কাশ্যপের উত্তরদানের মধ্যে বার বার একটা কথা উচ্চারিত হয়েছে–যদি ক্ষত্রিয়েরা ব্রাহ্মণকে ত্যাগ করেনদা ব্ৰহ্ম ক্ষত্রিয়াঃ সংত্যজন্তি। বার বার সেই একই আশঙ্কা, কেন না পুরূরবা সেই আশঙ্কা তৈরি করেছিলেন। মনে রাখা দরকার এখনকার দৃষ্টিতে এই ব্রাহ্মণ্য কিন্তু চাল-কলার ভিক্ষাসর্বস্ব পৌরোহিত্য নয়। এখানে ব্রাহ্মণ সেকালের সমস্ত বিদ্যাবত্ত এবং সংস্কৃতির প্রতীক আর রাজা বা ক্ষত্রিয় হলেন রাষ্ট্রশক্তির প্রতীক। অন্যথায় আজকের জাতি-ব্রাহ্মণ্য নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। বরঞ্চ ঘৃণা আছে। বিদ্যা-শিক্ষাহীন ক্ষাত্রশক্তি বা শাসন কোন পর্যায়ে চলে যেতে পারে এখনকার ভারতই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমরা যেমন বলি-রাজনীতিকরা সব লুটে-পুটে খাচ্ছে, ওঁরা সেটাকেই বলেন–অম্বগবলং দস্যবস্ত ভজন্তে বিদ্যাব্রাহ্মণ আর ক্ষাত্রশক্তির বিরোধিতার সুযোগে দস্যুরা তাদের অধিকার কায়েম করে। এখনকার রাজনীতিকদের স্বার্থসর্বস্ব দস্যু ছাড়া কীই বা আর বলব?
রাজধর্ম নিয়ে পুরূরবার সঙ্গে বায়ুদেবতা এবং কাশ্যপ মুনির সঙ্গে এই কথোপকথন আমরা পুরূরবার জীবনের একটা অধ্যায় বলে মনে করি। তবে সনকুমার যখন ব্রহ্মলোক থেকে তাকে বোঝাতে এসেছিলেন এই কথোপকথন সেই সময়ে হয়নি বলেই মনে হয়। আমাদের ধারণা, ব্রাহ্মণরা যখন কুশবদ্রে পুরূরবাকে ধ্বংস করলেন অথবা তার রাজ্যচ্যুতি ঘটালেন, এই কথোপকথন এসেছে সেই সময়ে। কারণ পুরূরবা এখন অনেক শান্ত এবং জিজ্ঞাসু। ঋষিরা, দেবতারা তার সংশয় নিরসন করেছেন-ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের মিলনের সমাধান দিয়ে। পুরূরবা এই সমাধান স্বীকার করেছেন নিশ্চয়।
আমরা এই রকমই একটা সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছি, কেন না বেদ থেকে আরম্ভ করে পুরাণ পর্যন্ত সর্বত্রই পুরূরবার মাহাত্ম কীর্তিত হয়েছে ভূরি ভূরি। ব্রাহ্মণ্য-বিরোধের সঙ্কট থেকে মুক্ত হয়ে পুরূরবা আবারও নিজ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন বলেই মনে হয় এবং তার অসংযমের ইতিহাসটুকু বেদ-পুরাণ আর মনে রেখে দেয়নি। মহাভারত এবং মহাভারতের অনুসরণে আরও দু-একটি পুরাণ পুরূরবার জীবনের এই কলঙ্কিত অংশটুকু বর্ণনা করেছে বটে, কিন্তু অপেক্ষাকৃত পুরাতন গ্রন্থগুলি, যেমন শতপথ ব্রাহ্মণ বা বেদ-এইসব জায়গায় পুরূরবার সঙ্গে স্বর্গসুন্দরী উর্বশীর মিলন কীভাবে হল–তারই হার্দিক বর্ণনা আছে শুধু। ব্রাহ্মণ্য বিরোধিতার মতো গদ্যজাতীয় সাময়িক ইতিহাস নিয়ে এইসব গ্রন্থের লেখকরা বিব্রত হননি। কিন্তু মহাভারতের কবি