চিত্রলেখার উৎকণ্ঠা আর রাজার মধুর সান্ত্বনাবাক্যেই যেন উর্বশীর সংজ্ঞা ফিরে এল আস্তে আস্তে। চিত্রলেখা বললেন–আর ভয় নেই হতভাগা অসুরেরা পালিয়েছে। উর্বশী তখনও রাজাকে দেখতে পাননি। বললেন– কে তাদের তাড়াল রে? আমাদের ইন্দ্রদেব? চিত্রলেখা বললেন–হ্যাঁ, ইন্দ্রের মতোই তার ক্ষমতা বটে, তবে তিনি ইন্দ্র নন, তিনি হলেন আমাদের মত্যভূমির রাজা পুরূরবা। কথাটা শুনেই উর্বশী রাজার দিকে চাইলেন। নিমেষের মধ্যে তার মৌখিক প্রতিক্রিয়া শোনা গেল–তাহলে তো দানবরা আমার উপকার করছে, ব–উপকৃতং খলু দানবৈঃ।
বোঝা গেল– পুরূরবাকে উর্বশী পূর্বে দেখেছেন। হয়তো ইন্দ্রসভায়ই ইন্দ্রের সঙ্গে অলস বিশ্রম্ভালাপে, হয়তো পূর্বে কতবার দেবসেনার অগ্রভাগে যুদ্ধসজ্জায় সজ্জিত পুরূরবাকে দেখেছেন উর্বশী। মর্ত্যভূমির রাজাকে তার ভাল লেগেছিল। মনে মনে তার মুগ্ধতা ছিল প্রচ্ছন্ন, অপরিস্ফুট। মৎস্যপুরাণের বর্ণনায় পুরুরবা কেশী দানবের হাত থেকে উর্বশীকে উদ্ধার করে নিজে দিয়ে এসেছিলেন ইন্দ্রের কাছে ইন্দ্রলোকে। এই ঘটনায় সমস্ত দেবতার সঙ্গে পুরুরবার বন্ধুত্ব দৃঢ়তর হয়েছিল। স্বয়ং ইন্দ্ৰ মৰ্ত রাজার কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ হয়ে রাজাকে সর্বলোকের প্রভুত্ব এবং যশ দান করেছিলেন।
কিন্তু কালিদাসের নাটকীয়তায় রাজা অত সহজে ধরা দেন না। সেখানে গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ উর্বশীকে নিতে এসে রাজাকে স্বর্গে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালে রাজার সময় থাকে না। উর্বশীর সঙ্গ সেচ্ছায় নিজের কাছে দুর্লভ করে দিয়ে রাজা বলেন- এখন অবসর নেই দেবরাজের সঙ্গে মিলিত হবার। সলঙ্কে উর্বশী প্রিয়সখীকে জনান্তিকে জানান–ভাই! নিজমুখে তো আর রাজাকে যেতে বলতে পারি না আমার সঙ্গে। অন্তত তুই কিছু বল ভাই। চিত্রলেখা বলেন–আমার প্রিয়সখী উর্বশীকে স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছি, তেমনই বহন করে নিয়ে যাচ্ছি আপনার যশ-কীর্তি–উর্বশীকে উদ্ধার করেছেন আপনি। রাজা, বিদায় দেন উর্বশীকে আর তখন উর্বশীর অবস্থা হল–ছল করে তার বাঁধত আচল সহকারের ডালে’ অথবা কাঁটা ফোটে পায়ে। ছল করেই স্বর্গ-লোকে যাবার পথে বিলম্ব ঘটান উর্বশী। উপোস করা চোখে রাজার দিকে তাকিয়ে থাকেন উর্বশী। তবু যেতেই হয়, ফিরে যেতেই হয় স্বর্গলোকে।
