মহাভারতে যেখানে প্রথমবার কৌরব-পাণ্ডবদের বংশ-পরিচয় দেওয়া হচ্ছে, সেখানে পিতার নাম না করে পরিষ্কার বলা হয়েছে পুরূরবা জন্মগ্রহণ করেন ইলার গর্ভে–পুরূরবাস্ততে বিদ্বান্ ইলায়াং সম্পদ্যত। এই কিছুদিন আগেও একটি বিবাহিতা রমণীর জীবনে একাধিক পুরুষের আনাগোনা ঘটলে তিনি আর স্বামীদের পদবি ব্যবহার না করে দেবী’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। একইভাবে ইলার জীবনেও সম্ভবত দুটি পুরুষের রতি-আসক্তি থাকায় পুরূরবা আর পিতার নামে বিখ্যাত হননি। মায়ের নামে তিনি ‘ঐল পুরূরবা’, ঠিক যেমন বৈদিক যুগে মামতেয় দীর্ঘতমা, জাবাল সত্যকাম। গর্ভধারণ এবং পালন একসঙ্গে চালিয়ে ইলাই তার মা এবং বাবা দুইই, মহাভারতের ভাষায়–সা বৈ তস্যাভবম্মাতা পিতা চৈববতি নঃ শ্রুত।
মহাভারত ইলাকে একসঙ্গে পুরূরবার বাবা এবং মা বলায় পর্তীকালে পৌরাণিকদের মহাদেবের অভিশাপ নামিয়ে এনে তাকে একবার পুরুষ একবার স্ত্রীতে রূপান্তরিত করতে হয়েছে। পুত্রের জন্ম দিয়েই বুধ যে-স্বর্গেই চলে যান না কেন, ইলার অন্যতর স্বামী বুধের ঔরসজাত পুত্রের রাজ্যের ব্যবস্থা করে দিয়ে হয়তো ইলাকে নিয়েই চলে গিয়েছিলেন সেই পরম রম্য স্থানে, যার নাম ইলার নামসাজাত্যে ইলাবৃতবর্ষ।
মৎস্য পুরাণ বলেছে–সূর্য বংশ এবং চন্দ্রবংশের আদিতে মনুর প্রথম পুত্র ইলই ছিলেন প্রথম রাজা-সোমার্কংশয়োরাদাবিলো’ভূ-মনুনন্দনঃ। আমার মতে ইল নয়, মনুর প্রথম কন্যা সন্তান ইলাই ছিলেন নামত রাজা এবং কার্যত তার প্রথম স্বামী সুদ্যুম্ন এই রাজ্য চালাতেন। তারপর এর মধ্যে ইলার গর্ভজাত পুত্রের পিতৃত্ব চন্দ্রপুত্র বুধের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে প্রজাদের অসন্তোষে সুদ্যুম্ন রাজ্যচ্যুত হন এবং মূল সূর্যবংশ বা মনুবংশের পরম্পরা চলতে থাকে মনুর প্রথম পুত্র সন্তান ইক্ষাকুর নামে। আর বুধপুত্র ঐল পুরূরবা ঠাকুরদাদা চন্দ্রের নাম নিয়ে রাজ্য আরম্ভ করলেন প্রতিষ্ঠানপুরে ইলাহাবাদের কাছে। হরিবংশ মন্তব্য করেছে–মনুর বংশ পরম্পরায় ইকু যেমন সুন্দর একটি রাজ্য পেলেন শাসন করার জন্য, সুদ্যুম্ন তা পেলেন না-সুদ্যুম্নে নৈনং গুণমবাপ্তবান্। আমাদের কল্পনায়–চন্দ্রবংশের সূত্রপাতেই এই যে প্রাপ্য রাজ্য না পাওয়ার ঘটনাটুকু ঘটে গেল, এই না পাওয়ার রাজনীতি নিয়তির মতো স্পর্শ করে রইল সেই পাণ্ডব-বংশ পর্যন্ত। কারণ ঐল পুরূরবার রাজধানী প্রতিষ্ঠানপুরই পরে হস্তিনাপুরে পরিণত হয়েছে এবং পাণ্ডবরা সেই রাজ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। পরের কথা পরে আসবে, আমরা চন্দ্রবংশের পরম্পরায় এবার পুরূরবার কথা বলি।
শুধু পুরূরবা নয়, ঐল পুরূরবা, ইলার ছেলে পুরূরবা। চন্দ্রের নাতি পুরূরবা। বৈবস্বত মনুর সঙ্গে তার বংশ-পরম্পরা সংসৃষ্ট হলেও মূল পরম্পরা নেমে এল চন্দ্র থেকে। চন্দ্র, বুধ, পুরূরবা। এই প্রথম একটা নাম পেলাম যার মধ্যে তথাকথিত দেবতার তেজটুকু পেলাম, বুধ-নক্ষত্রের আলোটুকু পেলাম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিপূর্ণ মানুষও পেলাম–ঐল পুরূরবা, স্ত্রী-পুরুষের একাকার মানস থেকে জাত ইলার ছেলে পুরূরবা।
