আপাতত জেনে রাখতে হবে যে-মনুর নয় পুত্রের মধ্যে অন্তত চার জন বড় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্তত চারটি বিখ্যাত রাজবংশের মূল হলেন এই চারজন মনুপুত্র। অযযাধ্যায় যে বিখ্যাত ইস্ফাকু-রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং যার অধস্তন হলেন স্বয়ং নরচন্দ্রমা রামচন্দ্র, সেই ইস্ফাকু মনুর এক পুত্র। ইস্ফাকুর অন্যতম এক পুত্র থেকেই বৈদেহ-বংশের প্রতিষ্ঠা এবং এই বংশের অধস্তন হলেন সীতাপতি জনক, অর্থাৎ রামের শ্বশুর। অর্থাৎ বৈদেহ জনকও সূর্যবংশেরই বটে।
মনুর আরেক পুত্র নাভানেদিষ্ঠ। তিনি রাজত্ব করতেন বৈশালীতে। প্রতি এবং সুমতি এই বংশের নামী পুরুষ এবং তারা ছিলেন ইস্ফাকু-বংশজ দশরথের সমসাময়িক। মহারাজ শর্যাতি মনুর আরেক কীর্তিমান পুত্র। সম্ভবত তিনি রাজত্ব করতেন কুশস্থলীতে যা পরবর্তী কালের দ্বারকা বলা যায়। চতুর্থ মনুপুত্র নাভাগও যথেষ্ট বিখ্যাত তবে তিনি ঠিক কোথায় রাজত্ব করতেন বলা মুশকিল। এই বংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ হলেন মহারাজ অম্বরীষ যিনি নানা কারণে কীর্তিশালী হয়েছেন।
লক্ষণীয় বিষয় হল–মনুপুত্রদের প্রত্যেককেই একভাবে সূর্যবংশীয় বলা যায়; কেননা, বৈবস্বত মনুর পিতা হলেন বিবস্বান্-সূর্য। কিন্তু অযযাধ্যার সম্রাট ইক্ষাকু এতটাই বিখ্যাত হয়েছিলেন যে সূর্যবংশের সমস্ত সুনামটুকু যেন তার ওপরেই বর্তেছিল। ফলত একমাত্র ইক্ষাকুর বংশই সূর্যবংশ বলে বিখ্যাত হয়েছে। এবারে সেই মেয়েটির কথায় আসি, যার নাম ইলা এবং যাঁর থেকে চন্দ্রবংশের পরম্পরা।
বেশির ভাগ পুরাণেই দেখা যাবে ইলা মেয়ে ছিলেন না, পুরুষই ছিলেন এবং তার নাম ইলা নয়, তার নাম ইল। একটি পুরাণ তো এমন কথাও বলেছে যে, মনু মহারাজ তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ইলকে রাজপদে অভিষিক্ত করে তপস্যা করার জন্য নন্দন বনে চলে গিয়েছিলেন
অভিষিচ্য মনুঃ পুত্রমিলং জ্যেষ্ঠং চ ধার্মিকঃ।
জগাম তপসে ভূয়ঃ স মহেন্দ্ৰবনালয়।
কিন্তু অন্যান্য পুরাণে ইল নামটি আসার সঙ্গে সঙ্গেই একটি মজার উপাখ্যান। ইল নাকি রাজা হয়েই দিগ্বিজয়ে যাত্রা করেন। পৃথিবীর নানা দেশ জয় করার পথে এক সময় তার অশ্বটি একটি বনে প্রবেশ করে। কোনও পুরাণে এই বনের নাম শরবন, কোথাও বা কুমারবন, আবার কোনও পুরাণে এটি উমাবন। যাই হোক এই বনে মহাদেবের আবাস ছিল এবং এই বনে প্রবেশের ব্যাপারে পূর্বেই একটি নিয়ম চালু হয়েছিল। অবশ্য সেই নিয়মের ব্যাপারেও অন্য একটি গল্প আছে। কথিত আছে-এক সময় সনক সনন্দ প্রমুখ ব্রহ্মবাদী ঋষিগণ মহাদেবের দর্শন লালসায় এই অসাধারণ বনভূমিতে প্রবেশ করেন। সেই সময় দেবদেব শঙ্কর পার্বতীর সঙ্গে ক্রীড়াসক্ত ছিলেন এবং শৈলদুহিতার বসন-ভূষণও কথঞ্চিৎ অসস্তৃত ছিল। এই অবস্থায় ব্রহ্মবাদী ঋষিদের দেখে পার্বতী বড় লজ্জা পেলেন এবং কোনও মতে বস্ত্র সম্বরণ করে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে থাকলেন–লজ্জাবিষ্ট স্থিতা তত্র বেপমানাতিমানিনী।
