বুধ দূর থেকে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে সেই শিব-বিহার-ভূমির বহিঃপ্রান্তে এসে পৌঁছলেন, যেখানে বিহ্বল-বিভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন ইলা। বুধ অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ইলাকে কয়েকটা কথা বললেন। বললেন এমনভাবে যেন ইলা তার কতকালের বিবাহিতা স্ত্রী। বুধ বললেন–এ কী হল? তুমি হঠাৎ করে বাড়ি ছেড়ে চলে এলে কেন? আমার অগ্নিহোত্রের কাজকর্ম সব ফেলে দিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছ তুমি–অগ্নিহোত্রশুশ্রুষাং ক গতা মন্দিরাৎ মম? একটু বকার মতো করে কথা কয়টি বলেই বুধ কিন্তু সুর পালটালেন। বললেন–আমাদের বিহার-বেলাও যে শেষ হতে চলল সুন্দরী! কেন এমন সময়ে এমন সন্ত্রস্ত হয়ে আছ? এমন একটি সন্ধ্যা কি নষ্ট করা চলে? ঘরে চলো। ঘর-দোর মুছে ফুলের সাজে আমাদের মিলন-গৃহ সুসজ্জিত করো-কৃত্বোপলেনং পুষ্পৈরলঙ্গুরু গৃহং মম।
ইলা বললেন–মহর্ষি! কারণ ব্রাহ্মণের সাজে বুধকে তিনি মহর্ষিই ভেবেছিলেন–ইলা বললেন–মহর্ষি! আমার কিছু মনে নেই। আমি কে, আপনি কে, আমি কোথায় জন্মেছি কিচ্ছুটি মনে নেই আমার। বুধ বললেন–কেন? তোমার নাম তো ইলা। আর আমি তো সেই বুধ, আমার পিতা মহামান্য এক ব্রাহ্মণ–পিতা মে ব্রাহ্মণাধিপঃ। কথাটার মধ্যে খুব একটা মিথ্যাও নেই। কারণ জননী তারা এবং বৃহস্পতির সম্বন্ধে নিজেকে ব্রাহ্মণের পুত্র বলে পরিচয় দিতে কোনও অসুবিধাই ছিল না বুধের।
ইলা বুধের কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে তথাকথিত স্বামীর বাড়িতে গিয়ে উঠলেন এবং থাকতে লাগলেন বিশ্বস্তা বিবাহিতা বধুটির মতোই। অনেক পুরাণই বলেছে–ইলার এই স্ত্রীত্ব ছিল সাময়িক এবং মহাদেবের কাছে তিনি নাকি বর পেয়েছিলেন–একমাস তিনি স্ত্রী হয়ে থাকবেন এবং একমাস থাকবেন পুরুষ হয়ে। পুরুষ অবস্থায় তার নাম হবে সুদম আর স্ত্রী। অবস্থায় তার নাম হবে ইলা। মহাভারতের কবি যে একবারও এই ইলা-সুদ্যুম্নের কথা বলেননি, তা নয়। তবে তিনি অন্য পুরাণকারদের মতো এমন গল্প করে বলেননি। মহাভারতের প্রায় অন্তকালে অনুশাসনপর্বে একেবারে অন্য প্রসঙ্গে একবার বলা আছে–বৈবস্বত মনুর বংশজ হলেন ইলা-সুন্ন-মননশ্চ বংশজ ইলা সুদ্যুম্নশ্চ ভবিষ্যতি। কবির এক-পংক্তির উক্তি থেকেই মোটেই বোঝা যায় না যে, যিনি ইলা তিনি সুদ্যুম্ন।
এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে আমার যা মনে হয় নিবেদন করি। অধিকাংশ পৌরাণিকেরা বলেছেন যে স্ত্রী অবস্থায় ইলার সঙ্গে বুধের মিলনে পুরূরবার জন্ম হয় এবং বুধ যেহেতু চন্দ্রের পুত্র, তাই চন্দ্রের পুত্র-পরম্পরা চালু হয়ে গেল পুরূরবার জন্ম থেকেই। পুরূরবার জন্মের কথা বলেই পৌরাণিকেরা বলেছেন ইলার পুরূষাবস্থায় সুদ্যুম্নের পুত্র হলেন উৎকল এবং গয়–পৌরাণিকেরা যে যাই বলুন, আমাদের ধারণা সুদ্যুম্ন ইলার এক স্বামী এবং অন্য স্বামী হলেন বুধ। আসল কথা বৃহস্পতি এবং চন্দ্র–দুজনেই যদি তারার স্বামী হতে পারেন, তবে সুদুন্ন এবং বুধ–এই দুজনেও ইলার দুই স্বামী হতে পারেন। আমার ধারণা যে মিথ্যা নয়, কিংবা একেবারে অবাস্তব নয় সেটা অন্যান্য পুরাণের প্রমাণ দিয়েই বলি।
