ইন্দ্র অনেকবার একই কথা বললেন। কিন্তু মুনিরা এতই যোগযুক্ত হয়ে তপস্যায় ডুবে আছেন যে, ইন্দ্রের কথা তারা কানে শুনতেই পেলেন না। উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা। ইন্দ্র তখন ভয় দেখাতে আরম্ভ করলেন। দৈবী মায়া বিস্তার করে দুই ঋষিকে ভয় দেখানো শুরু করলেন। বাঘ-সিংহ থেকে আরম্ভ করে ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত, আগুন লাগানো কিছুই বাদ গেল না। ঋষিদের ধ্যান ভাঙল না, তপস্যা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত করা গেল না তাদের।
ইন্দ্র এবার ভালবাসার দেবতা কামদেবকে স্মরণ করলেন। তার সঙ্গে এলেন ঋতুরাজ বসন্ত। যে কামদেবকে ইন্দ্র অন্য সময় খুব বেশি একটা আমল দেন না, প্রয়োজন বুঝে ইন্দ্র তাকে খুব তোয়াজ করলেন। বললেন- ভাই! তোমার মতো ক্ষমতাবান দেবতা আর কে আছে এই তিন ভুবনে? দেব, দানব, মানব–সবারই মন একেবারে উথাল-পাথাল করে দিতে পার তুমি। একমাত্র তুমি পারবে এই কাজটি করতে। বদরিকাশ্রমে কঠোর তপস্যা করছেন নর-নারায়ণ নামে দুই মুনি। ভালবাসার ঘায়ে মোহিত করে দিতে হবে তাদের মন, উচাটন করে দিতে হবে হৃদয়-বশীকুরু মহাভাগ মুনী ধর্মসূতাবপি।
ইন্দ্র দুই ঋষির অবিচল ভাবের কথাও কামদেবকে জানাতে ভুললেন না। তাদের যে তিনি বর দিয়ে মনস্কামনা পূরণ করার চেষ্টা করেছিলেন–তাও বললেন। বাঘ-সিংহের ভয়, দেখানোর কথাও বললেন। সব বললেন। তারপর কামদেবকে খুব খানিকটা মাথায় উঠিয়ে দিয়ে বললেন–সমস্ত স্বর্গসুন্দরী গণিকা আমি তোমার সাহায্যের জন্য প্রস্তুত রেখেছি। আমি জানি-একা তিলোত্তমা অথবা একা রম্ভা অথবা একা তুমিই এই সামান্য কাজ করে দিতে পার। সেখানে তোমরা যখন সকলে একসঙ্গে এই কাজে নামছ, সেখানে সাফল্যের প্রশ্নে আমার কোনও সন্দেহই নেই–ত্বমেবৈকঃ ক্ষমঃ কাম মিলিতৈঃ কস্তু সংশয়ঃ। কামদেব ইন্দ্রের স্তুতিবাদে মুগ্ধ হয়ে তাকে সবরকমভাবে আশ্বস্ত করে মেনকা-রম্ভা-তিলোত্তমাদের নিয়ে বদরিকাশ্রমে অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখলেন–ঋষিদ্বয় দুশ্চর তপস্যায় মগ্ন।
অকাল বসন্তের উদয় হল বদরিকাশ্রমে। বসন্তের ফুল ফুটল বন আলো করে। সময় বুঝে রম্ভা-তিলোত্তমারা বসন্ত রাগে গান ধরলেন সুরে সুরে তালে তালে নাচও শুরু হল তাদের। কোকিলের কুজন আর অপ্সরাদের নৃত্যগীতের ছন্দে নর-নারায়ণ দুই ঋষির তপোযোগ ভঙ্গ হল। ক্ষণিকের জন্য তাদের মন উচ্চকিত হল। আকালিক বসন্তের শোভায় তাদের মন ভরে গেল বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তারা এই ঋতু পরিবর্তনের কারণও ভাবতে লাগলেন। নারায়ণ ঋষির মন অবশ্য এতই আপ্লুত ছিল যে তিনি সোচ্ছ্বাসে নর-ঋষিকে বসন্তের কাব্যও শুনিয়ে দিলেন খানিকক্ষণ ধরে। শেষ পর্যন্ত নৃত্যরতা অপ্সরাদের দিকে যখন নজর পড়ল, তখন দুই ঋষিই বুঝলেন–স্বর্গের রাজা ইন্দ্র বিব্রত হয়ে তাদের ধ্যানভঙ্গের ব্যবস্থা করেছেন। তারপর রম্ভা, তিলোত্তমা, মেনকা, ঘৃতাচী-প্রমুখ সুন্দরীশ্রেষ্ঠা অঙ্গরাদের সঙ্গে স্বয়ং কামদেবকে উপস্থিত দেখে তাদের সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হল। তারা সাভিনয়ে নির্বিকার চিত্তে অঙ্গরাদের গান শুনতে লাগলেন।
