উপদেশ আরও অনেক আছে; পৃথু মহারাজ সে সবই মেনে নিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তার প্রতিজ্ঞা হল-ব্রাহ্মণরা সকলেই আমার প্রথম মান্য পুরুষ, আমি তাদের বিরুদ্ধে যাব না–ব্রাহ্মণাঃ মে মহাভাগাঃ নমস্যাঃ পুরুষর্ষঃ। আমার কাছে এই প্রতিজ্ঞাটুকুই বড় কথা। মনে রাখতে হবে–আর্যায়ণের প্রথম কল্পে ব্রাহ্মণরাই ছিলেন সবচেয়ে শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষ। তারা সমাজের নীতি-নিয়ম যেমন তৈরি করতেন রাজনীতি, দণ্ডনীতিও তাদেরই তৈরি। বেণ সেই ব্রাহ্মণদের নীতি-নিয়ম অস্বীকার করে আপন বৃদ্ধিতে বলশালী হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু সংঘবদ্ধ ব্রাহ্মণ্য-শক্তির সঙ্গে তিনি এঁটে উঠতে পারেননি। তাকে মরতে হয়েছে।
বেণও কিন্তু নিজে রাজা হননি। সমাজমুখ্য ব্রাহ্মণদের অনুমতি ক্রমেই তিনি রাজা হয়েছিলেন। কিন্তু যাগ-যজ্ঞ, দেবতা এবং সর্বোপরি ব্রাহ্মণদের আধিপত্য কথায় কথায় ব্রাহ্মণদের অনুজ্ঞা-উপদেশ তিনি মেনে নিতে পারেননি। বঙ্গীয় পণ্ডিত-জনের মতে বেণই প্রথম পুরুষ, যিনি এতকালের পরিচিত দেবতা-শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রের অধিকার অস্বীকার করেন। আমার ধারণা–ওই নিষাদ-ম্লেচ্ছদের কথা বললাম– আর্যায়ণের প্রথম পর্যায়ে দেশজ ওই ব্যক্তিরাই ব্রাহ্মণ্য-শক্তির বিরুদ্ধে বেণের সহচারী ছিলেন। বেণের মৃত্যুতে এবং দেব-ঋষি-মনোনীত পৃথুর রাজত্বে তারা পিছু হঠে গিয়ে বিন্ধ্যপর্বতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। আর্য-সভ্যতার বিকাশের প্রথম পর্বে দেশজ ব্যক্তিদের দক্ষিণে তাড়িত হওয়ার যে কল্পনা ঐতিহাসিকেরা সচরাচর করে থাকেন, তার ছায়া এই বেণের বাহু-মনের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায় বলে আমাদের বিশ্বাস।
বেণের ঘটনার সঙ্গে আমি পুরূরবার জীবনের সাদৃশ্য দেখাতে চাইছি। পুরূরবার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উত্তরপ্রদেশে গঙ্গানদীর তীরে। আর্যায়ণের দ্বিতীয় পর্যায় সেটা। নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা মানেই রাজার সেখানে একক প্রতিষ্ঠা। এরই মধ্যে ঋষি-ব্রাহ্মণেরা এসে যখন এই করো, সেই করো’ অথবা এটা ঠিক নয়, এটা অনুচিত’ বলে উপদেশ দিতে আরম্ভ করলেন, তখন সেই নীতি-নিয়মের শৃঙ্খল, আর আচার-বিচারের বিধি-নিষেধ কোনও এক-নায়ক রাজার মনোমত হয়? অতএব রাজা পুরূরবার দিক থেকে আরম্ভ হল সেই অত্যাচার উৎপীড়ন, ব্রাহ্মণ্যের মূল-উৎপাটনের সেই প্রচেষ্টা, যা আমরা বেণের আমলে দেখেছি। ব্রাহ্মণদের সঞ্চিত ধন-রত্ন লুষ্ঠিত হল, তাদের নীতি-নিয়মের বাক্য স্তব্ধ হল।
