কে বলে বৈদিক কবিরা ইনটেলেকচুয়াল ছিলেন না। এত প্রতীকী কবিতা যাঁরা খ্রিস্টজন্মের অন্তত হাজার বছর আগে লিখতে পেরেছেন, তাদের ভাবনা-চিন্তা যে যথেষ্ট আধুনিক–সে কথা সবাই স্বীকার করবেন। কিন্তু ব্যাপারটা কী জানেন, এসব প্রতীকী বিবরণে এখনই আমরা মন দেব না, কারণ পুরূরবা কিম্বা উর্বশীকে আমরা কল্পলোকের অধিবাসীও মনে করি না, রূপকও মনে করি না। চন্দ্রবংশের তৃতীয় পুরুষেই যদি রূপক এসে যায়, তবে মহাভারতের ইতিহাস আরম্ভেই স্থালিত হবে। আমাদের মতে পুরূরবা রীতিমতো ঐতিহাসিক পুরুষ এবং আর্যায়ণের দ্বিতীয় পর্যায়ে আর্যদের সভ্যতা যখন উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত প্রসারিত হল, তখনও পুরূরবার ব্যবহার ঐতিহাসকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এমন কি উর্বশীকেও এই সূত্রে বুঝে নেওয়া অসম্ভব নয়।
আমি আগেই জানিয়েছি–পুরূরবার পিতা বুধ পুত্রের জন্ম দিয়েই স্বর্গে ফিরে গেছেন, এমন কি তার পালক পিতা সুদ্যুম্নকেও আমরা ইলাবৃতবর্ষে ফিরে যেতে দেখেছি। অর্থাৎ তখনও পর্যন্ত স্বর্গভূমির সঙ্গে এই পৃথিবী বা ভারতবর্ষের যোগাযোগ যথেষ্ট রয়েছে। আরও লক্ষণীয় বিষয় হল–ঋগবেদের প্রথম মণ্ডলে পুরূরবাকে আমরা স্বয়ং মনুর সঙ্গে উল্লিখিত হতে দেখেছি এবং সেই একই ঋক্মন্ত্রে তিনি অগ্নিদেবের বন্ধুত্বমগ্নে মনবে দ্যামবাশয়ঃ পুরূরবসে সুকৃতে সুকৃত্তরঃ। এই ঋকের অর্থ হল- অগ্নি! রাজা পুরূরবা ভাল কাজ করলে তুমি তাকে বেশি ফল দিয়েছ। পরিষ্কার বোঝা যায়, পুরূরবা আগে ভাল কাজ করেননি। যখন করেছেন, তখন ভাল ফলও পেয়েছেন দেবতার কাছে।
পুরূরবা অগ্নিদেবের বন্ধু কী করে হলেন সে কথা পরে আসবে। কিন্তু পূবোক্ত ব্রাহ্মণ্য বিরোধিতার কথা মনে রেখেও ঋগবেদ তাকে উল্লেখ করেছে পরম উপকারী বলে ‘সুকৃত’ বলে। অন্যদিকে পুরাণগুলি খুললে দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠিত ওঠা-বসার কথা এতই প্রকট হয়ে উঠবে যে, উর্বশীর মতো স্বর্গসুন্দরীকে মত মানুষ পুরূরবার স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করাটাও অলৌকিক ভাবনা বলে মনে হবে না।
উর্বশী স্বর্গের অপ্সরা বলে পরিচিত। সাধারণভাবে অপ্সরারা জলের সঙ্গে জড়িত বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। সংস্কৃত ‘অপ’ শব্দের অর্থ জল,আর সৃ’ ধাতুর অর্থ হল সরে সরে যাওয়া। এই দৃষ্টিতে পণ্ডিতদের ব্যাখ্যায় অপস্বিয়মান মেঘই হল অঙ্গরা। আবারও বলি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই রূপকও আমাদের পছন্দ নয়। আমাদের ধারণা-সেকালের প্রাচীন জনপদগুলির মধ্যে উত্তর ভারতের বিভিন্ন নদ-নদী এবং পর্বতের সানুদেশে যে সমস্ত সুন্দরী রমণীর দেখা পাওয়া যেত, তারাই অপ্সরা। ইতিহাস-পুরাণে অপ্সরারা প্রধানত নৃত্যের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বেদের ভাষায় তারা দেবপত্নী’ও বটে।
