আমাদের ধারণা, এই কর গ্রহণের নীতিই সাময়িকভাবে পুরূরবার রাজ-সিংহাসন কন্টকিত করে তুলেছিল এবং ঠিক এই পর্যায়ে তার মনে অবধারিত প্রশ্ন জেগেছে–ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের চাইতে কিসে বড়–কস্মাচ্চ ভবতি শ্ৰেষ্ঠস্তন্মে ব্যাখাতুমহতি? বায়ুদেবতার সঙ্গে তার এই কথোপকথনের প্রসঙ্গে আরও একটা বড় প্রশ্ন জেগেছে পুরূরবার মনে। তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন–আপনি ঠিক করে বলুন তো আমাকে শাসন করার জন্য এই যে পৃথিবী ক্ষত্রিয়দের অধিকারে আসে, সেই পৃথিবী আসলে কার প্রশাসনে থাকবে? যে রাজা বাহুবলে এই পৃথিবীর অধিকার লাভ করেন, পৃথিবী কি সেই ক্ষত্রিয়ের ভোগ্য, নাকি ব্রাহ্মণের–দ্বিজস্য ক্ষত্রবন্ধো বা কস্যেয়ং পৃথিবী ভবেৎ?
বায়ু দেবতা জাতি-বর্ণের অণুক্রমে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব পুরূরবাকে বুঝিয়েছেন। ব্রাহ্মণ শুধু বর্ণ-শ্রেষ্ঠ নয়, বর্ণ-জ্যেষ্ঠও বটে। আর পৃথিবীর অধিকার? বায়ু উপমা দিয়ে বলেছেন- সে হল ঠিক স্বামী আর দেবরের মতো। সেকালের দিনে স্বামী মারা গেলে চিৎ কখনও স্বেচ্ছায় সহমরণের কথা শোনা যায় বটে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই বিধবা স্ত্রী স্বামীর ছোট ভাইকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতেন। ঋগবেদ থেকে আরম্ভ করে পুরাণ পর্যন্ত সর্বত্রই দেখা যাবে যে, অনেক স্ত্রীই স্বামীর মৃত্যুর পর দেবরকে বিবাহ করেছেন। বায়ু এই উপমাটি স্মরণ করে পুরূরবাকে বললেন-দেখ, এই সমস্ত ভূমিখন্ডের স্বত্ব ব্রাহ্মণেরই বটে। কোনও রাজার অধীনে থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ যে ভূমির অধিকার ভোগ করেন, যে শস্য-সম্পদ তিনি খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করেন, সে সবই কিন্তু তারই। অর্থাৎ তিনি কারও পাচ্ছেন-পরছেন না, তিনি নিজেরটাই নিজে ভোগ করছেন, নিজেরটাই খাচ্ছেন। এমন কি তিনি যদি কাউকে কিছু দেন–জমি-জায়গা যা কিছু– সেও তিনি নিজেরটাই দিচ্ছেন–স্বমেব ব্রাহ্মণো ভুভক্তে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।
অন্যদিকে কোনও ভূমিখণ্ডের শাসনকর্তা হিসেবে ক্ষত্রিয় যে রাজ্য ভোগ করছেন সেটা হল অনেকটা ওই মৃত-জ্যেষ্ঠের স্ত্রীর অধিকার-লাভের মতো। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ তার যজন-যাজনের বৃত্তিতে স্থিত থেকে রাজ্যের অধিকার ত্যাগ করেন স্বেচ্ছায়। তিনি রাজ্য শাসন করেন না, অতএব তাঁর পরিত্যক্ত রাজ্য ভোগ এবং শাসন করেন ক্ষত্রিয়। পৃথিবী যেন এক বিবাহিতা রমণী; তিনি যেন জ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণ স্বামীর অভাবে ক্ষত্রিয়কেই অধিকারী হিসেবে নির্বাচন করেছেন–আনন্তৰ্য্যাত্তথা ক্ষত্রং পৃথিবী কুরুতে পতিম।