যেহেতু ঐতিহাসিকের মতো বেশ বড়সড় একটা মন্তব্য করেছেন পুরূরবার ব্রাহ্মণ্য-বিরোধিতা নিয়ে, আমাদেরও তাই খানিকটা সময় দিতে হল ঐতিহাসিকদের সূত্র বজায় রেখে। তবে এবার আমরা কাব্যে চলে যাব। কারণ স্বর্গসুন্দরী উর্বশীর সঙ্গে মর্ত্য রাজা পুরূরবার মিলনের ইতিহাসটুকু স্বাভাবিক কারণেই ব্রাহ্মণ্য-বিরোধিতার অংশ থেকে মধুরতর এবং আমাদের কাছে তা অন্য কারণে গুরুতরও বটে।
উর্বশী-পুরূরবার মিলন-কাহিনী অতি প্রাচীন এবং জটিল। এই কাহিনীর উপাদান আছে খোদ ঋগবেদে, শতপথ ব্রাহ্মণে, মহাভারতে তো বটেই এবং আছে বিভিন্ন পুরাণে। কাহিনীটি বেদে যেমন আছে, তা যেন আদি-অন্তহীন একটা মাঝখানের সংলাপের মতো। তা থেকে আগুপিছু বোঝা যায় না কিছুই। শতপথ ব্রাহ্মণের মতো প্রাচীন গ্রন্থ তাই বেদোক্ত এই সংবাদ-সূক্তের ভূমিকা রচনা করে দিয়েছে। অন্যদিকে প্রাচীন পুরাণগুলি উর্বশী-পুরূরবার মিলন কাহিনী গ্রন্থনা করেছে বেদ এবং শতপথ ব্রাহ্মণের উপাদান একত্রিত করে। বেদ-ব্রাহ্মণ এবং পুরাণের এই প্রিয় বিষয়টির জনপ্রিয়তা এতই বেশি ছিল মহাকবি কালিদাসও এই রোমাঞ্চকর কাহিনীর আবেদন ঠেলে ফেলতে পারেননি। তিনি ‘বিক্রমোর্বশীয়’ নামে সেই বিখ্যাত নাটকটি লিখে আপন কালের কাছে ঋণমুক্ত হয়েছেন।
সবাই জানেন–উর্বশী স্বর্গের এক সুন্দরী অপ্সরা। পৌরাণিকেরা কেউ তার উৎপত্তি ঘোষণা করেছেন সমুদ্রমন্থনের অন্যতম ফল হিসেবে, কেউ বা তার উৎপত্তির কথা বলেননি। জন্ম-মরণের বাঁধা ছকে উর্বশীকে অনেকেই দেখতে চান না। তিনি শুধু সুন্দরী রূপসী নই মাতা নহ কন্যা গোছের। অনাদি অনন্ত কাল ধরে তিনি আছেন, শুধু যৌবনবতী উর্বশী। বেদের মধ্যে যেহেতু উর্বশীকে প্রথম পাই, তাই তার নাম নিয়ে অর্থচর্চা আরম্ভ হয়েছে প্রায় বেদের আমল থেকেই। পাশ্চাত্য পন্ডিতেরা যেহেতু বিভূতিযুক্ত সমস্ত মহাজনের মধ্যেই সূর্যের প্রতীক দেখতে পান, অতএব পুরূরবা তাদের কাছে Solar hero আর উর্বশী হলেন উষার প্রতীক। প্রভাতের আলো ফুটবার আগে উষার অরুণিমা চোখে দেখি মোহিনী মায়ার মতো। উর্বশী সেই উষা। ঋগবেদের সংবাদসূক্তে উবর্শীর সঙ্গে মিলনের জন্য পুরূরবার অনন্ত হাহাকার আছে। ক্ষণিকোদিতা উষার পেছন পেছন চলা সূর্যের মিলনেন্সার মধ্যেই আছে একই হাহাকার-ধ্বনি। পুরূরবা-উর্বশীর মিলন-বিরহ তাই পাশ্চাত্য বৈদিকের কাছে সূর্য আর উষার মিলন-বিরহের সুরে বাঁধা। ম্যাক্স মুলার অতি সরল ভাষায় বেদের কথা বলবেন–Urvasi loves pururavas মানে আর কিছুই নয়–the sun rises, আবার Urvasi sees pururavas naked sic the dawn is gone. Wasica Urvasi finds puruavas again gerte the sun is setting.
