পণ্ডিতেরা অনুমান করেন– পুরূরবা-উর্বশী কাহিনীর দুটি স্তর আছে। সবচেয়ে পুরাতন স্তরটি– যা ঋগবেদে দেখতে পাই, তা অবশ্যই বিয়োগান্ত। কোশাম্বী (D.D.Kosambi) নানা জামান পণ্ডিতের মত আলোচনা তুলে দিয়ে বলেছেন-Her mann Oldenberg’s discussion postulates a lost prose shell for the Vedic hymn without attempting to explain its many intrinsic difficulties. The original suggestion was made by Windisch, on the model of Irish myth and legend. The argument is that the Satapatha Brahmana version is much more comprehensible than the bare Rgveda dialogue, hence some such explanatory padding must originally have existed.
ঠিক এই কারণেই আমাদের শতপথ ব্রাহ্মণের পুরূর-উর্বশী সংক্রান্ত উপাখ্যানটি উল্লেখ করতে হবে। করতে হবে, কারণ মহাভারত-পুরাণের কাহিনীর সঙ্গে শতপথের মিল সবচেয়ে বেশি। এমনকি গেলড়নারের মতো জামান পন্ডিত শতপথের কাহিনীটিকে বেশি গুরুত্ব না দিলেও পুরূরবা-উর্বশীর কাহিনীকে ইতিহাসের মর্যাদা দিয়েছেন–the whole episode was just one more of many such itihasa-puranas.
শতপথ ব্রাহ্মণে দেখছি–উর্বশীর সঙ্গে পুরূরবার যখন বিয়ে হয়, তখন উর্বশীর শর্তাবলীর মধ্যে মেষশিশু-দুটি রক্ষা করার শর্ত প্রথমেই ছিল না। শতপথের শর্তাবলীতে রীতিমতো আধুনিকা রমণীর পরিচ্ছন্নতা এবং বিদগ্ধতা আছে। উর্বশী বলেছেন– দিনের মধ্যে তিনবার তুমি আমার সঙ্গে আলিঙ্গন-রমণে মিলিত হতে পারবে রাজা! তবে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তুমি যেন কখনও আমার শয্যায় এসো না। আরও একটা কথা, আমি যেন কখনও তোমায় নগ্ন না দেখি। আমাদের মতো মেয়েদের সঙ্গে গভীরভাবে মেলামেশা করার এই নিয়ম–অকামা স্ম মা নিপদ্যাসৈ মো স্ম ত্বা নগ্নং দর্শমেষ বৈ ন স্ত্রীণামুপচার ইতি।
দেখুন, শতপথের বিবরণে প্রথমে মেষশিশুর শর্ত নেই কোথাও, তবে পরে মেষশিশুর প্রসঙ্গ এসেছে। আবার উর্বশীর ঘৃতাহারেরর প্রসঙ্গটি শতপথেও নেই, কিন্তু খোদ ঋগবেদেই তার উল্লেখ আছে যেহেতু, তাই পৌরাণিকেরা সেই সূত্র ধরেই একেবারে প্রথম মিলনের শর্তাবলীর মধ্যে ঘৃতাহারের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। পরের ঘটনাগুলি শতপথ ব্রাহ্মণ, পুরাণ এবং ঋগবেদ মিলিয়ে এইরকম দাঁড়াবে–
শতপথ বলেছে– তারপর উর্বশী বঙ্কাল বাস করলেন পুরূরবার সঙ্গে এবং এতকালই রইলেন যে, তিনি গর্ভিণীও হলেন–সা হাস্মিজ্যোণ্ডবাস। অপি হাস্মাগর্ভিণ্যাস।