কথাটা আজকের সামাজিক পরিস্থিতিতে তেমন করে বোঝা যাবে না। ব্রাহ্মণরা ত্যাগ-বৈরাগ্য, পরোপকারের সমস্ত বৃত্তি আজই ভুলে গেছে, তা নয়। ব্রাহ্মণদের ভাঙন শুরু হয়েছে বহুঙ্কাল। খ্রিস্টিয় নবম-দশম শতাব্দীতেই অপক্ষীণ ব্রাহ্মণ্য নিয়ে সজ্জনদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। সে প্রমাণ অন্যত্র দেব। কিন্তু মহাভারতের যুগে বিদ্যাবত্তা, ত্যাগ-বৈরাগ্য এবং পরোপকার বৃত্তি ব্রাহ্মণ-সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। লক্ষ্য করে দেখবেন–ব্রাহ্মণ ঋষি বাড়িতে এলে রাজারা শুধু আত্মনিবেদনই করতেন না, আপন ভোগ্য রাজ্যটিও তারা বিনা দ্বিধায় ব্রাহ্মণের হাতে তুলে দিতেন। ব্রাহ্মণরা এই আদর স্বীকার করতেন, কিন্তু তাই বলে রাজ্যের দিকে হাত বাড়াতেন না। উপস্থিত ব্রাহ্মণকে এই রাজ্য-নিবেদনের কথা মহাভারতে বহু জায়গায় আছে। উদাহরণ হিসেবে আপনারা সেই মুহূর্তটুকু পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যখন দ্রোণাচার্যকে ভীষ্ম ডেকে এনেছিলেন বাড়ির বালকদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ভীষ্ম তাকে বলেছিলেন- আপনি এসেছেন এই বড় অনুগ্রহ। কুরুদের যা আছে বিত্ত বৈভব রাষ্ট্র সবই আপনার। আপনিই এখানকার রাজা, আমরা আপনার ভৃত্য– ত্বমেব পরমো রাজা সর্বে চ কুরব স্তব।
সেকালে উপযুক্ত ব্রাহ্মণদের প্রতি রাজা-মহারাজাদের এই ভাবটুকুই ছিল। তবে এই সমন্বয় আসতেও কিছু সময় লেগেছে বলে মনে হয়। আর্যায়ণের প্রথম কল্পে বেণকে যেমন আমরা দেখেছি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে পুরূরবার ক্ষেত্রেও যা দেখলাম, তাতে মনে হয় ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের পারস্পরিক বোঝাবুঝিতেও সময় লেগেছে কিছু। পুরূরবার প্রশ্ন থেকেই বোঝা গেছে ব্রাহ্মণদের সর্বময় কর্তৃত্বে তার সংশয় ছিল, উপেক্ষা ছিল। বায়ুদেবতার মুখ দিয়ে যে উপদেশ শুনতে পাচ্ছি, তাতে ব্রাহ্মণদের সম্বন্ধে পুরূরবার সংশয় এবং দ্বিধাটুকু পরিষ্কার বোঝা যায়। আরও বোঝা যায় কাশ্যপ মুনির সঙ্গে পুরূরবার কথোপকথনে।
ঐল পুরূরবা কাশ্যপ মুনিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন–ব্রাহ্মণ যদি ক্ষত্রিয়কে ত্যাগ করে অথবা উটোটা যদি হয়, ক্ষত্রিয় যদি ব্রাহ্মণকে ত্যাগ করে, তাহলে সাধারণ প্রজারা কাকে আশ্রয় করে, কার ওপরেই বা নির্ভর করে? কাশ্যপ বললেন- বিচক্ষণ লোকেরা জানেন যে, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় যদি নিজেরা নিজেরা বিবাদ-বিসংবাদ করে, তাহলে ক্ষত্রিয়ের রাজ্য থাকে না, রাজ্য চলে যায় দস্যুদের হাতে–ব্রাহ্ম-ক্ষত্রং যত্র বিরুধ্যতীহ/ অন্বগলং দস্যবস্ত ভজন্তে। এই প্রশ্নোত্তর থেকেই বোঝা যায় পুরূরবার জীবনে কী ঘটেছিল। আপন রাষ্ট্রে তিনি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বিরোধিতা করেছিলেন এবং তার রাজ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতোই হয়েছিল। হয়তো ধ্বংসসান্মুখ অবস্থায় এই কথোপকথন তাকে তখনকার সমাজের প্রচলিত পথে চলতে প্রেরণা জুগিয়ে থাকবে এবং হয়তো বা তিনি নিজেকে খানিকটা শুধরেও নিয়েছিলেন।
