ভালবাসা কি স্থায়ী হয় কখনও-ন বৈ স্ত্রৈণানি। সখ্যানি সন্তি সালাবৃকাণাং হৃদয়ান্যেতাঃ। পুরূরবা তবু বলেছেন–তুমি ফিরে এস উর্বশী। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে তোমার বিরহে-নিবর্তস্ব হৃদয়ং তপ্যতে মে।