বায়ু পুরাণ বলেছে–প্রথম মানব মনুর নিজের সমান গুণের নয়টি পুত্র ছিল–মনোঃ প্রথমজস্যাসন্নব পুত্ৰাস্তু তৎসমাঃ। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই নয় পুত্রের মধ্যে ইক্ষাকুই হলেন জ্যেষ্ঠ এবং এই লিস্টিতে ইল’ বলে কোনও পুত্রের নাম নেই। জ্যেষ্ঠও তিনি নন, রাজাও তিনি নন। বায়ু পুরাণে স্পষ্ট বলা আছে–ইক্ষাকু ইত্যাটি নটি পুত্রের জন্মের পর ব্রহ্মার আদেশে মনু পুত্রকাম হয়ে একটি যজ্ঞ আরম্ভ করেন। সেই যজ্ঞে তিনি মিত্রাবরুণ দেবতার উদ্দেশ্যে আহুতি দিতেই যজ্ঞবেদি থেকে দিব্যাম্বরধরা দিব্যাভরণভূষিতা’ ইড়াদেবীর সৃষ্টি হল। মনু সেই রমণীকে ইলা বলে সম্বোধন করলেন। ইড়া’ নামে বৈদিক-ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্যে একটি শব্দ পাওয়া যাবে। সেই শব্দের সঙ্গে এই ইড়ার কোনও সম্বন্ধ আছে কিনা সে আলোচনায় যাওয়ার কোনও কারণই নেই এই মুহূর্তে। আমার যেটুকু বলার তা হল–মনু ইলা নামে একটি কন্যাই লাভ করেছিলেন, পুত্র নয়।
জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইলা মনুকে বললেন–আমি মিত্রাবরুণের অংশে জন্মেছি, অতএব তার কাছেই আমায় যেতে হবে। অর্থাৎ ইলা নিজেকে মোটেই মনুর কন্যা ভাবছেন না, মিত্রাবরুণের কন্যা হিসাবেই তিনি পরিচিত হতে চান। স্বয়ং মিত্রাবরুণও ইলাকে বলেছেন তুমি আমাদের কন্যা–আবায়োস্ত্বং মহাভাগে খ্যাতিং কন্যা গমিষ্যসি। বায়ু পুরাণ আরও বলেছে–ইলা যখন মিত্রাবরুণের আশীর্বাদ নিয়ে মনুর কাছে ফিরে আসছেন, সেই প্রত্যাবর্তন-কালীন সময়ে মাঝপথে চন্দ্রপুত্র বুধের সঙ্গে তার মিলন হয়–বুধেনান্তরমাসাদ্য মৈথুনায়োপমন্দ্রিতা।
কথাটা বিশ্বাস করতে অসুবিধা নেই কোনও। মিত্রাবরুণ এক যুগল বৈদিক দেবতা। আমি পূর্বেই জানিয়েছি দেবতাদের আকৃতি-প্রকৃতি মানুষের মতোই। যে কোনও কারণেই হোক দেব-পিতার গৃহ থেকে তিনি মনু-পিতার গৃহে ফিরছিলেন। পথে নির্জন অরণ্যভূমিতে– পুরাণারেরা অবৈধ কলঙ্ক এড়ানোর জন্য যে বনকে মহাদেবের বিহারভূমিরূপে কীর্তন করেছেন, সেই বনস্থলীর মধ্যেই বুধের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং কোনও ওজর ছাড়াই সাধারণভাবেই সে মিলন সম্পূর্ণ হয় এবং জন্ম হয় পুরুরবার। বায়ু পুরাণ বলেছে-পুরুরবার জন্ম দিয়েই ইলা পুনরায় সুদ্যুম্নের কাছে ফিরে আসেন-বুধাৎ সা জনয়িত্ব তু সুদ্যুম্নং পুনরাগতা। সংস্কৃতে যাদের সাধারণ জ্ঞান আছে তারা উপরিউক্ত সংস্কৃত পংক্তিটির অর্থ করবেন আমাদের মতো–অর্থাৎ ইলা সুদ্যুম্নের কাছে ফিরে আসেন-সুদ্যুম্নং পুনরাগতা।
