পুরূরবার সিংহাসনে আরোহণ, ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তার বিরোধ এবং তাঁর ধ্বংস নিয়ে যদি একটা ঘটনা-পরম্পরা সাজিয়ে তোলা যায়, তাহলে উর্বশীর সঙ্গে তার মিলন, বিরহ এবং পুনর্মিলনের ঘটনা-পরম্পরা সাজিয়ে পুরূরবা কাহিনীতে দ্বিতীয় একটি স্তরও তৈরি করে ফেলা যায়। যদিও এমনটি কখনও জোর করে বলা ঠিক হবে না যে, পুরূরবা জীবনের প্রথমাংশের মধ্যে উর্বশীর অস্তিত্ব নেই অথবা এমনও ঠিক নয় যে, পুরূরবা-উর্বশীর প্রেম-কাহিনীর মধ্যেও তার ব্রাহ্মণ্য-বিরোধের অংশটুকু নেই। মনুষ্য-জীবন বাঁধা গত্ মেনে চলে না, অতএব পুরূরবার জীবনেও ব্রাহ্মণ-বিরোধের অংশ শেষ হয়েছে, তারপর উর্বশীর কাহিনী আরম্ভ হয়েছে–এমনটি ভাবার কোনও কারণ নেই।
বায়ু-পুরাণে দেখতে পাচ্ছি–সমুদ্রমেখলা এই পৃথিবীর সমস্ত অধিকার ভোগ করেও পুরূরবার লোভ কিছু কমেনি। ধন-রত্নের তৃষ্ণাও কিছু কমেনি তার–তুতোষ নৈব রত্নানাং লোভাদিতি হি নঃ শ্রুত। পুরূরবা যখন রাজত্ব করছেন সেই সময়েই নৈমিষারণ্যবাসী ঋষিরা এক বিশাল যজ্ঞ আরম্ভ করেন। দেব-কারিগর বিশ্বকর্মা এই মহান যজ্ঞের জন্য সোনা দিয়ে যজ্ঞভুমি বাঁধিয়ে দেন। যজ্ঞ আরম্ভ হল। স্বয়ং দেবগুরু বৃহস্পতি এই যজ্ঞেরক্রিয়াকলাপ দেখার জন্য উপস্থিত হলেন।
এদিকে মহারাজ পুরূরবা শিকারে বেরিয়েছেন। তার সঙ্গে লোক-লস্কর সৈন্য-সামন্ত ভিড় করে চলল এবং সেটা খুব বড় কথা নয়। সবচেয়ে বড় কথা, তার সঙ্গে সঙ্গে চললেন স্বর্গসুন্দরী উর্বশী, যিনি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন পুরূরবার আসঙ্গলিপ্সায়-উর্বশী চকমে যজ্ঞং দেবহৃতিপ্রণোদিতা। মৃগয়ায় বেরিয়ে এ দেশ সে দেশ ঘুরে পুরূরবা উপস্থিত হলেন নৈমিষারণ্যে–যেখানে সোনায় বাঁধানো যজ্ঞভূমিতে ঋষিদের যজ্ঞ চলছে পুরোদমে।
যজ্ঞস্থলীর পূণ্যমন্ত্র আর হবির্গন্ধে অতি-বড় অমানুষেরও হৃদয় দ্রবীভূত হয়, শ্রদ্ধায় চক্ষু নিমীলিত হয়। কিন্তু চন্দ্রবংশাবতংস বুধপুত্র ঐল পুরূরবার কানে মন্ত্র-গানের স্বরসঙ্গতি প্রবেশ করল না, তার মন আকুলিত হল না হবির্গন্ধে। যজ্ঞভূমিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ পড়ল সুবর্ণময় যজ্ঞভূমির ওপর। লোভে তার হৃদয় আলোড়িত হল, কার্যাকার্য জ্ঞান লুপ্ত হল। তার ইচ্ছে হল সেই মুহূর্তে নৈমিবারণ্যের সুবর্ণময় যজ্ঞভূমি উৎখাত করে নিয়ে যান লোভেন হতবিজ্ঞান স্তদাদাতুং প্রচক্রমে। ইচ্ছা এবং প্রক্রিয়া একই সঙ্গে শুরু হল। যজ্ঞযাজী ঋষি-ব্রাহ্মণদের ধৈর্য বেশিক্ষণ থাকল না। তারা মন্ত্রপূত কুশের আঘাতে মেরে ফেললেন। পুরূরবাকে। ঋষিদের কুশাঘাত বস্ত্র হয়ে নেমে এল পুরূরবার ওপর। রাত্রির শেষে সূর্যোদয়ের আগেই মারা গেলেন পুরূরবা–ততো নিশান্তে… কুশবজৈ নিষ্পিষ্টঃ স রাজা ব্যাহরত্তনুম।
সেই একই কথা। বেণের যেমন হয়েছিল। ঋষিদের হাতে মারা গেলেন পুরূরবা। সবচেয়ে বড় কথা– পুরূরবার এই নৈমিষারণ্য অভিযানের সময়ে অর্থাৎ রাজা যখন সেই পুণ্যস্থানের সুবর্ণময় যজ্ঞভূমি লুণ্ঠনের চেষ্টা করছেন সেই সময়ে স্বর্গসুন্দরী উর্বশী কিন্তু পুরূরবার পাশেই আছেন– আজহার চ তৎসত্রং স্বর্বেশ্যাসহসঙ্গতঃ। তাহলে অন্তত বায়ুপুরাণের ভাষ্য অনুযায়ী পুরূরবার জীবনে ব্রাহ্মণ-বিরোধিতার অংশটুকু উর্বশীর সঙ্গ-গন্ধ-বিরহিত নয়।
