দক্ষিণ ভারতের প্রতিষ্ঠান-পুরী যে উত্তর-ভারতের আদলে অথবা নাম-সাম্যেই তৈরি হয়েছিল, তার একটা বড় প্রমাণ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পতনের পরেই দাক্ষিণাত্যে যে সমস্ত রাজবংশ মাথা তুলে দাঁড়ায়, তাদের অন্তত একটি ধারা দাক্ষিণাত্যের প্রতিষ্ঠান-পুরীকে মহিমান্বিত করে তোলে। গৌতমীপুত্র সাতকণীর ইতিহাস আরম্ভ হয়েছে আরও অনেক পরে। পুরাণমতে দাক্ষিণাত্যের প্রতিষ্ঠানে সাতবাহন বংশের প্রথম রাজা ছিলেন গৌতমীপুত্র পুলোমা, যাকে স্ট্রাবো বলেছেন ‘P(1)olemaios of Baithan’ অর্থাৎ স্ক্রাবোর বৈঠান’ অথবা দেশীয় উচ্চারণে যেটা পৈঠান, সেটাই সংস্কৃত পুরাণ-মহাভারতের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু উত্তরভারতে পুরূরবার রাজধানী প্রতিষ্ঠান, যেটাকে আমরা, আধুনিক ইলাহাবাদের কাছে স্থান দিয়েছি, আধুনিক অপভ্রংশে সেই প্রতিষ্ঠান একখানি গ্রাম নামের মধ্যে টিকে আছে। তার নাম পিহান। জয়চন্দ্র বিদ্যালংকার অনেক যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি ধরার চেষ্টা করেছেন পিহান’ নামটির মধ্যে। অন্যদিকে কিছু পণ্ডিত মোটামুটিভাবে গঙ্গার তীরে প্রয়াগের কাছে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছেন, স্পষ্ট করে পিহান’ নামটি আর তারা উল্লেখ করেননি।
পুরূরবার প্রতিষ্ঠান পিহানই হোক অথবা অন্য কিছু, অন্তত এই প্রসঙ্গে আমরা ধরে নিতে পারি যে, আর্যরা ততদিনে কাশ্মীর-পাঞ্জাবের বাসভূমি ত্যাগ করে উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং রাজত্বের জন্য নতুন একটি নগর প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত পূর্বতন দেবভূমির সঙ্গে পুরূরবার যোগসূত্র ছিন্ন হয়নি। বরং বলা যায় দেবতা অথবা দেবকল্প ব্যক্তিরাই তখনও পুরূরবার সঙ্গী। মহাভারতে দেখতে পাচ্ছি–পুরূরবা মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সদা-সর্বদা দেবতা বা দেব-সদৃশ ব্যক্তিদের দ্বারাই পরিবৃত থাকতেন–অমানুষৈবৃতঃ সর্মৈানুষঃ সন্ মহাযশাঃ। পরিষ্কার বোঝা যায়, আর্যায়ণের প্রথম কল্পে যারা নতুন নগরীর প্রতিষ্ঠায় পুরূরবার সঙ্গী হয়েছিলেন তারা কেউই তখনও চলে যাননি।
প্রতিষ্ঠান নগরীর রাজা হয়ে, জম্বুদ্বীপের অর্ন্তগত অন্তত তেরোটি বিশাল ভূখণ্ডের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে পুরূরবার মান মর্যাদা যেমন বেড়ে গেল, তেমনই তার মত্ততাও কিছু বেড়ে গেল। ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতা অতিরিক্ত হয়ে গেলে অতি বিচক্ষণ এবং ধীমান ব্যক্তিরও স্বলন ঘটে, পুরূরবার মধ্যেও সেই স্বলন দেখা দিল। যে সমস্ত দেবপ্রতিম ব্যক্তি পুরূরবার সঙ্গে ছিলেন, তারাও এই স্বলন রোধ করেননি অথবা তারা স্বার্থবশে পুরূরবার পতনের সঙ্গী হয়েছিলেন।
