বস্তুত এই জ্যোতি-ত্যাগের ঘটনাই পরবর্তী আখ্যানভাগে বীর্যস্থলনে রূপান্তরিত হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু জ্যোতি-ত্যাগের সময় মনোজাত সেই পুত্রের রূপ দেখতে পাওয়া মানে তো আধুনিক অনুবাদে–তুই আমার ঠাকুরের সনে ছিলি পূজার সিংহাসনে। পৌরাণিকেরা কিন্তু বেদের সারল্য আরও বৃহত্তর সরসতায় ঢেকে দিয়েছেন। উর্বশীকে দেখে আপন শারীর-বৃত্তি স্খলিত হওয়ায় মিত্রাবরুণ ক্ষুব্ধ হলেন উর্বশীর উপরেই। রাগ করে বললেন তোমার জন্য যখন আমাদের এই দুর্গতি হল, অতএব স্বর্গে তোমার ঠাই হবে না। যেতে হবে মত্যলোকে, অনুভব করতে হবে মত্যভূমির দুঃখ-কষ্ট, রাগ-অনুরাগ, বিরহ। এই শাপের মধ্যেই বর আছে। আসছি সে কথায়।
.
২৩.
মহারাজ পুরূরবা উর্বশীকে কেশী দানবের হাত থেকে উদ্ধার করে দিয়েছেন–এই ঘটনা স্বর্গরাজ্যে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিল। ইন্দ্রসভায় উৎসবের আমেজ এসে গেল। স্বয়ং দেবরাজ নাট্যগুরু ভরত-মুনিকে খবর দিলেন নাটক পরিবেশন করার জন্য। নাট্যগুরু তার নাট্য-সম্প্রদায় নিয়ে এসে গেলেন। তার নাটকের নাম লক্ষ্মী-স্বয়ংবর। সম্ভবত সমুদ্রমন্থনের পর লক্ষ্মী যখন দেবী উঠে এলেন সমুদ্রের অন্তর থেকে, তখন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এবং সমস্ত দেবতাকে দেখে কাকে তিনি স্বামী হিসেবে বরণ করবেন এই সব ঘটনা নিয়েই ভরত মুনি তার নাটকের গ্রন্থনা করেছিলেন। এই নাটক আগেও ইন্দ্রসভায় অভিনীত হয়েছে এবং তাতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন উর্বশী। রম্ভা-মেনকা প্রমুখ অপ্সরারাও বিভিন্ন ভূমিকায় সার্থক অভিনয় করেছেন। আজ উর্বশীর প্রত্যাবর্তনের পর ভরতমুনি সেই নাটকটাই আবার অভিনয় করাবেন বলে ঠিক করলেন।
এদিকে উর্বশীর মনের অবস্থা খুব খারাপ। মত রাজা যখন নিজের ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখা দিলেন, সেই বিপন্ন মুহূর্ত থেকেই পুরূরবা উর্বশীর মনের মধ্যে প্রবেশ করেছেন। স্বর্গভূমিতে আর তার মন টেকে না, ভাল লাগে না কোনও কাজ, এমনকি ইন্দ্রসভার নৃত্য-গীতের আসরও বিরস হয়ে গেছে তার কাছে। প্রিয়সখী চিত্রলেখা তার মনের কথা জানেন। বন্ধুর প্রতি সহমর্মিতায় তিনি পুরূরবার খোঁজও নিয়েছেন দু-একবার। এ প্রেম শুধুই তার প্রিয়সখীর দিক থেকে একতরফা, নাকি মর্ত্য রাজা একেবারেই উদাসীন, সে খোঁজও চিত্রলেখা নিয়েছেন। একদিন তো স্বর্গীয় আকাশ-যানে চড়ে পুরূরবার রাজধানী প্রতিষ্ঠান নগরীর ওপর দিয়ে ঘোরাঘুরিও করেছেন উর্বশীকে সঙ্গে নিয়ে। উর্বশী রাজার সঙ্গে দেখা করেননি বটে, তবে কথা শুনেছেন। চিত্রলেখা অবশ্য