শতপথের ভাষা প্রায় বেদের ভাষা, সাধারণ সংস্কৃতজ্ঞের বোধগম্য নয় তত। কিন্তু পৌরাণিকেরা ভাষার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উর্বশীর মর্তবাসে বহুকাল থাকারও অর্থ খুঁজে পেয়েছেন আধুনিক স্বচ্ছতায়। স্বপ্নলোকের অভীষ্টতমা রমণীটিকে স্ত্রী হিসেবে লাভ করে পুরূরবার মন আর ঘরে টিকল না। কত সুন্দর সুন্দর জায়গায় তিনি ঘুরে বেড়ালেন উর্বশীকে নিয়ে। এমন সব জায়গা নিসর্গসৌন্দর্য যেখানে স্বর্গের আভাস দেয়, মনে হয় দেবতাদের বিলাসভূমি যেন ভূলোকে নামিত। নন্দনবন, চৈত্ররথনবন, অলকাপুরী-এই সমস্ত স্থানে উর্বশীর সঙ্গসুখে দিন কাটাতে লাগলেন পুরূরবারেমে সূর-বিহারে কামং চৈত্ররথাদি। কতদিন কেটে গেল রাজার, উর্বশীর সুখামোদী মিলন-চুম্বনে।
ওদিকে নন্দনবাসিনীর অভাবে স্বর্গপুরী অন্ধকার। দেবরাজ ইন্দ্র দিনে দিনে বিষণ্ণ হয়ে উঠছেন। উর্বশীর পদছন্দোহীন নৃত্যগীত স্বর্গের ইন্দ্রসভায় আর তেমন জমে ওঠে না। নায়িকাশ্রেষ্ঠের অভাবে ভরত মুনির নাট্য সম্প্রদায় ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। নামভূমিকায় উর্বশীহীন রঙ্গমঞ্চ- সে যেন প্রাণহীন শবশরীরের উদবর্তন। দেবরাজ গন্ধর্বদের ডেকে বললেন- আর নয়, এবার উর্বশীকে স্বর্গে নিয়ে এসো পুনরায়। উর্বশী ছাড়া আমার এই দেবসভা নিতান্তই বেমানান–উর্বশী-রহিতং মহামাস্থানং নাতিশোভতে।
শতপথ ব্রাহ্মণে দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে গন্ধবদের কোনও মন্ত্রণা নেই। সেখানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন স্বয়ং গন্ধর্বরা। তার কারণও আছে। খোদ বেদের মধ্যে অপ্সরারা সর্বত্রই প্রায় গন্ধর্বপত্নী–তাভ্যো গন্ধর্বপত্নীভ্যোম্পায়া’করং নমঃ। বেদের মতো পুরাণে-ইতিহাসেও সর্বত্র অপ্সরাদের নাম উচ্চারিত হয় গন্ধর্বদের সঙ্গে এক নিঃশ্বসে। ভাগবতে কৃষ্ণের রাসনৃত্যের সময়ও অপ্সরা এবং গন্ধর্বদের একসঙ্গে নৃত্যের তালে তালে নাচ-গান করতে দেখছি–জগু-গন্ধর্বপতয়ো নতুশ্চাঙ্গরোগণাঃ। তবু যে পৌরাণিকেরা উর্বশীর যন্ত্রণায় দেবরাজের মন্ত্রণসভা বসালেন গন্ধর্বদের সঙ্গে, তারও একটা তাৎপর্য আছে। বেদের মধ্যে অপ্সরারা প্রধানত গন্ধর্বপত্নী বলে পরিচিত হলেও দেবতাদের সঙ্গে তাদের যে একটা ভোগ্যসম্বন্ধ আছে, সে কথাও বেদের মধ্যেই প্রকট হয়ে উঠেছে। কুত্রাপি যেমন তাদের ‘দেবপত্নী’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে দেবপত্নীরাবধীত–তেমনই প্রকট হয়ে উঠেছে দেবতাদের সঙ্গে অপ্সরাদের প্রায় অবৈধ কোনও সম্পর্ক অঙ্গরাজার উপসিম্বিয়াণা। দেবতারা অপ্সরাদের ‘জার’ অর্থাৎ উপপতি প্রেমিক। কাজেই উর্বশীর অভাবে গন্ধর্বরা যেমন চিন্তিত হতে পারেন, তেমনই বিচলিত হতে পারেন দেবতারা, এমনকি দেবরাজও।
