কৈলাস থেকে ইন্দ্রসভার অর্ধেক পথ আসতেই একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। হিরণ্যপুরে থাকতেন দানব কেশী। দেবরাজ ইন্দ্র তার অত্যাচার এবং হঠাৎ আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত হচ্ছিলেন বারেবারেই। মনোমোহিনী স্বর্গসুন্দরীদের ওপর যখন তখন ঝাঁপিয়ে পড়াটাও এই অত্যাচারের একটা অঙ্গ ছিল। কেশী দানব সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন অঙ্গরাশ্রেষ্ঠা উর্বশীকে হরণ করার। কুবের-সভা থেকে উর্বশী ফিরে আসছিলেন–এ খবর কেশীর জানা ছিল। সময়মতো কেশী ঝাঁপিয়ে পড়লেন অপ্সরা-সুন্দরীদের ছোট্ট দলটির ওপরে।সবাইকে তিনি ধরলেন না। একমাত্র উর্বশী আর তার প্রিয়সখী চিত্রলেখাকে নিয়ে তিনি নিজের রথে উঠলেন এবং আকাশবাহী রথখানি চালিয়ে দিলেন সবেগে।
রম্ভা, মেনকা, সহজন্যা– যাঁরা উর্বশীর সহগামিনী ছিলেন, তাদের মধ্যে কান্নার রোল উঠল। সমস্বরে শব্দ শোনা গেল–বাঁচাও বাঁচাও। কে কোথায় আছ বাঁচাও। দেবরাজ ইন্দ্রের বন্ধু যদি কেউ থাকেন এখানে, অথবা এমন কেউ যদি থাকেন যাঁর চলাফেরা আছে আকাশমাগে, তাহলে তিনি দয়া করে শুনুন আমাদের কথা–পরিত্রায়তাং পরিত্রায়তাং যঃ সুরপক্ষপাতী যস্য বাম্বরতলে গতিরস্তি।
অপ্সরাদের আর্ত ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পেয়ে মর্ত্যভূমির এক রাজা রথ চালিয়ে এসে থামলেন অপ্সরাদের সামনে। তিনি সূর্যের উপাসনা সেরে, নাকি সূর্যদেবের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসছিলেন নিজের রাজ্যে। রাজা অঙ্গরাদের সামনে এসে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন- আমার নাম পুরূরবা। সূর্যদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই আমি ফিরছি। বলুন, কোন বিপদ থেকে আপনাদের বাঁচাতে হবে? সময় বুঝে কথা বলতে আরম্ভ করলেন রম্ভা। তিনি বললেন–অসুরের হাত থেকে বাঁচাতে হবে, রাজা। অবাক হয়ে পুরূরবা বললেন–অসুররা আবার আপনাদের কী ক্ষতি করল? রম্ভা বললেন–সে অনেক কথা। আমরা সবাই ফিরছিলাম কুবের-ভবন থেকে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন উর্বশী। তাকে চেনেন তো মহারাজ? তিনি স্বর্গসভার অলংকার। তার রূপে লক্ষ্মী পর্যন্ত লজ্জায় মুখ লুকোবেন। আর তপস্যার তেজে যারা ইন্দ্রের ইন্দ্ৰত্ব কেড়ে নেবার উপক্রম করেন, সেই তপস্বীদের উদ্দেশে প্রয়োগ করার জন্য আমাদের এই উর্বশী হলেন ইন্দ্রের সবচেয়ে কোমল মারণাস্ত্রটি–যা তপোবিশেষপরিশঙ্কিতস্য সুকুমারং প্রহরণং মহেন্দ্রস্য। সেই উর্বশীর সঙ্গে আমরা কুবের-ভবন থেকে ফিরছিলাম। এইসবে অর্ধেক পথ এসেছি। আর কোথা থেকে হঠাৎ সেই হিরণ্যপুরের দানবরাজ কেশী এসে তুলে নিয়ে গেল আমাদের উর্বশী আর চিত্রলেখাকে।
