যাই হোক, পুরূরবার ভালবাসায় উর্বশী যখন আরও বেশি ভালবেসে ফেলেছেন তার মর্ত্যভূমির হৃদয়-রাজাকে এবং সেই ভালবাসায় যখন তিনি স্বর্গভূমির সুখস্মৃতিও ভুলতে বসেছেন–প্রতিদিন-প্রবর্ধমানানুরাগা অমরলোক-বাসেপি ন স্পৃহাং চকার–ঠিক তখনই বুঝি মন্ত্রণা-সভা বসল গন্ধর্বলোকে অথবা একেবারে ইন্দ্রসভায়। উর্বশীকে মর্ত্যভূমি থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে ঊর্ধ্বলোকে। ঠিক এই জায়গায় শতপথ ব্রাহ্মণে আমরা দুটি মেষ-শিশুর আবির্ভাব দেখতে পাচ্ছি–যে মেষ-শিশু দুটিকে গন্ধর্বরা এই এক্ষুনি গিয়ে অলক্ষিতে বেঁধে দিয়ে এলেন উর্বশীর শয্যার দুই পাশে–তস্যৈ হাবিদ্বয়ুরণা শয়ন উপবদ্ধাস। পুরাণের বর্ণনায় অবশ্য মেষ-দুটি বহু আগে থেকেই আছে।
প্রতিষ্ঠান-পুরের চারপাশে তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। রাজা অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে উর্বশীর আলিঙ্গনসুখে মত্ত আছেন। আবরণ-বস্ত্রের মর্যাদা নেই সামান্যতম। ঠিক এই সময় গন্ধর্ব বিশ্বাবসু অন্য গন্ধর্বদের সঙ্গে নিয়ে উর্বশীর অলক্ষে হরণ করে নিলেন একটি মেষশিশু। মেষের ডাক শুনে উর্বশীর প্রেমাচ্ছন্ন নিদ্রাসুখ ভগ্ন হল। তিনি হাহাকারে কেঁদে উঠলেন–আমার বীর স্বামী বেঁচে নেই নিশ্চয়, অথবা সহায় নেই সমব্যথী কোনও মানুষ, নইলে পুত্রস্নেহে লালিত আমার এই মেষশিশুটিকে হরণ করল কে–শতপথ ব্রাহ্মণের ভাষায়-অবীর ইব বত মে’জন ইব পুত্রং হরন্তীতি। গন্ধর্বরা ততক্ষণে দ্বিতীয় মেষ-শিশুটিকেও হরণ করেছেন। উর্বশীর আর্তি শোনা গেল আবার একই ভাষায়–আমার স্বামী নেই, সহায় নেই–সা হ তথৈবোবাচ।
প্রথম মেষশিশুটি হৃত হবার সঙ্গে সঙ্গেই রাজা পুরূরবা টের পেয়েছেন। বিশেষত উর্বশীর আক্ষেপ-বচনও তার কানে গেছে। তিনি শুধু ইতস্তত করছিলেন। মেষচোর খুঁজবার জন্য ক্ষীণ দীপবর্তিকাটি জ্বালালেও যে উর্বশী তাকে নগ্ন অবস্থায় দেখতে পাবেন। আর তেমন দেখলে তো উর্বশী আর দ্বিতীয়বার লজ্জিত বাসর-সজ্জায় সজ্জিত হয়ে ধরা দেবেন না পুরূরবার বাহুবন্ধনে। কিন্তু দ্বিতীয় মেষ শিশুটি হরণের পরে উর্বশীর ধিক্কার যেন রাজার হৃদয়ে শেল বিধিয়ে দিল। সুরশত্রু কেশী-দমন বীর রাজার পক্ষে এই অপবাদ সহ্য করা কঠিন হল। আর সত্যিই তো উর্বশী রাজার সম্বন্ধে মোটেই ভাল কথা বলেননি। শতপথ ব্রাহ্মণের ক্ষুদ্র দুটি কথা–”অবীর, অজন’–পুরাণের শব্দে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়-বীরের ব’ নেই, নিজেই নিজেকে শুধু বীর মনে করে এমন একটা ক্লীব অসভ্য লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে–হতাস্ম্যহং কুনাথেন নপুংসা বীরমানিনা। নইলে চোরে আমার ছেলে নিয়ে পালাচ্ছে আর উনি কিনা পুরুষ হয়েও মেয়েছেলের মতো দিনের বেলায় দরজা বন্ধ করে ভয়ে ঘরের মধ্যে সেধিয়ে আছেন-যঃ শেতে নিশি সন্ত্ৰস্তো যথা নারী দিবা পুমান।
