দুটি অভিশাপ। মিত্রাবরুণের অভিশাপ এবং ভরত মুনির অভিশাপ দুটির তাৎপর্যই এক। কালিদাসের রসচেতনায় ভরত মুনির অভিশাপের কাঠিন্য, দেবরাজ ইন্দ্রের করুণাধারায় কোমল হয়ে গেছে। দেবরাজ স্বর্গসুন্দরীর মনের খবর রাখেন। অতএব লক্ষ্মী-স্বয়ংবরের শেষ অঙ্কের যবনিকা-পাতের সঙ্গে সঙ্গে উর্বশী যখন নিজের ভ্রান্তিতে লজ্জায় আনত হলেন দেবরাজের। সামনে, দেবরাজ তখন উত্তম বিদগ্ধ পুরুষের মতো উর্বশীকে বললেন-ভয় পেয়ো না, সুন্দরী! যাকে তুমি ভালবাস, তোমার হৃদয় যেখানে বাঁধা পড়েছে সেই সমর-বিজয়ী রাজর্ষির। প্রিয়ত্ব সাধন করার এই তো সুযোগ। তুমি সেই পুরূরবার কাছে যাও। যতদিন তিনি তোমার কোল-আলো করে পুত্ৰমুখ না দেখেন, ততদিন অন্তত তুমি তাঁর সেবা করো–সা ত্বং যথাকামাং পুরূরবসমুপতিষ্ঠস্ব যাবৎ স ত্বয়ি দৃষ্টসন্তানো ভবেদিতি।
উর্বশীর মর্ত্যভূমিতে অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও কালিদাসের নাটক থেকে পুনরায় পুরাণের উপাখ্যানে উত্তরণ করব। বস্তুত পৌরাণিকদের জবানীতেও পুরূরবা-উর্বশীর জীবন-বৃত্তান্ত বড় কম নাটকীয় নয়, আর সেই নাটকীয়তা নেমে আসছে একেবারে ঋগবেদ থেকে। তথাচ ঋগবেদের কাহিনী এবং শতপথ ব্রাহ্মণের প্রাচীন বর্ণনায় যথেষ্ট নাটকীয়তা আছে বলেই মহাভারতের বক্তব্য এখানে একেবারেই সংক্ষিপ্ত। তবুও সব মিলিয়ে সে কাহিনীর একটা পুনর্গঠিত রূপ দেবার চেষ্টা করা যেতেই পারে।
ভাগবত পুরাণ লক্ষ্য করেছে- ইন্দ্রসভায় উর্বশী যখন অভিনয় করছিলেন, তখন তার মনঃসংযোগের অভাব ঘটার একটা কারণও ছিল। দেবর্ষি নারদ-স্বর্গ থেকে মর্ত্য এবং মর্ত্য থেকে স্বর্গ পর্যন্ত যার বীণা বাজিয়ে ঘোরার অভ্যাস, সেই নারদ ইন্দ্রসভায় এসে বীণার ঝংকারে শুধু পুরূরবার গুণগান করছিলেন। এই গানই উর্বশীর কাল হল। গানের সুরে কীর্তিশালী পুরূরবার নামমন্ত্র উর্বশীর কানে ঢুকে পুরুষোত্তম বিষ্ণুর নাম ভুলিয়ে দিল। তার পরেই নেমে এল ভরত-মুনির শাপ।
অভিশাপের শব্দ শুনে উর্বশীর প্রাণে ভয় হয়নি অন্যত্র যেমনটা হয়– শাপদাতা কুদ্ধ ব্যক্তির পায়ে ধরে শাপমুক্তির উপায় ভিক্ষা–সেই ভিক্ষাও উর্বশী করেননি ভরতমুনির কাছে। দেবরাজের সান্ত্বনা শুধু নয়, তিনি জানতেন– মর্ত্যভূমিতে রাজা পুরূরবাই সেই উপযুক্ত বিদগ্ধ পুরুষ, যিনি স্বর্গসুন্দর উর্বশীর মর্যাদা বুঝবেন। রাজা পুরুরবার রূপ, গুণ, ঐশ্বর্য এবং মানসিক উদারতা কোনওটাই কম নয় এবং পূর্বাহ্নেই উর্বশী সেই সব গুণের বশীভূত হয়েই ছিলেন। স্বর্গভূমি ছেড়ে এসে উর্বশী যেদিন রাজার সামনে এলেন, সেদিন পুরূরবার বিস্ময় কিছু কম ছিল না। স্বর্গসুন্দরী উর্বশীকে তিনি এত সহজে পাবেন, এ তিনি কল্পনা করতে পারেননি।