পুরূরবার রাজ্যে ব্রাহ্মণ্যের এই অপমান-উৎপীড়নে ব্যথিত হয়ে ব্রহ্মার মানসপুত্র সনৎকুমার ব্রহ্মলোক থেকে এলেন পুরূরবাকে বোঝাতে–সনৎকুমারস্তং রাজন্ ব্রহ্মলোকা উপেত্য হ। শ্রুতি-স্মৃতির নানা সদাচার উপদেশ করে সনকুমার পুরূরবাকে অনেক কথা বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তার সমস্ত অনুরোধ বৃথা হল। রাজা কানেই নিলেন না সে সব কথা–প্রত্যগৃহ্নান্ন চাপ্যসৌ। উৎপীড়ন, উৎপাটন, লুণ্ঠন আগের মতোই চলতে লাগল। ব্রাহ্মণ ঋষি-মুনিরা আবার সংঘবদ্ধ হলেন। ক্রুদ্ধ ক্ষুব্ধ মহর্ষিদের অভিশাপে রাজার রাজত্ব গেল। হিংসা লোভ আর শক্তিমত্তার জ্বালায় রাজার চেতনা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মহর্ষিরা লোভী বলোম্মত্ত রাজাকে অভিশাপে বিনষ্ট করলেন–ততো মহর্ষিভিঃ কুদ্ধৈ সদ্যঃ শতপ্তা বিনশ্যত।
আশ্চর্য হল, এর পরেই মহাভারতের বর্ণনায় দেখছি রাজা পুরুরবা গন্ধর্বলোকবাসিনী উর্বশীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন এবং ব্রাহ্মণ্য ক্রিয়াকলাপের জন্য তিনি পবিত্র অগ্নি বহন করে। নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে-আনিনায় ক্ৰিয়ার্থে মীন যধাবদবিহিতংস্ত্রি। এই অংশটাই বড় ভাবনার। তাহলে কি পুরূরবা মরেননি? ব্রাহ্মণরা কি অভিশাপ দিয়ে পুরূরবার জীবন। বিনষ্ট করতে পারেননি?
.
২১.
পুরূরবা মারা যাননি, ঠিক যেমন আমাদের ধারণা অত্যাচারী বেণও মারা যাননি। বেশের রাজত্ব এবং শাসন স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেশের দক্ষিণ বাহু মন্থন করে পৃথুর জন্ম হল– আধুনিক দৃষ্টিতে এই ভাষ্যও তত আদরণীয় নয়। মন’ শব্দটার মধ্যে একটা অন্বেষণের ইঙ্গিত থাকে সব সময়। শাস্ত্র মম্বন করা অথবা মৌখিকভাবে আমরা যেমন বলি জায়গাটা মথে ফেলেছি’–অথবা সেই সমুদ্রমন্থন- সর্বত্রই এই মন্থন বা মথে ফেলার মধ্যে একটা অন্বেষণের ব্যাপার থাকে। বাহু’ জিনিসটা ক্ষাত্র-শক্তির প্রতীক। বেণকে সিংহাসনচ্যুত করে তারই দক্ষিণ বাহু মন করে যে পৃথু রাজাকে পাওয়া গেল, তা আসলে বেণেরই বংশধারায় কোনও বিশ্বস্ত ক্ষত্রিয়কে খুঁজে বার করার ব্যাপার। দক্ষিণ মানে অবশ্যই ফেভারেবল’। বেণের বংশধারায় ব্রাহ্মণ সমাজের প্রতি অনুগত ব্যক্তিটিই হলেন পৃথু। পৃথুকে লাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই সমবেত ব্রাহ্মণরা তাকে বলেছেন- মনে-প্রাণে প্রতিজ্ঞা করো, পৃথু! প্রতিজ্ঞাধিরোহস্ব প্রতিজ্ঞা করো- ‘আমি এই ভূলোকবাসী ব্রাহ্মণদের সযত্নে পালন করব। তাদের আমি দণ্ড দেব না কোনওদিন–অদ্যা মে দ্বিজাশ্চেতি প্রতিজানীহি হে বিভো। পৃথু স্বীকার করে নিয়েছেন ব্রাহ্মণদের কথা–এবমস্তু।
কথা হল– বেণের মতো চন্দ্রবংশীয় পুরূরবারও একটা রূপক-মৃত্যু আছে। মনে রাখতে হবে, মহাভারতে গন্ধর্বলোক থেকে পুরূরবা যে উর্বশীকে নিয়ে এলেন, সে ঘটনাটা বর্ণিত হয়েছে ব্রাহ্মণদের হাতে পুরূরবার ধ্বংসের পর।