যে উর্বশী পুরূরবার হৃদয়হারিণী বলে কথা, আকস্মিক তার এই ভাব-পরিবর্তন রাজা পুরূরবাকে একবারে বিভ্রান্ত করে তুলল। তিনি যথাবৎ নগ্ন অবস্থাতেই উর্বশীর মেষ খুঁজতে যাবার উপক্রম করলেন। গন্ধর্বরা সময় বুঝে বিদ্যুতের জ্যোতির এক ঝলক সৃষ্টি করলেন নিমেষে। চল চপলার চকিত চমকে উর্বশী দেখলেন–রাজা উলঙ্গ। সঙ্গে সঙ্গে মর্ত্য রাজার এতদিনের ভালবাসা তুচ্ছ করে উর্বশী প্রতিষ্ঠান-পুরের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলেন চিরদিনের মতো–তৎপ্ৰভয়া চোৰ্বশী রাজান অপগতাম্বরং দৃষা অপবৃত্তসময় তৎক্ষণাদেব অপক্ৰান্তা। যে আকাক্ষার মধ্যে রাজার প্রতিজ্ঞা ধ্বনিত হয়েছিল–আমাদের ভালবাসা হোক চিরন্তনী–রতি ণৌ শাশ্বতীঃ সমাঃ–এক মুহূর্তে সেই ভালবাসার বাঁধন ভেঙে দিলেন উর্বশী।
বিদগ্ধা স্ত্রীর কাছে আত্মগৌরব সাহংকারে প্রকাশ করার জন্য সেই মধ্যরাত্রেই রাজা নগ্ন অবস্থাতেই বেরলেন মেষ চোর ধরে আনতে। গন্ধর্বরা চকিত আলোর মায়া সৃষ্টি করেই বুঝেছেন–দেবকার্য সিদ্ধ হয়েছে। তারা মেষ শাবক দুটি ফেলে রেখে পালিয়ে চলে গেলেন। রাজাও উর্বশী খুশি হবেন ভেবে সানন্দে মেষ দুটি হাতে নিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন। দেখলেন শুন্য শয্যা। প্রিয়তমা পত্নী কোথায় চলে গেছেন। উর্বশীর প্রেমে উন্মত্ত রাজা সেই নগ্ন অবস্থাতেই তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন–তাঞ্চ অপশ্য অপগতাম্বর এব উন্মত্তরূপে বভ্রাম। সেই নন্দনবন, চৈত্ররথ, অলকা, গন্ধমাদন-সর্বত্র ঘুরেও রাজা উর্বশীর খোঁজ পেলেন না। বুঝলেন–প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয়ে গেছে। গান্ধর্ব মায়ার চকিত আলোকে উর্বশী তাকে নগ্ন দেখেই তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। বুঝলেন—
ফিরিবে না, ফিরিবে না, অস্ত গেছে সে গৌরবশশী,
অস্তাচলবাসিনী উর্বশী।
হলফ করে বলতে পারি-রবিঠাকুর যখন উর্বশীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, তখন তিনি উর্বশী-পুরূরবার সূর্যপর ব্যাখ্যাটুকু জানতেন। অর্থাৎ পাশ্চাত্যমতে এবং খানিকটা বৈদিক যুক্তিতেও পুরূরবা সূর্যের প্রতীক এবং উর্বশী ঊষার। তত্ত্বটুকু তার জানা ছিল বলেই উর্বশী কবিতায় অসম্ভব নিপুণতায় কবি অন্তত তিনটি পংক্তি প্রয়োগ করেছেন- (১) উষার উদয় সম অনবগুষ্ঠিতা, (২) স্বর্গের উদয়াচলে মূর্তিমতী তুমি হে উষসী, (৩) প্রথম সে তনুখানি দেখা দিবে প্রথম প্রভাতে। তবে এই সব তত্ত্বের ওপরেও বলতে হবে-”উর্বশী’ কবিতায় তার শব্দপ্রয়োগের সবচেয়ে বেশি সার্থকতা আছে ‘ক্রন্দসী’ শব্দটির মধ্যে–ওই শুন দিশে দিশে তোমা লাগি কাদিছে ক্রন্দসী। ক্রন্দসী’ শব্দটি একেবারে পাক্কা বৈদিক প্রয়োগ, যার মানে টীকাকার সায়নাচার্য করেছেন ‘দ্যাবাপৃথিবী’; আরও সহজ করলে দাঁড়ায় দ্যুলোক এবং ভূলোক। উর্বশী এমনই এক প্রার্থনীয়া রমনী যার জন্য স্বর্গ-মর্ত্যে কান্নার রোল ওঠে। উর্বশী স্বর্গভূমি ছেড়ে চলে এসেছিলেন মর্ত্যরাজার প্রেমে, তখন দেবতা-গন্ধর্বদের মধ্যে তাকে পাবার জন্য যে হাহাকার উঠেছিল, আজ সেই হাহাকার সংক্রমিত হয়েছে পুরূরবার হৃদয়ে। উর্বশীর জন্য মর্ত্যভূমির হাহাকার ভেসে বেড়াচ্ছে বনে বনান্তরে। রাজা পুরূরবা নগ্ন হয়ে উম্মত্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন যদি প্রিয়তমা পত্নীকে একবার চোখের দেখাও দেখতে পান–