উর্বশী স্বর্গভূমির উচ্চতা থেকে মাটিতে নেমে এলেন স্বর্গের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে, শ্ৰেষ্ঠতার অভিমান বিসর্জন দিয়ে–অপহায় মানমশেষ অপাস্য স্বর্গসুখাভিলাষ। তার শরীর-মন জুড়ে রইল শুধু মর্ত্য রাজা পুরূরবা। আর পুরূরবার অবস্থা কী হল? পুরূরবা এবার ভাল করে দেখলেন। দেখলেন–পৃথিবীতে স্ত্রীলোকের সৌন্দর্য যে চরম বিটি স্পর্শ কতে পারে উর্বশীর সৌন্দর্য তার চেয়েও বেশি কিছু–তব স্তনভার হতে নভস্তলে খসি পড়ে তারা/অকস্মাৎ পুরুষের বক্ষোমাঝে চিত্ত আত্মহারা। সুকুমার লাবণ্যবিলাসের মধ্যে উর্বশীর মোহন হাসিটুকু ছিল এমনই যে, রাজা পুরুরবা সেই মুহূর্তেই উর্বশীর কাছে বিনা মূল্যে বিকিয়ে গেলেন তদায়ত্তচিত্তবৃত্তি। রাজা বললেন-বোসো তুমি। বলল তোমার কী প্রিয় সাধন করব? তুমি আমার সঙ্গে চিরকাল থাকবে, চিরকাল আমরা দুজনে দুজনকে ভালবাসব–সংরমস্ব ময়া সাকং রতিণে শাশ্বতীঃ সমা।
বিদগ্ধ সুন্দরী পুরুষের মধুর কথা দ্বিগুণ মধুরতায় ফিরিয়ে দিতে জানেন। উর্বশী বললেন সুন্দর আমার। তোমাকে দেখার পরেও কোন রমণী চোখ ফিরিয়ে নেবে অন্য দিকে? কেই বা মন না দিয়ে থাকবে তোমাকে কস্যায়ি ন সঙ্কেত মনো দৃষ্টি সুন্দর? পুরূরবা এবং উর্বশী–দুজনে দুজনের সামনে বসলেন। সেই মুহূর্তে তাদের একজনের আরেকজন ছাড়া অন্য কোনও বিষয় ছিল না চিন্তা করার মতো অন্য কোনও বিষয় ছিল না দৃষ্টি দেবার মতো। রাজা বললেন–আমি তোমাকে চাই, সুব্ধ। তোমার প্রসন্নতা আর অনুরাগ আমার একমাত্র কাম্য। রাজার কথা শুনে উর্বশী লজ্জায় খণ্ডিত হয়ে বললেন-আমাদের মিলনে অন্য কোনও বাধাই নেই। কিন্তু আমার দিক থেকে কয়েকটি শর্ত আছে, মহারাজ।
উর্বশী বললেন–আমার সঙ্গে দুটি মেষ শিশু আছে। মেষ দুটিকে আমি পুত্রস্নেহে পালন করি। সেই মেষ দুটি বাঁধা থাকবে আমার বিছানার পাশে। তুমি সে দুটিকে কখনও সরিয়ে নেবে না আমার কাছ থেকে–শয়ন-সমীপে মমোরণবয়ং পুত্রভূতং নাপনেয়। এই আমার প্রথম শর্ত। আমার দ্বিতীয় শর্ত–আমি যেন তোমাকে উলঙ্গ না দেখি, মহারাজ। তৃতীয় শর্ত–আমি শুধু মাত্র ঘি খেয়ে থাকব-ঘৃতামাত্রঞ্চ মমাহার ইতি। রাজা পুরূরবা সমস্ত শর্ত মেনে নিয়ে বললেন–তাই হবে-এবমস্তু।
পুরূরবা-উর্বশী বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করার আগে আমরা একটা জরুরি কথা সেরে নিই। এখুনি যে উর্বশীর মুখে প্রাক্ বিবাহের শর্তাবলী শুনলাম–এই শর্তগুলি সমস্ত পুরাণে একই রকম। কিন্তু সবচেয়ে প্রাচীন যে গ্রন্থটি থেকে এই শর্তাবলীর কথা পুরাণগুলিতে এসেছে তার নাম শতপথ ব্রাহ্মণ, যা ঋগবেদের অব্যবহিত পরবর্তী কালেই রচিত। ঋগবেদে যে কাহিনীটুকু পাই তাতে মনে হয় উর্বশীর সঙ্গে পুরূরবার যেন পুর্বে মিলন হয়েছিল। সেই মিলনের পর উর্বশী রাজাকে ছেড়ে চলে গেছেন এবং কোনও ক্রমে আবারও দেখা হয়েছে অধিষ্যমান পুরূরবার সঙ্গে। পুরূরবা আকুল প্রেমিকের মতো তাকে ছেড়ে যেতে না করছেন এবং উর্বশী আপন তর্কযুক্তিতে রাজাকে নিরস্ত করে ফিরে যেতে বলছেন। এই হল ঋগবেদ।