নাটকের নাটকীয়তা থাক। উর্বশী স্বর্গলোকে ফিরে এসেছেন, ঠিক তার পর-পরই দুটি ঘটনা ঘটে গেল খুব তাড়াতাড়ি। শৌনকের বৃহদ্দেবতার মতো অতি প্রাচীন গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে মিত্রাবরুণ এসেছিলেন আদিত্যযজ্ঞে যোগ দিতে। মিত্রাবরুণ পূর্বোক্ত নর-নারায়ণের মতোই যুগল ঋষি। পূর্বে এঁরা দেবতা বলে পরিচিত ছিলেন। সেকালের বৃহৎ কোনও যজ্ঞে দেবর্ষি মহর্ষিরা সব সময়েই আমন্ত্রিত হতেন যজ্ঞের ক্রিয়াকলাপ পরিদর্শন করার জন্য। সেই কারণেই হয়তো মিত্রাবরুণের আগমন ঘটেছিল আদিত্যযজ্ঞে। অন্যদিকে স্বর্গসুন্দরী উর্বশীও উপস্থিত হয়েছিলেন ওই একই যজ্ঞে। হয়তো নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে, হয়তো বা অভিজাত রাজা বা দেবতাদের মনোরঞ্জনের জন্য।
কিন্তু উর্বশীর চলনে-বলনে সেদিন এমন কোনও প্ররোচনা ছিল না, যাতে বলা যায় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও অন্যায় করেছেন। সুক্ষ্ম চীনাংশুকের আবরণ এমন ছিল না, যাতে বলা। যায় শরীরে বিভঙ্গে তিনি উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন কোনও কথার মাত্রায় এমন কোনও মায়াবী স্পর্শ ছিল না যাতে বলা যায় তিনি সাগ্রহে মোহিত করছেন কাউকে। কিন্তু যে দোষে তিনি চরম দোষী হয়ে গেলেন, সে তার স্বাভাবিক রূপ। তার রূপের মধ্যেই সেই সাংঘাতিক আগুন ছিল যা মুহূর্তের মধ্যে পুরুষ-পতঙ্গ আকর্ষণ করে, কিন্তু তাতে আগুনের কী দোষ? বিধাতা তাকে যেহেতু শুধু শৃঙ্গাররসের উপাদান দিয়েই তৈরি করেছিলেন, তাই তিনি কিছু না করলেও পুরুষের স্নায়ুসুত্রের তন্তুগুলি সেখানে নিতান্তই বিবশ। যজ্ঞভূমির শান্ত নিস্তরঙ্গ ক্রিয়াকলাপের মধ্যে যতই বিষয়-ব্যাবৃত্ত হয়ে বসে থাকুন মিত্রাবরুশ দুই মুনি, তাদের চক্ষু আধার খুঁজে পেল উর্বশীর মধ্যে। না বুঝে আগুনে হাত দিলে যেমন আপনিই হাত পুড়ে যায়, তেমনই ঋষিদ্বয়ের দৃষ্টি উর্বশীর ওপর পড়ায় তাদের শরীর কাজ করল নিজের ছন্দে। তাদের তেজ স্বলিত হল– তয়োস্ত পতিতং বীৰ্য্য।
উর্বশীর রূপ এবং মিত্রাবরুণ যুগল ঋষির তেজ– এর ফল কিছু খারাপ হয়নি। ফল স্বয়ং বশিষ্ঠ মুনি। পৌরাণিকেরা এই ঘটনা যতই শারীরিক সংলাপে বেঁধে ফেলুন, সহজ সরল ঋগ্বেদও এখানে মনের প্রাধান্য দিয়েছে। ঋষি হলেও তারাও তো মানুষ। অক্ষরা হলেও উর্বশী তো মানুষ। বেদের সরল কবি কোনও দোষ দেখেননি এতে। সুতি করার সময় তাঁরা বলেছেন- বশিষ্ঠ! তুমি মিত্রাবরুণের পুত্র। উর্বশীর মন থেকে তোমার জন্ম–উসি মৈত্রাবরুণো বসিষ্ঠোবশ্যা ব্ৰহ্মণ মনসোধ জাতঃ। আহা। সরল ভাষায় কত মধুর কথা–উর্বশীর মন থেকে তোমার জন্ম–উর্বশা মনসোধিতজাত। আমরাও এই কথাটাই বিশ্বাস করি–স্বর্গের সাধারণী গণিকা বলে পরিচিত হলেও উর্বশীর একটা মন আছে যে মন মিত্রাবরুণেরও আছে। বেদ বলেছে বিদ্যুতের মতো নিজের জ্যোতি ত্যাগ করার সময় মিত্রাবরুশ তোমায় দেখেছিলেন, বশিষ্ঠ–বিদ্যুতো জ্যোতিঃ পরিসঞ্জিহানং মিত্রাবরুণণা যদপশ্যতাং।
