বস্তুত সারা সংবাদ-সূক্তটিতে যাগ-যজ্ঞ দেবতাদের কথা কিছু নেই। একেবারে শেষ পংক্তিতে উর্বশীর এই হোম-যজ্ঞের উপদেশ পৌরাণিকদের ভাবিত করেছে। তারা পুরূরবা উর্বশী আখ্যানের শেষ পর্বে দেখিয়েছেন কীভাবে পুরূরবা বৈদিক অগ্নিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসছেন এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত অগ্নিসমিন্ধন করে পুরূরবা আপন অভিলাষ পূরণ করছেন।
আমি আসলে শেষ কথাটা আগে বলে ফেলেছি-পুরূরবা বৈদিক অগ্নিকে নিয়ে এলেন নিজের বাড়িতে। মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ পড়ে যা মনে হয়, তা হল–প্রতিষ্ঠানপুরের রাজা হবার পর তার মর্যাদা যখন খুব বেড়ে গেল, তখন তার মধ্যে ঐশ্বর্যের মত্ততাও কিছু জন্ম নিল। মহাভারত বলেছে–রাজা হবার পর পুরূরবা ঐশ্বর্য এবং শক্তিতে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। এর প্রথম ফল হল–তিনি রাজ্যের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিবাদ-বিসম্বাদ আরম্ভ করলেন- বিঃৈ স বিগ্রহং চক্রে বীর্যোন্মত্তঃ পুরূরবাঃ। যজন-যাজন-অধ্যাপনে যতটুকু সম্পত্তি ব্রাহ্মণদের লাভ হত, পুরূরবা তা সবই জোর করে নিয়ে নিতেন। ব্রাহ্মণরা কান্নাকাটি কম করতেন না। তাদের সমস্ত অনুরোধ-উপরোধ ঠেলে ফেলে দিয়ে পুরূরবা তাদের ধন-রত্ন কেড়ে নিতেন-জহার চ স বিপ্রাণাং রত্নাব্যুৎক্রোশমপি।
ঠিক এই জায়গাটায় আমাদের টিপ্পনি দিতে হবে সামান্য।
মনে রাখতে হবে–পুরূরবা পিতৃপরম্পরায় কোনও বাধা রাজ্য পাননি। প্রধানত তার। মায়ের চেষ্টা অথবা তার পালক পিতার চেষ্টায় তিনি প্রতিষ্ঠানপুরে রাজ্য লাভ করেছিলেন। সে যুগে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের যে বিভাগ ছিল, তা শুধুই বর্ণের তর-তম। ব্রাহ্মণরা সাধারণ যাগ-যজ্ঞ নিয়ে থাকলেও রাজদরবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল নিবিড়। বিশেষত ক্ষত্রিয় রাজার পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে, তাদের যাগ-যজ্ঞের কাজও খানিকটা ব্যাহত হত। আবার পদে পদে ব্রাহ্মণের অনুজ্ঞা না পেলে বা না মানলে ক্ষত্রিয় রাজাদেরও অসুবিধে হত।
আর্যায়ণের প্রথম কল্পে যখনই কোনও ক্ষত্রিয় রাজা অন্যত্র রাজ্য জয় করে তার অধিকার কায়েম করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণরাও তাদের সঙ্গে আসতেন। বঙ্গদেশেও ব্রাহ্মণ্য অধিকার এইভাবে ঘটেছে, দাক্ষিণাত্যেও তাই ঘটেছে। ধরে নিতে পারি কাশ্মীর-পাঞ্জাব থেকে উত্তরপ্রদেশে আসার সময় গঙ্গার স্রোতধৌত ভূমিখণ্ডেও ব্রাহ্মণ অধিকার একইভাবে জন্মেছে। ইতিহাস-পুরাণে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক যদি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যাবে প্রায়ই এই দুই উচ্চ বর্ণের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। ক্কচিৎ কখনও যে গণ্ডগোল ঘটেছে–যেমন পরশুরাম, বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সময় (এবং এছাড়াও আরও কিছু উদাহরণ আছে), সেই ক্রাইসিস পিরিয়ড’গুলি ছাড়া ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা চিরকালই এক সুসংহত শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। যারা নিম্নবর্ণের ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচারের ইতিহাস রচনা করেছেন, তারাও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের এই মিলিত শক্তিকেই অত্যাচারের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু মুশকিল হল, আর্যায়ণের প্রথম কল্পে এই সংহতি অত সম্পূর্ণ ছিল না। স্মরণ করা যেতে পারে বেণ রাজার কথা। প্রায় প্রত্যেক পুরাণে এবং অবশ্যই মহাভারতেও বেণের উপাখ্যান পাওয়া যাবে পৃথু রাজার প্রসঙ্গে। পৌরাণিক শ্রুতি অনুসারে পৃথু হলেন এই পৃথিবীর প্রথম রাজা। মহারাজ পৃথুর নাম থেকেই আমাদের এই বাসভূমির নাম পৃথ্বী অথবা সংযুক্ত বর্ণ ভেঙে পৃথিবী। পৃথিবীতে প্রথম আইনের শাসন নিয়ে আসা অথবা পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করার মর্যাদা দেওয়া হয় পৃথুকেই। কিন্তু যে পুরুষটি থেকে পৃথুর জন্ম হয়, সেই বেণই কিন্তু ছিলেন প্রথম রাজা। মহাভারতে যেখানে পুরূরবার কথা আছে, তার কিছু আগেই বেণের কথা আছে।
মহাভারত এবং পুরাণগুলিতে দেখা যাবে-বেণ রাজা হবার পরেই দেবতা এবং ব্রাহ্মণদের অস্বীকার করে বসেন। ঐশ্বর্যে মদমত্ত হয়ে তিনি প্রচার করতে থাকেন–দেবতা এবং ব্রাহ্মণদের মান্য করার কিছু নেই, পুজো যদি করতেই হয় তো আমাকে করো। আমি রাজা, আমিই এই সংসারে একমাত্র পূজনীয় ব্যক্তি–অহমিজ্যশ্চ পূজশ্চ। বেণ অত্যন্ত অত্যাচারী হয়ে পড়লেন, কাউকেই তিনি আর মানেন না। এই অবস্থায় ব্রাহ্মণ-ঋষিরা সংঘবদ্ধ হলেন এবং মন্ত্রপূত কুশের আঘাতে তাকে মেরে ফেলেন। অত্যাচারী বেণের মৃত্যুর পর সমবেত ঋষি-ব্রাহ্মণ মৃত বেণের দক্ষিণ ঊরু মন্থন করতে আরম্ভ করলেন-মমন্থ দক্ষিণং চোরু ঋষয়ে ব্রহ্মবাদিনঃ 1 সেই উরু-মন্থনের ফলে জন্ম নিল নিষাদেরা–দেখতে তারা হ্রস্বকায়, রক্তচক্ষু, কৃষ্ণকেশ। নিষাদেরা জন্মানো-মাত্রই ঋষিরা তাদের বললেন–ব্যাটারা বসে থাক চুপ করে–যার সংস্কৃত শব্দ হল ‘নিষীদ’। এই নিষীদ’ থেকেই নিষাদ শব্দ। নিষাদ- যাদের আমরা পরবর্তীকালে ম্লেচ্ছ বলে ডেকেছি, ব্যাধ বলে ডেকেছি অথবা অনার্য-অধম ক্রুর এক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছি, সেই নিষাদেরা অতঃপর বিন্ধ্যপর্বতের প্রত্যন্তভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নিল–যে চান্যে বিন্ধ্যনিলয়া ম্লেচ্ছাঃ শতসহস্রশঃ।
নৃতত্ত্বের নিরিখে এই নিষাদ-মেচ্ছদের কথা আমরা পরে ভাবব, আপাতত জানাই–ঋষিরা এরপর বেশের দক্ষিণ বাহু মম্বন করা আরম্ভ করলেন এবং সেই মন্থনের ফলে জন্মালেন মহারাজ পৃথু-ইন্দ্রের মতো তাকে দেখতে, ইন্দ্রের মতোই তার প্রভাব প্রতিপত্তি। পৃথিবীর সেই প্রথম রাজা জন্মগ্রহণ করেই বুঝলেন তার মধ্যে রাজধর্মের শুদ্ধবুদ্ধিটুকু আছে। দেবতারা এবং ঋষিরা সমস্বরে তাকে বললেন–রাজা! তুমি তোমার নিজের পছন্দ-অপছন্দ বাদ দিয়ে সমস্ত মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টি দাও–প্রিয়াপ্রিয়ে পরিত্যজ্য সমঃ সর্বেষু জন্তুষু।