দেখাই করে এসেছেন রাজার সঙ্গে। রাজা বলেছেন–গঙ্গা-যমুনার সঙ্গম একবার যে দেখেছে তার কি আর গঙ্গাপ্রাবহ-হীন যমুনা শুধু ভাল লাগে? তোমার সখী নেই তোমার সঙ্গে, একাকিনী তোমার সঙ্গ–যেন গঙ্গা ছাড়া যমুনা-সঙ্গমে পূর্বদৃষ্টে যমুনা গঙ্গয়া বিনা। কথাটা উর্বশীর ভাল লেগেছে। কিন্তু মনের এই প্রেম-মেদুর দোলার মধ্যে লক্ষ্মী-স্বয়ংবর নাটকের নামভূমিকায় লক্ষ্মীর অভিনয় করতে হবে তাকে। বুড়ো ভরতমুনি যুবতীর মন বোঝেন না। তিনি ভাবেন বুঝি অপ্সরা মানেই দেবজনের মনোরঞ্জনের যন্ত্রমাত্র। প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছ থেকে অপ্সরাদের তিনি চেয়েই নিয়েছিলেন অভিনয়ের জন্য। কিন্তু উর্বশী কি সেই সাধারণী অপ্সরাদের মতো? তার যে মন আছে। কিন্তু উপায় কী? ভরত-মুনির নাট্য সম্প্রদায়ে উর্বশী প্রধান নায়িকা। তাকে তো অভিনয় করতেই হবে।
নাটক আরম্ভ হল। লক্ষ্মীর ভূমিকায় উর্বশী নাটকের ‘পার্ট’ বলতে আরম্ভ করেছেন। তার প্রিয়বান্ধবী বারুণীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন অভিজ্ঞ মেনকা। লক্ষ্মীবেশে উর্বশী যেন দেব-দানবের সমুদ্রমন্থন থেকে এখনই উঠে এসেছেন আদিম বসন্তপ্রাতে, মন্থিত সাগরে। ডান হাতে সুধাপাত্র, বিষভান্ড লয়ে বাম করে। সমুদ্রের ধারে দেব-দানব এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মধ্যে একতম স্বামী-রূপে কাকে লক্ষ্মী বরণ করবেন–এই ছিল বারুণী-মেনকার প্রশ্ন-সখি সমাগতা এতে ত্রৈলোক্য-সুপুরুষাঃ সকেশবাশ্চ লোকাঁপালা। কমেস্মিংস্তে ভাবাবিনিবেশঃ। ঠিক এইখানে লক্ষ্মীদেবীর দ্বিধাহীন উত্তর আসবার কথা –পুরুষোত্তম বিষ্ণুর প্রতিই আমার একমাত্র নিষ্ঠা। কিন্তু ‘পুরুষোত্তম’ শব্দটি আর লক্ষ্মীর মুখে উচ্চারিত হল না। লক্ষ্মীর মধ্যে থেকে কথা কয়ে উঠলেন উর্বশী এবং পুরুষোত্তমের জায়গায়। লক্ষ্মী বলে উঠলেন আমি ভালবাসি পুরূরবকে– ততস্তয়া পুরুষোত্তম ইতি ভণিতব্যে পূরবসি ইতি নির্গত বাণী।
সভাভর্তি দেব-দর্শকদের সামনে ‘পুরুষোত্তম’ শব্দের পরিবর্তে ভুল ‘পার্ট’ বলে পুরূরবার। নাম উচ্চরণ করার ফলে নাট্যগুরু ভরত মুনির রাগ হয়ে গেল খুব। তার মুখ দিয়ে কঠিন অভিশাপ নেমে এল উর্বশীর ওপর দেব স্থান স্বর্গভূমিতে তোমার স্থান হবে না কোনও, তোমায় যেতে হবে মর্ত্যভূমিতে। রবীন্দ্রনাথের কমলিকা-অরুণেশ্বরের কাহিনী যাদের মনে আছে, এই অভিশাপের মর্ম বুঝতে তাঁদের অসুবিধা হবে না। ঠিক ছন্দপতন অপরাধের সঙ্গে মিললেও স্বর্গসুন্দরী উর্বশীর মর্ত্যভূমিতে অবতরণের মধ্যে সেখানে দুঃখ পাবে দুঃখ দেবে-এই মর্মান্তিক সত্যটুকু অভিশাপের সমস্ত তীক্ষ্ণতা নিয়ে উপস্থিত।