আমাকে দু-এক জনে বলেছেন–মহাভারতের মধ্যে পাণ্ডবদের প্রতি মহাভারতের বক্তার যেন পক্ষপাত আছে। পাণ্ডবদের সবই ভাল আর কৌরবদের সব খারাপ, এমন একটা ভাব যেন লক্ষ্য করা যায়। কথাটা আরও গাল-ভরা করে একই নোক বলেছিলেন–মহাভারতের কবি, বক্তা–এঁরা তো সব রয়্যাল প্যাট্রোনেজে দিন কাটাতেন, তাই চলমান রাজবংশের সুখ্যাতি তাদের করতেই হত। আমি বলি–এ সব ধারণা খানিকটা মহাভারত না পড়ার ফল, আর খানিকটা মহাভারতের গৌণ-গ্রন্থ পড়ার ফল। কতগুলি সাহেব এবং বাঙালি সাহেব আছেন, তারা আবার নানা রকম ইজ’ মিশ্রিত মহাভারতের ওপর লেখা গৌণ গবেষণাগ্রন্থ পাঠ করে নানা সিদ্ধান্ত দেন।
দিতেই পারেন। মহাভারত এতই বড় ব্যাপার যে সেটিকে নানা দিক থেকে বিচার করা যেতেই পারে এবং নানা মতামতও দেওয়া যেতে পারে। আমার কাছে সে সকলই শিরোধার্য। কিন্তু দুঃখ পাই, যা নয় তাই বললে। রাজা-রাজড়ার আনুগত্যে সৃত-মাগধদের পক্ষপাত নিশ্চয়ই ধরা পড়ত কিন্তু তাই বলে তারা ইতিহাস এড়িয়ে যেতেন না। পূর্বতন বংশধারায় কলঙ্ক থাকলে, হিংসা-অসুয়া থাকলে, তাও তারা লুকোতেন না। কোনও না কোনও জায়গায় ঠিক তাঁরা বলে দিতেন। এই কথাটা পাণ্ডবদের মূল পুরুষ পুরূরবা সম্বন্ধেও খাটে বলে এখনই কথাটা তুললাম এবং পরেও এসব কথা আসবে।
বেদের মধ্যে পুরূরবার কীর্তি কাহিনী কিছু আছে। ঋগবেদের মূল পর্বের নিরিখে পুরূরবার প্রসঙ্গ যতই অর্বাচীন হোক–কিছু পণ্ডিত ঋগবেদে পুরূরবার কথাবস্তুকে অর্বাচীনই বলে থাকেন–তবু মনে রাখতে হবে সেই বিখ্যাত উক্তিটি-ইতিহাস-পুরাণাভ্যাং বেদং সমুপবৃংহয়েৎ–অর্থাৎ মহাভারত-পুরাণগুলি দিয়েই বেদের কথা পরিপূরণ করতে হবে, সাবানসিয়েট’ করতে হবে। আর এখানে সেই ‘সাবটানসিয়েশন’ খুব ভালভাবেই করা যায়।
দেখবেন–প্রায় প্রত্যেক পুরাণেই মর্ত্যভূমির রাজা পুরূরবার সঙ্গে স্বর্গসুন্দরী উর্বশীর মিলন-বিরহের কথা সবিস্তারে বলা আছে। কিছু আছে মহাভারতেও। ইতিহাস পুরাণের এই সবিস্তার কাহিনীর মূল উৎস কিন্তু বেদ। বেদের মধ্যে পুরূরবা-উর্বশীর কাহিনীটি আছে কথোপকথনের আকারে, যাকে পরিভাষায় বলে সংবাদ-সূক্ত। দেবতা, যজ্ঞ, আহুতি আর প্রার্থনাই যেখানে বৈদিক সূক্তগুলির প্রধান অভিজ্ঞান–সেখানে উর্বশী-পুরূরবার এই কথোপকথনের অংশটুকু এতই মধুর এবং নাটকীয় যে, পণ্ডিতজনেরা অনেকেই এই সংবাদ-সূক্তটিকে পরবর্তী সংস্কৃত নাটকের বীজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। উর্বশী-পুরূরবার মিলন-বিরহের কথায় আমি পরে আসছি। আমার বক্তব্য আপাতত অন্য কিছু। বেদে উর্বশী-পুরূরবার কথোপকথন অংশের শেষে দেখা যাবে–উর্বশী পুরূরবাকে বলছেন–এই দেবতারা বলছেন পুরূরবা তুমি মৃত্যুঞ্জয়ী হবে, তোমার পুত্রেরা সকলেই হোমদ্রব্য দিয়ে দেবতাদের আহুতি রচনা করবে, তুমি স্বর্গে আমোদিত হবে-প্রজা তে দেবান্ হবিষ যজাতি স্বর্গ উ ত্বমপি মায়াসে।