লক্ষণীয় বিষয় হল–এই একটি রাজনাম, যার মধ্যে বৈদিক যুগের শেষ স্বাক্ষরটুকু রয়েছে, আর মহাভারত পুরাণের আরম্ভও তাকে দিয়েই। তখনও স্বর্গবাসী দেবগণের সঙ্গে মনুষ্যলোকের গভীর যাতায়াত ছিল। বেদে আছে পুরূরবা যখন জন্মেছিলেন তখন নাকি স্বর্গমোহিনী অপ্সরারা তাকে দেখতে এসেছিলেন, তাঁর জন্মোৎসবে নৃত্য করেছিলেন সমস্মিন্ জায়মান আসত গা উতেমবর্ধদ্যঃ স্বতঃ। কে জানত এক মোহিনী অপ্সরার সঙ্গেই তার সমস্ত জীবন বাধা হয়ে যাবে! ঘটনাটা আনুপূর্বিক জানাই।
পৌরাণিকেরা জানিয়েছেন–পুরূরবা জন্ম লাভ করার পর তার জন্মদাতা পিতা বুধ তাকে মায়ের কাছে রেখে স্বর্গের পথে ফিরে গিয়েছিলেন। ঠিক যে জায়গাটায় পুরূরবা জন্মেছিলেন সে জায়গাটা অবশ্যই অরণ্যসঙ্কুল পার্বত্য অঞ্চল। তীর্থযাত্রাধ্যায়ে মহাভারতের কথা যদি ঠিক হয়, তবে বলতে হবে পুরূরবার সেই জন্মস্থান পরবর্তীকালে বিখ্যাত হয়েছিল পুরু-পর্বত নামে-পর্বতশ্চ পুরুর্নাম যত্ৰ জাতঃ পুরুরবাঃ। পিতৃবিরহিত পুরূরবাকে নিয়ে তাঁর মা ইলা মোটেই ভেঙে পড়েননি কারণ মানুষ নামে খ্যাত প্রথম পুরুষ মনুর তিনি বংশধর। তার আকৃতি প্রকৃতি সাহস একটু আলাদা। পিতার কাছে তিনি রাজ্যের অধিকার চাননি। সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিত্বে এবং চেষ্টায়–সে চেষ্টার মধ্যে সুন্ন নামে কোনও অভিমত বশংবদ পুরুষের স্বেচ্ছাবদান থাকুক আর নাই থাকুক–তিনি পুত্র পুরূরবাকে প্রতিষ্ঠান রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। এইজন্যই তিনি মহাভারতের শ্লোকে পুরূরবার মাতাও বটে পিতাও বটে। টীকাকারেরা প্রাচীন শ্লোক উদ্ধার করে বলেছেন–এ ব্যাপারে মা হয়েও তিনি পুরুষের স্বভাবে পুত্রকে রাজ্যদান করেছিলেন, সেই কারণেই তিনি একই দেহে পুরূরবার মাতা এবং পিতা দুইই–মাতৈব লব্ধপুংভাবা রাজ্যদানাৎ পিতাপ্যভূৎ মুখ্যঃ পিতা তু বুধ এব। সেই কারণে পুরূরবাও ঐল পুরূরবা।
মহাভারতে দেখতে পাচ্ছি–প্রতিষ্ঠানে রাজধানী স্থাপন করে যে ক্ষুদ্র রাজ্যটির প্রতিষ্ঠা হল, পুরূরবার রাজত্বকালে সেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। পুরূরবা শুধু নবীন প্রতিষ্ঠানপুরের রাজা রইলেন না। এই ভারতবর্ষ যে বিশাল ভূখণ্ডের অন্তর্গত সেই জম্বুদ্বীপের অন্তত তেরোখানি উপদ্বীপের ওপর পুরূরবার অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল-ত্রয়োদশ সমুদ্রস্য দ্বীপান পুরূরবাঃ। এ কথার মধ্যে অতিশয়োক্তি একটু-আধটু থাকতেই পারে। প্রাচীনকালের স্বর্ণপ্রস্থ কি চন্দ্ৰশুকের মতো উপদ্বীপ পুরূরবার অধিকারে নাই থাকুক, কিন্তু এই তেরো দ্বীপের ভুক্তি দেখিয়ে একথা অবশ্যই প্রমাণ করা গেল যে, পুরূরবার ক্ষমতা এবং মর্যাদা ছড়িয়ে গিয়েছিল তার রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপুরের আদলে দক্ষিণ-ভারতেও অন্য একটি রাজধানী তৈরি হয়েছিল। মহামান্য সাতবাহন বংশের গৌতমীপুত্র সাতকণী এবং অন্যান্য রাজারা এইখানেই রাজত্ব করতেন।