দুই ঋষির একতম নারায়ণের মনে কিন্তু একটু ক্ষোভের সঞ্চার হল। অপ্সরাদের সম্বোধন করে নারায়ণ ঋষি বললেন- হ্যাঁগো সুন্দরীরা। স্বর্গ থেকে এখানে অতিথি হয়ে এসেছ। তা বোসো আরাম করে। আমরা অতিথির যোগ্য সৎকার করব–আস্যতাং সুখমত্রৈব করোম্যাতিথ্যমদ্ভুত। নারায়ণ ঋষি মনে মনে ভাবলেন- ইন্দ্র যখন কাম-লোভহীন বৈরাগী ঋষিদের তপোবিঘ্ন করার জন্য এমন অসমীচীন পথ বেছে নিয়েছেন, অতএব তাকে একটু ক্ষমতা প্রদর্শন করা দরকার। নারায়ণ ঋষি সকৌতুকে নিজের উরুতে একটি চাঁটি মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার উরু থেকেই জন্ম নিল এক সর্বাঙ্গ সুন্দরী রমণী–করেপোড়ং প্রতাড্য বৈ। তরসোৎপাদয়ামাস নারীং সর্বাঙ্গসুন্দরী। নারায়ণের উরু থেকে জন্ম হওয়ার ফলেই সেই রমণীর নাম হল উর্বশী। শুধু উর্বশীই নন, ইন্দ্রদেব যত অপ্সরা পাঠিয়েছিলেন, ঋষি নারায়ণ তত অঙ্গরা সৃষ্টি করে ফেললেন চোখের নিমেষে।
ইন্দ্রের কাছ থেকে এসেছিলেন যাঁরা, কামদেব আর অপ্সররা–তারা সবাই নারায়ণ-ঋষির তপঃপ্রভাব দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলেন এবং নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন। নর-নারায়ণ খুশি হলেন। ইন্দ্রের প্রতি অভিশাপ উচ্চারণ করে তারা তাদের তপস্যার শক্তিও ক্ষয় করলেন না। শান্ত মনে তারা অপ্সরাদের বললেন–দেবরাজ আমাদের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য তোমাদের পাঠিয়েছিলেন এখানে, তার উত্তরে আমরা এই উর্বশীর মতো অসাধারণ সুন্দরীকে উপহার দিলাম দেবরাজকে। সে তোমাদের সঙ্গে স্বর্গে যাক্ দেবরাজের প্রীতির জন্য- উপায়নমিয়ং বালা গচ্ছত্বদ্য মনোহরা।
সেই থেকে উর্বশী স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রসভার অলংকার। অপ্সরা-সমাজে তার মতো বিদহ্মা এবং লোক-মোহিনী আর দ্বিতীয় কেউ নেই। অন্য অঙ্গরাদের মতো তত সাধারণী নন উর্বশী। অপ্সরাদের বৃত্তি খানিকটা গণিকাবৃত্তির পর্যায়ভুক্ত হলেও, উর্বশী তত সহজলভ্য নন। এমনই তার রূপ যে তাকে দেখামাত্র মানুষের মানসিক স্থিরতা নষ্ট হত, অতি বড় কঠিন তপস্বীরও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেত।
ভালই ছিলেন উর্বশী। ইন্দ্রের দেওয়া বাসভবনে অলস-শৃঙ্গার রচনা করে, বৈজয়ন্ত প্রাসাদের স্ফটিকসভায় নৃত্য-কৌশল প্রদর্শন করে, আর মাঝে-মধ্যে শুষ্ক-রুক্ষ মুনি-ঋষির হৃদয় বিভ্রান্ত করে উর্বশীর দিন কেটে যাচ্ছিল ভালই। এরই মধ্যে একদিন তিনি ধনপতি কুবেরের তলব পেয়ে কৈলাসে গিয়েছিলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। হয়তো নৃত্যগীতের কোনও উৎসব-রঙ্গে নন্দনবাসিনী উর্বশীর উপস্থিতি প্রার্থিত ছিল কৈলাসনাথ কুবেরের। সেই নৃত্যগীত শেষ করে পুনরায় ইন্দ্রসভায় ফিরে আসছিলেন উর্বশী। তার সঙ্গে স্বর্গসুন্দরী অন্য অপ্সরারাও ছিলেন। রম্ভা, মেনকা, সহজনা–এইসব স্বনামধন্যা স্বর্গসুন্দরী উর্বশীর পথসঙ্গিনী ছিলেন এই দীর্ঘপথে, আর ছিলেন উর্বশীর প্রিয়সখী চিত্রলেখা।