ব্ৰহ্মবাদী ঋষিরা ব্রহ্মানন্দে মগ্ন। তাদের মনে স্ত্রী-পুরুষের ভেদাভেদ, রমণ-মৈথুন বড় একটা ক্রিয়া করে না। দেবদেব শঙ্করের উদাসীন ক্রীড়াকৌতুক এবং পার্বতীর বিপর্যস্ত অবস্থা দেখামাত্রই ব্ৰহ্মর্ষিরা স্থান ত্যাগ করে নর-নারায়ণ আশ্রমের দিকে রওনা দিয়েছেন। কিন্তু পার্বতাঁকে তখনও সংকুচিত আর অভিমানিনী দেখে ভগবান শিব নিয়ম করে দিলেন–যে পুরুষ এরপর ওই বিহার-বনে ঢুকবে সেই মেয়ে হয়ে যাবে। যারা এই নিয়মের কথা জানত, তারা সকলেই বনভূমির বহিঃসীমা অতিক্রম করত না। কিন্তু দিগ্বিজয়ে ভ্রাম্যমান ঘোড়াটি অথবা তার মালিক ইল রাজা–তাদের কারুরই এই শিবের নিয়ম জানা ছিল না। অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ইল এক সুন্দরী নারীতে পরিণত হলেন, এমনকি তার ঘোড়াটিও ঘোটকীতে পরিণত হল। স্ত্রী স্বরূপে ইলর নাম হল ইলা।
স্ত্রীত্ব প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত শরীরে স্তন-জঘনাদির স্ত্রী লক্ষণগুলিও প্রকাশিত হল। তার গলার স্বর থেকে আরম্ভ করে গতি-স্মিত-কটাক্ষেও এল রমণীয় পরিবর্তন। বনের মধ্যে ভ্রমণ করতে করতে স্ত্রী রূপিণী ইলের মনে একটু উদাসীন ভাবও দেখা গেল। তিনি ভাবলেন–ছিলাম রাজপুরুষ, হলাম এক রমণী। এখন কেই বা আমার বাবা আর কেই বা মা। কার সঙ্গেই বা আমার বিয়ে হবে, কে জানে? হয়তো এইভাবে বিমনা হয়ে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় তিনি সেই শিবের বিহারভূমির বাইরে চলে এলেন। ঠিক এই সময়ে চন্দ্র-পুত্র বুধ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সেই বনের বহিঃপ্রান্তে। ইলাকে তিনি দেখতে পেলেন এবং তার মনোহরণ রূপে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি শুধু উপায় খুঁজতে লাগলেন–কীভাবে এই রমণীকে আত্মসাৎ করা যায়-বুধস্তদাপ্তয়ে যত্নমকবরাং কামপীড়িতঃ।
চন্দ্রপুত্র বুধ ইলাকে লাভ করার আশায় ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ করলেন। ইলাকে তিনি অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ করেছেন এবং বুঝেছেন–এই রমণীর পূর্ব-স্মৃতি যথাযথ নেই। বুধ এও বুঝেছেন–ব্রাহ্মণের বাক্য জনসমাজে মান্যতা লাভ করে, অতএব ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ করে। বেশ নাটকীয়ভাবে যদি ইলাকে প্রার্থনা করা যায়, তবে তার বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বুধ হাতে দণ্ড-কমণ্ডলু ধারণ করে বিশ্বসনীয় ব্রাহ্মণ-উপাধ্যায়ের মতো একখানি পথিও ধরে। রাখলেন নিজের হাতে। কতিপয় ব্রাহ্মণবালক ফুল-জল, সমিৎকাঠ নিয়ে তাকে অনুসরণ করল এবং বুধের ব্রাহ্মণত্ব আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলল।