আশ্চর্যের বিষয় হল- পৌরাণিকেরা যে সব সূত্র থেকে পুরূরবার জীবন কাহিনী বিবৃত করেছেন, সেইসব সুত্রের মধ্যে একমাত্র মহাভারত বায়ু এবং ব্রহ্মান্ড পুরাণ ছাড়া আর কোথাও এই ব্রাহ্মণ-বিরোধিতার তথ্যটুকু তেমনভাবে ধরা নেই। উর্বশীর সঙ্গে পুরূরবা মিলন-বিরহের অধ্যায়টুকু আমরা না হয় আলদাভাবে একটা নতুন স্তরেই সাজিয়ে নেব। কিন্তু পুরূরবার সঙ্গে ব্রাহ্মণদের বিরোধিতা যে একটা হয়েছিল এবং পুরোপুরি মারা না গেলেও তার যে সাময়িক রাজ্যচ্যুতি গোছের কিছু হয়েছিল, তা মহাভারতের অন্য অংশ থেকেও বোঝা যায়। না, স্পষ্ট করে রাজ্যচ্যুতির কথা কিছু বলা নেই মহাভারতে। কিন্তু যে ভাবেই হোক তেমন কোনও বিপাকে তাকে অবশ্যই পড়তে হয়েছিল, তা বোঝা যায় মহাভারতের শান্তিপর্বে এসে। রাজ্যশাসন চালাতে গেলে ব্রাহ্মণদের ভূমিকা যে কতটা জরুরি, অপিচ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের পারস্পরিক সমন্বয় যে কতটা প্রয়োজনীয়, সে কথা পুরূরবার নানা প্রশ্নে সাতঙ্কে জিজ্ঞাসিত হয়েছে।
মহাভারতের শান্তিপর্বে পুরূরবার সঙ্গে একজন দেবতা এবং একজন ঋষির কথোপকথন সংকলিত হয়েছে। দেবতা এবং ঋষি-দুজনের কাছেই পুরূরবার প্রশ্ন ছিল একটাই–কিসে বড় ব্রাহ্মণরা? এবং কেনই বা পদে পদে মানিয়ে চলতে হবে ব্রাহ্মণদের সঙ্গে? বেণের ক্ষেত্রে তার পরবর্তী বংশজ পৃথু মহারাজকে ব্রাহ্মণেরা রাজা করেছিলেন; কারণ বেণ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তিনি কাউকে মানতেন না এবং তার অত্যাচার ছিল প্রাবাদিক পর্যায়ের। পুরূরবার অত্যাচার ব্যাপারটা সে রকম নয় বোধ হয়। তার নামে যে ব্রাহ্মণদের ধন-রত্ন লুণ্ঠনের দোষারোপ করা হয়েছে, আমাদের ধারণা–তার কারণ নিহিত আছে তার রাজ্য শাসনের পদ্ধতিতে। প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী ব্রাহ্মণরা যেহেতু যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা নিয়েই থাকতেন তাই রাজারা তাদের ওপর কোনও করের বোঝা চাপাতেন না। এই সাধারণ নীতির কথাটা কালিদাস তার নাটকের মধ্যেও বলে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। মহারাজ দুষ্যন্ত যখন শকুন্তলাকে প্রথমবার দেখে এসে বনের মধ্যে বিদূষকের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, তখন তার সমস্ত মন-প্রাণ আচ্ছন্ন। শকুন্তলা ছাড়া আর কিছু তিনি ভাবতেই পারছেন না। আরও একটিবার যাতে শকুন্তলার সঙ্গে দেখা করা যায়–তার জন্য যুক্তিবুদ্ধি, নানা ওজর এবং বাহানা তৈরি করতে লাগলেন। দুষ্যন্ত বললেন– তপস্বীরা যে আমাকে কেউ কেউ চিনেও ফেলেছে। এখন বলো তো কী করে আবার সেই কণ্ব-মুণির আশ্রমে ঢুকি? বিদূষক বললেন–তুমি দেশের রাজা। তোমার আবার অত ছুতো বার করার প্রয়োজন কী? বললেই হল- নীবার-ধানের একের ছয় ভাগ দেওয়ার কথা তোমাদের, সেই জন্য আবার এসেছি। রাজা বললেন–তুমি একটি মূর্ব। অন্য জাতিবর্ণের লোকেরা আমাদের যে কর দেয় তা বড়ই নম্বর। এঁদের রক্ষা করার জন্য আমরা অন্য জিনিস পেয়ে থাকি। ধনরত্বের চেয়ে তা অনেক বড়। ওঁরা ওঁদের তপস্যার এক ভাগ দেন রাজাকে। রাজার কাছে সেই তপস্যার পুণ্যধন অক্ষয়। অর্থাৎ করের কোনও প্রশ্নই নেই। ধর্মশাস্ত্রগুলিতেও ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ হয়েছে। চরম ভাষায়। কিন্তু পুরূরবা ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর নিতেন। কী খাতে সেই কর সংগ্রহ করা হত, তা স্পষ্ট করে না জানা গেলেও মহামতি কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রের মধ্যে সেই খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শর্তাব্দীতেই জানিয়ে দিয়েছেন–পুরূরবার সর্বনাশ হয়েছে চতুর্বর্ণের সব মানুষের ওপর ট্যাকস চাপিয়ে—লোভাদ ঐলশ্চাতুবর্ণম অত্যাহারয়মাণঃ।