পুরুরবা বললেন–আচ্ছা, বলতে পারেন–কোন দিকটায় গেল সেই বদমাশ। অপ্সরা সহজন্যা বললেন–এই তো এই উত্তর-পুব বরাবর চলে গেল। রাজা বললেন- ঠিক আছে। একটু ঠান্ডা হয়ে বসুন, আমি চেষ্টা করছি। মহারাজ পুরূরবা অপ্সরাদের হেমকূট পর্বতের রম্যস্থানে তার জন্য অপেক্ষা করতে বলে রথ নিয়ে ছুটলেন আকাশের নীল ছিন্ন করে পূর্বোক্স দিকে। রঙ-মেনকারা হেমকূট পর্বতের শিখরদেশ ছেড়ে সমভূমিতে এসে বসলেন উৎকণ্ঠিত চিত্তে। রম্ভা বললেন রাজা কি পারবেন আমাদের মনের কষ্ট দূর করতে? পারবেন কি উর্বশীকে এনে দিতে? অঙ্গরাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞা হলেন মেনকা। তিনি বললেন- রাজা ঠিক পারবেন। সন্দেহ করিসনে ভাই-ইলা মা তে সংশয়ো ভবতু–ঠিক পারবেন তিনি। স্বর্গে যখন যুদ্ধ লাগে, তখন স্বয়ং ইন্দ্র কত মান্যি করে ভূলোক থেকে ডেকে আনেন এই রাজাকে। স্বর্গরাজ্যের সমস্ত বড় যোদ্ধাদের সামনে রাখেন তাকে–তমেব বিজয়সেনামুখে নিযুক্তে।
বস্তুত সেকালে সূর্যবংশ কিংবা চন্দ্রবংশের রাজাদের এই সম্মান এবং প্রতিপত্তি ছিল। মৎস্যপুরাণ জানিয়েছে- একবার দুবার নয় ইন্দ্ৰশত্রু দানব কেশী পুরূরবার হাতে বহুবার পরাজয় বরণ করেছেন–কেশিপ্রভৃতয়ো দৈত্যাঃ কোটিশো যেন দারিতাঃ। এই পুরাণের অরেকটা খবর হল–ভয়বিহ্বল অপ্সরাদের মুখে জানা নয়, রাজা পুরূরবা নিজেই কেশীকে দেখতে পেয়েছিলেন উর্বশী আর চিত্রলেখাকে হরণ করে নিয়ে যেতে-সামর্কেণ সোপশ্যানীয়মানামথাম্বরে। রাজা প্রতিদিন রাজকর্মের শেষে ইন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন– অহনহনি দেবেন্দ্ৰং দ্রং যাতি স রাজরাট। সেই দেখা সেরে ফিরে আসবার সময়েই কেশীকে তিনি দেখতে পান এবং তার পিছু নেন।
আমরা উপরিউক্ত নাটকীয় বর্ণনা করেছি কালিদাসের নাটক থেকে, কেননা মৎস্যপুরাণ তার নাটকের অন্যতম উপাদান। আর এই বর্ণনা করলাম এইজন্য যে, আমার সহৃদয় পাঠকরা কালিদাসের রসসৃষ্টি থেকে বঞ্চিত থাকবেন কেন? বিশেষত সে বর্ণনা যখন মহাভারত বা পুরাণ-বিরোধী নয়।
রম্ভা-মেনকার শঙ্কা-বিশ্বাসের আন্দোলন শেষ হতে না হতেই রাজার রথের ধ্বজা দেখা গেল। স্বয়ং চন্দ্রদেবের দেওয়া হরিণকেতন রথ আকাশমার্গে দেখতে পেলেন অপ্সরারা। একটু পরেই রথ যখন এসে থামল সেই হেমকূট পর্বতের সানুদেশে তখন দেখা গেল উর্বশী প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছেন চিত্রলেখার কোলে। দানবিক ভয়ে তার শরীর বিহ্বল, চক্ষু নিমীলিত। চিত্রলেখা এবং রাজা পুরূরবা–দুজনেই উর্বশীকে প্রকৃতিস্থ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। চিত্রলেখা খালি বলছেন– আর কোনও ভয় নেই ভাই, কোনও ভয় নেই। আর রাজার ভাবটা হল –শুন নলিনী খোল গো আঁখি, ঘুম এখনও ভাঙিল নাকি, দেখ তোমার দুয়ার পরে এসেছে তোমারই রবি–তদেত উন্মীলয় চক্ষুরায়তং/ মহোৎপলং প্রত্যুষসীব পদ্মিনী।
