বায়ু পুরাণ সত্য কথাটা একবার মাত্র বলে ফেলেছে। কিন্তু মজা হল, ইলাকে নিয়ে যে কল্পকাহিনী পূর্বেই তৈরি হয়ে গেছে, তা বায়ু পুরাণের কথকঠাকুরদের পক্ষে এড়ানো অসম্ভব ছিল। তাই বায়ু পুরাণ পূর্বে বলে নিয়েছে–ইলাই পরে মনুর পুত্র সুদ্যুম্ন নামে বিখ্যাত হন। অর্থাৎ সেই বাধা গত–ইলা মেয়েও ছিলেন আবার ছেলেও ছিলেন। কিন্তু শুধু বায়ু পুরাণ কেন, অধিকাংশ পুরাণই একই কথা বলেছে। এর মধ্যে শুধু দেবীভাগবত পুরাণ মনু বংশের সব কথা বাদ দিয়ে চন্দ্র-তারা বৃহস্পতির উপাখ্যানের পরম্পরায় পরের অধ্যায় আরম্ভ করেছে এইভাবে–সুদ্যুম্ন নামে এক অতীব যশস্বী রাজা ছিলেন। তিনি ঘোড়ায় চড়ে মৃগয়া করতে করতে সেই মহাদেবের বিহারভূমিতে ঢুকলেন আর স্ত্রীতে পরিণত হলেন। বস্তুত, সুদ্যুম্ন বলে সম্পূর্ণ পৃথক একটি পুরুষ মানুষের কথা অন্য কোনও পুরাণ বলেনি। দেবীভাগবতের প্রমাণে আমরা সুদ্যুম্ন নামে একটি পৃথক পুরুষকেই শুধু চিহ্নিত করতে চেয়েছি।
ইলা অথবা সুদ্যুম্ন–কে আগে মেয়ে ছিলেন, কে পুরুষ ছিলেন, এই তর্কে আমরা যাচ্ছি না। পৌরাণিকদের এই কল্পনা আমার কাছে তত আদরণীয়ও নয়। বরং আমি যেটা বিশ্বাস করি, তারই পরম্পরা ধরে বলি-হরিবংশ, ব্রহ্মপুরাণের মতো নামী পুরাণগুলি থেকে জানা যায়–প্রথমজন্মা মনুর নয় মহান পুত্রের কেউই যখন জন্মাননি, তখনই মিত্রাবরুণের যজ্ঞ থেকে ইলা জন্মেছিলেন–অনুৎপন্নেষু নবসু পুত্রেম্বেতেষু ভারত। অর্থাৎ মনু যতই পুত্র কামনা করে যজ্ঞ করে থাকুন, তার প্রথম সন্তানটি কিন্তু পুত্র নয়, কন্যাই। তবে কন্যা হলেও তার মূল্য কম ছিল না। হয়তো সুদ্যুম্ন নামে কোনও রাজার সঙ্গে তার প্রথম বিবাহ বা মিলন কিছু হয়েছিল। কিন্তু চন্দ্রপুত্র বুধের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কোনও ভাবে তিনি সুদমকে ভুলেই ছিলেন। কেননা চন্দ্রপুত্র বুধের আকর্ষণ তার কাছে এতই বেশি ছিল যে, সুমকে ভোলা তার পক্ষে অসম্ভব হয়নি। কিন্তু সেই মিলন সম্পূর্ণ হওয়ার পর যখন বুধের ঔরসে পুরূরবার জন্ম। হল, তারপরেই হয়তো পুর্বতন স্বামীর সম্বন্ধটুকু তার মনে পড়েছে এবং তিনি ফিরেও এসেছেন সুদ্যুম্নের কাছে। এই প্রত্যাবর্তনের কথা যে যে পুরাণে আছে, সেই সেই পুরাণে এটা যে ভাবেই থাকুক, আমাকে বিশ্বাস করতে হবে সেই বায়ু পুরাণের কথা-সুদ্যুম্নং পুনরাগতা–অর্থাৎ তিনি আবার সুদৃশ্নের কাছে ফিরে এলেন।
০২০. একমাস পুরুষ আর একমাস স্ত্রী
২০.
