অবস্থা বুঝে চন্দ্রের পক্ষপাতী শুক্রাচার্য পর্যন্ত চন্দ্রের পিতা মহর্ষি অত্রির নাম করে বললেন–আজকেই ছেড়ে দাও গুরুপত্নীকে। তোমার পিতারও এই ইচ্ছে জেনো-মুঞ্চ ভার্যাং গুয়োরদ্য পিত্রাহং প্রেষিতস্তব। ব্রহ্মা এবং শুক্রাচার্য–দুজনের কথায় চন্দ্র শেষ পর্যন্ত গুরুপত্নী তারাকে ছেড়ে দিলেন বটে, কিন্তু ততদিনে তারা গর্ভবতী হয়েছেন। তারা বৃহস্পতিকে পছন্দ করেন না, তবু বৃহস্পতি তার অধিমাত্র লাভেই পরম আনন্দে ফিরলেন। দেব, দানব, ব্রহ্মা, শিবও–সবাই যে যার বাড়ি ফিরে গেলেন। সর্বত্র শান্তি ফিরে এল।
এইভাবে বেশ কিছুদিন গেল। গর্ভবতী তারা সযত্নে গর্ভ রক্ষা করলেন, এবং শুভদিনে শুভ নক্ষত্রে এক অসাধারণ পুত্র প্রসব করলেন। পুত্রের আকৃতি-প্রকৃতি চন্দ্রের মতো, জ্যোতিষ এবং সামুদ্রিক শাস্ত্রের সমস্ত সুলক্ষণ সেই পুত্রের সর্বাঙ্গে। বৃহস্পতি পুত্রমুখ দেখে বড় খুশি হলেন। এবং শাস্ত্র-বিধি অনুসারে পুত্রের জাতকর্মাদি ক্রিয়াও সম্পন্ন করলেন-জাতকর্মাদিকং সর্বং প্রহৃষ্টেনান্তরাত্মনা। চন্দ্রের কাছে তারার পুত্র জুন্মের সংবাদ এসে পৌঁছল লোকপরম্পরায়। সব শুনে চন্দ্র লোক পাঠালেন বৃহস্পতির কাছে। সে গিয়ে চন্দ্রের নাম করে বৃহস্পতিকে বলল–এত জাঁকজমক করে যে ছেলের জাতকর্মাদি ক্রিয়া করছ, সে মোটেই তোমার ছেলে নয়। সে আমার ছেলে। বৃহস্পতি জোর দিয়ে বললেন–এ ছেলে চন্দ্রের হতে যাবে কেন, এ আমারই ছেলে। দেখতেও তো হয়েছে আমারই মতো–উবাচ মম পুত্র মে সদৃশো নাত্র সংশয়ঃ।
আবার চন্দ্র আর বৃহস্পতির ঝগড়া-ঝাটি আরম্ভ হল। আবারও যুদ্ধ লাগে আর কি। দেবসমাজে যুদ্ধের স্ট্র্যাটিজি’ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হল, নানা ‘মিটিং’ চলল ঘন-ঘন যুদ্ধাৰ্থমাগতাস্তেষাং সমাজঃ সমজায়ত। প্রজাপতি ব্রহ্মা সব খবর শুনে আবারও এসে উপস্থিত হলেন। যুদ্ধ প্রায় লেগে গেল। প্রজাপতি ব্রহ্ম আগে দেব-দানব সকলকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন। তারপর তারার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন–তুমিই মা সত্যি করে বল তো-পুত্রটি কার? চন্দ্রের না বৃহস্পতির? তুমি সত্যি করে বললেই এই সাংঘাতিক যুদ্ধ আর লাগে না–সত্যং বদ বরারোহে যথা ক্লেশঃ প্রশামতি।
বস্তুত এ প্রশ্ন দেবতারা আগেই করেছিলেন তারাকে। অন্তত মহাভারতের পরিশিষ্ট-রূপী হরিবংশ তাই বলেছে। কিন্তু তারা এই প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি। আমাদের ধারণা–দেবতারা বৃহস্পতির পক্ষ হয়ে পূর্বে চন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই চন্দ্রের অনুরাগিণী তারা হ্যাঁ বা না-কোনও জবাবই দেননি–পৃচ্ছ্যমানা যদা দেবৈৰ্নাহ সা সাধ্বসাধু বা। কিন্তু প্রজাপতি ব্রহ্মা যখন আসন্ন যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি-রক্ষার তাগিদে তারাকৈ ওই একই প্রশ্ন করলেন, তখন আর উত্তর না দিয়ে উপায় থাকল না তারার। ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করলেন-বল মা! এ ছেলে কার–কস্যায়ং তনয়ঃ শুভে? শান্তির দূত পিতামহ ব্রহ্মার সামনে লজ্জায় মাথা নিচু করে তারা বললেন–এ পুত্র চন্দ্রের। বলেই তারা দ্রুত ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়লেন–চন্দ্রস্যেতি শনৈরন্তর্জগাম বরবৰ্ণিনী। বিবাহিত স্বামীর ঘরে বসে অন্য পুরুষের পুত্র গর্ভ ধারণ করেছি–এ কথা বলতে কোন রমণীই বা লজ্জা না পাবে। তারাও তাই কথাটা বলেই লজ্জায় ঘরে ঢুকে পড়লেন তাড়াতাড়ি।
হরিবংশে দেখছি–তারার কথা শোনামাত্রই প্রজাপতি ব্রহ্ম সেই নবজাতকের মস্তক আঘ্রাণ করে তার নাম রেখেছেন বুধ। অন্য মতে তারার কথাটা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চন্দ্র বৃহস্পতির বাড়ি থেকে তাঁর পুত্রটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান এবং তার নাম রাখেন বুধ।
যা দেখা গেল, তাতে চন্দ্রবংশে আরও একটি নক্ষত্রের জন্ম হল। বুধের জন্মলগ্নে চাঁদ, তারা বা বৃহস্পতির–ইত্যাদি নক্ষত্র-তারকার কলঙ্ক যাই থাকুক, এখনও পর্যন্ত এই বংশের জাতকের মধ্যে খুব একটা মানুষ-মানুষ ভাব দেখলাম না। দেখলাম, কেমন যেন একটা দৈবভাব। তবে তা শুধু দেবতাদের ঘটনা বলেই এই দৈবীভাব। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের। আনাগোনায় দেবতা, অতিদেবতা, দেবগুরুর ব্র্যহস্পর্শে ঘটনা যতই গম্ভীর হয়ে উঠুক, তবু কিন্তু এই ঘটনার বিন্যাসে মানুষের জীবনের স্পর্শ আছে। অর্থাৎ মানুষের জীবনেই এরকম ঘটে থাকে, ঘটে এবং ঘটবেও। কিন্তু যেহেতু চন্দ্র, তারা, বুধ, বৃহস্পতি ইত্যাদি শব্দে নক্ষত্রলোকের অভিসন্ধি মেশানো আছে, অতএব মহাভারতের কবি তাদের জীবন-বিস্তারে মন দেননি। নক্ষত্রলোকের প্রতাঁকে ধরা এইসব জীবনের কাহিনী আমাদের শুনতে হয়েছে পুরাণ থেকে, হরিবংশ থেকে।
কিন্তু যে মুহূর্তে কুরু-পাণ্ডবের বংশমূলে মানুষের শব্দ-স্পর্শ যোগ হয়েছে সেই মুহূর্তে মহাভারতে মনুর কথা এসেছে। মনু থেকেই এই মানব-জাতি, মহাভারত যাকে বলেছে–মনোর্বংশে মানবানাং ততো য়ং প্রথিতো’ভবৎ। বস্তুত মহাভারতের আদিপর্বে দুই জায়গায় কুরু-পাণ্ডবের পূর্বতন বংশ-পরস্পরা বর্ণিত আছে। এই দুই জায়গাতেই চন্দ্র, বৃহস্পতি কিংবা তারার কোনও হদিশ নেই। এমনকি বুধেরও জন্মের কোনও খবর ভাল করে পাওয়া যায় না। মহাভারতের এই দুই লিস্টিতেই বৈবস্বত মনু থেকে মানব-জাতির উৎপত্তি। মনুর নয়টি পুত্র এবং একটি কন্যা। এই কন্যাটি সত্যিই কন্যা না পুত্র, তা নিয়ে পৌরাণিকদের মধ্যে বিবাদ আছে এবং সে কথায় আমি পরে আসছি।