‘দেবপত্নী’ শব্দটার মধ্যে যতই মর্যাদা থাকুক মূলত অপ্সরারা ছিলেন স্বৰ্গবেশ্যা। দেবতারা আপন রতিসুখ চরিতার্থ করতেন এদের দিয়েই এবং প্রয়োজনে এদের ব্যবহার করতেন তাদের ওপর, যারা স্বর্গ অধিকার করে নিতে চান। অর্থাৎ দেবতা নামক উন্নতবুদ্ধির মানুষরা উন্নতিকামী ব্যক্তিকে অপ্সরার ভোগসুখে মত্ত রেখে নিজের অধিকার মজবুত রাখতে চেষ্টা করতেন। পুরুষের ব্যাপারে অপ্সরারা ছিলেন অত্যন্ত খোলামেলা এবং তাদের লাজ-লজ্জাও ছিল কম। ফলে শারীরিক সৌন্দর্য এবং দৈহিক আকর্ষণ দুটিই তারা প্রকটভাবে ব্যবহার করতেন উন্নতিকামী পুরুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চিরতরে স্তব্ধ করে দেবার জন্য।
সেকালের দিনে গণিকারাই ছিলেন যথাসম্ভব শিক্ষিত এবং বিদগ্ধা রমণী। সেদিক দিয়ে স্বৰ্গবেশ্যা অপ্সরা-সুন্দরীরা আরো এক কাঠি ওপরে। আর উর্বশীর তো কথাই নেই। তিনি অঙ্গরা সুন্দরীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতমা, নাগরিক বৃত্তির যোগ্যতম আধার। শুধুই স্বৰ্গবেশ্যামাত্র হলে স্বয়ং কবিগুরুর হাত দিয়ে অমন সুন্দর কবিতাটি উপহার পেতাম না, আর কবির কবি কালিদাসও তাকে তার নাটকের নায়িকা হিসেবে নির্বাচন করতেন না। উর্বশীকে তাই একটু অন্য চোখে আমাদের দেখতে হবে এবং উর্বশীর সৃষ্টিও বড় সাধারণভাবে হয়নি।
.
২২.
বাবা যদি বলতেই হয় তবে ব্যাকরণ-সম্মতভাবে নির্ভুল নর-নারায়ণ–এই যুগল ঋষিকেই সুন্দরীশ্রেষ্ঠা উর্বশীর বাবা বলে মেনে নিতে হবে। ঋষি নর-নারায়ণ এবং উর্বশী কেমন যেন বিপরীত শোনায়। মহাভারত পাঠের আগে একটি মঙ্গলাচরণ-শ্লোক উচ্চারণ করতে হয়। সেই শ্লোকের আরম্ভটা এইরকম–নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম্। ভগবান নারায়ণ আর নরশ্রেষ্ঠ নর নামক পুরুষকে নমস্কার করে মহাভারত পাঠের নিয়ম। নর-নারায়ণ এই যুগল দেবতা বিষ্ণুর সাক্ষাৎ অংশ বলে পরিচিত। মহাভারতের পরবর্তী অংশে নর-নারায়ণকে অর্জুন এবং কৃষ্ণের সঙ্গে একাত্ম করে দেখা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হল, নর-নারায়ণ নামে দুই যুগল ঋষির কল্পনাও আছে পুরাণে। তবে ঋষি হলেও পুরাণগুলিতে নর-নারায়ণ ঋষির মাহাত্ম্য বিষ্ণুর থেকে কোনও অংশে কম নয় এবং আপাতত তাদের ঋষি ধরে নিয়েই আমাদের কথা আরম্ভ করতে হবে; কারণ পুরূরবার প্রেয়সী উর্বশীর জনক এই যুগল ঋষির একজন।
নর-নারায়ণ হিমালয়ের বদরিকাশ্রমে গিয়ে কঠোর তপস্যায় মন দিলেন। অতি অদ্ভুত সেই তপস্যা। তাদের তপস্যার তেজে তিন ভুবন যেন তাপিত হয়ে উঠল। স্বর্গরাজ্যের অধীশ্বর ইন্দ্র প্রমাদ গণলেন। শেষপর্যন্ত হয়তো তার ইন্দ্র-পদটাই চলে যাবে। ইন্দ্র ঠিক করলেন যেভাবে যোক এই দুই মুনির তপস্যা নষ্ট করে দিতে হবে। তিনি নিজে ঐরাবতে চড়ে উপস্থিত হলেন ঋষিদের তপস্যা-ভূমিতে। ঋষিদের উদ্দেশে বললেন–আপনারা কী চান বলুন? আমি আপনাদের তপস্যা দেখে বড় খুশি হয়েছি। অতএব না দেওয়ার মতো জিনিস হলেও আপনারা চাইলে তা দেব–অদেয়মপি দাস্যামি তুষ্টোস্মি তপসা কিল।