পৌরাণিকেরা বলেছেন–একমাস পুরুষ আর একমাস স্ত্রী হয়ে থাকার ফলে সুদ্যুম্নের পক্ষে বেশিদিন রাজত্ব করা সম্ভব হয়নি। এর কারণ এই নয় যে, তিনি রাজা হিসাবে অকৃতকার্য ছিলেন। আসলে পুংত্ত্ব এবং স্ত্রীত্বের বিপরিবর্তনে যেভাবে রাজ্য শাসন চলছিল তাতে প্রজারা সুদ্যুম্নের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিল না এবং তারা তাকে তেমন করে আর অভিনন্দনও করত না–প্রজাস্তস্মিন্ সমুদ্বিগ্না নাভ্যনন্দ মহীপতিম্।
আমি পূর্বে বলেছি–ইলা ছিলেন মনুর প্রথম কন্যা সন্তান। মনুপুত্রদের পরিচয় দেবার সময় মহাভারতও তাকে কন্যা বলেই স্ত্রীলিঙ্গ শব্দে এবং বিশেষণে চিহ্নিত করেছে–তথা চৈবাষ্টমীম্ ইলা। অর্থাৎ মহাভারতের মতে ইলা মনুর অষ্টম সন্তান এবং তিনি কন্যা। আগেই বলেছি, সম্ভবত সুদ্যুম্ন নামে এক রাজার সঙ্গে তার প্রথম মিলন সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু চন্দ্রপুত্র বুধের সঙ্গে সানন্দ মিলনে পুরূরবার জন্ম দেওয়ার পর আবারও যখন তিনি সুদ্যুম্নের কাছে ফিরে এলেন–সুদ্যুম্নং পুনরাগতা–তখন হয়তো রাজার বিষয়ে প্রজাদের অসন্তোষ ঘটে থাকবে। হয়তো সেই কারণেই প্রজারা রাজাকে আর অভিনন্দন করত না। সুদ্যুম্ন কিন্তু বুধের পুত্র পুরূরবাকে পুত্রের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং তাকে নিজের কাছেই রেখেছিলেন।
লক্ষণীয় বিষয় হল, প্রজাদের অসন্তোষ ঘটলে সুদ্যুম্ন কিন্তু নিজ-ভুক্ত রাজ্যখানিও পুত্র পুরূরবাকে দিয়ে যেতে পারেননি। চন্দ্রবংশাবতংশ বুধের পুত্র পুরূরবাকে তিনি নিজের ঘরে রেখে যতই যত্ন-আত্তি করুন, সুদ্যুম্ন ওরফে ইল রাজা কিন্তু তাকে নিজের রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারলেন না। কারণ হয়তো সেই প্রজাদের অসন্তোষ। প্রাচীন পুরাণ বলেছে–পুরুষাবস্থায় ইল রাজা (অর্থাৎ সুদ্যুম্ন) পুরূরবাকে প্রতিষ্ঠান নামে এক নতুন রাজ্যে অভিষিক্ত করলেন–প্রতিষ্টানে ভিষিচ্যাথ স পুরূরবসং সুতম।
আমরা এতক্ষণ ধরে ইল রাজা বা ইলার কাহিনী শোনালাম শুধু এই তথ্যটুকুর জন্য। কারণ এই প্রতিষ্ঠানেই কুরু-পাণ্ডব বংশের পূর্ববর্তী রাজারা সকলেই রাজত্ব করতেন। নতুন নগরের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বলেই হয়তো এই নগরের নাম প্রতিষ্ঠান এবং এই সুযোগে জানানো দরকার যে এই প্রতিষ্ঠান হল এখনকার ইলাহাবাদের নিকটবর্তী একটি জনস্থান। পৌরাণিকেরা বলেছেন–পুরূরবাকে প্রতিষ্ঠান রাজ্যে বসিয়ে দিয়ে সুন্ন রাজা ইলাবৃতবর্ষে চলে গেলেন– জগামেলাবৃতং ভোক্তৃং বর্ষং দিব্যলাশন। কী রকম ইলাবৃতবর্ষ? না, যেখানে দেবতাদের উপযুক্ত ভোগ লাভ করা যায়।
আমি পূর্বে বলেছি-ইলাবৃতবর্ষই মোটামুটি স্বর্গরাজ্যের ঠিকানা এবং আরও বলেছি ভারতবর্ষে মনুই হলেন দেবতাদের প্রথম প্রতিভূ। হরিবংশে দেখবেন–মনু লোকান্তরিত হয়ে সুর্যলোক প্রাপ্ত হবার পর তার দশ পুত্র পৃথিবী ভাগ করে নিলেন–দশ তদ্দৎ ক্ষত্রমকরোৎ পৃথিবীমিমা। অথচ প্রথমে মনুপুত্রদের কথা বলতে গিয়ে পৌরাণিক কিন্তু মনুর নটি পুত্রের নাম উল্লেখ করেছেন। তাহলে দশম পুত্রটি কে? আমরা বলব–তিনি ইলা এবং তিনি পুত্র নন। কন্যা। অপিচ তিনিই মনুর প্রথম সন্তান।
