বৃহস্পতিকে যজ্ঞ করানোর প্রস্তাব করার পর সংবর্ত কিন্তু নিজের ক্ষোভটুকু আর চেপে রাখতে পারলেন না। বলে ফেললেন–বৃহস্পতি আমার বড় ভাই হলে কী হয়, তিনি আমার ঘর-সংসার, গৃহস্থধর্ম সব নষ্ট করেছেন। আমার যজমান যাঁরা ছিলেন, তারা আমার দাদার চাপে কেউ আর আমাকে পৌরোহিত্যে বরণ করে না। এমন কি, জানেন–আমার ঘরের ঠাকুর-বিগ্রহগুলি পর্যন্ত আমার দাদা নিয়ে নিয়েছেন। তিনি আমার সব বরবাদ করে শুধু এই শরীরটা মাত্র ছেড়ে দিয়েছেন–পূর্বজেন মক্ষিপ্তং শরীরং বর্জিতং ত্বিদ। সংবর্ত আরও জানালেন–এখন যদি দাদা বৃহস্পতির অনুমতি ছাড়াই আমি আপনার যজ্ঞ করি, তাহলে আর দেখতে হবে না। আপনি মহারাজ আগে তার কাছে যান। মরুত্ত পূর্বের ঘটনা বিবৃত করলেন এবং বৃহস্পতির প্রত্যাখ্যানের খবরও তাকে জানালেন।
বৃহস্পতি এবং সংবর্তের দ্বন্দ্বের শেষ হয়নি। তবে এই উপাখ্যানের পরম্পরায় জানাই সংবর্ত মরুত্ত রাজার যজ্ঞে পৌরোহিত্য করেছিলেন এবং বৃহস্পতির অনিচ্ছা, বিদ্বেষ এবং বাধা সত্ত্বেও তিনি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকে মন্ত্রে বশীভূত করে মরুত্ত রাজার যজ্ঞে সোমপান করতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু আপাতত এই উপাখ্যানের পরম্পরা আমাদের কাছে তত জরুরি নয়। জরুরি শুধু সংবর্তের ক্ষোভটুকু। তিনি বলেছিলেন–আমার বড় ভাই হয়েও তিনি আমার ঘর-সংসার, গার্হস্থ্য ধর্ম ছারখার করে দিয়েছেন, আমার যজমান নষ্ট করেছেন, ঘরের দেবতাও তিনি নিয়ে নিয়েছেন–গার্হস্থ্যঞ্চৈব যাজ্যাশ্চ সর্বা গৃহ্যাশ্চ দেবতাঃ।
আমাদের জিজ্ঞাসা হয়–কী এমন ঘটেছিল, যাতে এই ব্রাহ্মণ ঋষির সোনার সংসার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল? কী এমন ঘটেছিল, যাতে তাকে পরিধেয় বস্ত্র পর্যন্ত ত্যাগ করে বিবাগী হয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিলউন্মত্তবেশং বিভ্রং স চংক্রমীতি যথাসুখম্। ঠিক এই সময়ে আমাদের চন্দ্রের কথা স্মরণ করতে হবে। চন্দ্র ইন্দ্রের দূতকে বলেছিলেন–যান আর কথা বাড়াবেন না। সুন্দরী তারা সেইদিন থেকেই তার স্বামী বৃহস্পতির ওপর বিরক্ত হয়ে গেছেন, যেদিন তিনি দেখেছিলেন-তার ভালবাসার স্বামী তার নিজের কনিষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত- বিরক্তেয়ং তদা জাতা চকমেনুজকামিনীম্।
এই জন্যই কি সংবর্তের ঘর-সংসার গার্হস্থ্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল? যাকে নিয়ে গৃহস্থ-ধর্ম, সেই স্ত্রীই যদি অন্য পুরুষের দ্বারা লঙ্ঘিত হয়ে থাকে তবে তাকে সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বিবাগী হয়েই বেরোতে হবে উন্মত্রে বেশে। চন্দ্র সংবর্তের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে পরিষ্কার বলে দিলেন-সুন্দরী তারাকে আমি ফিরে পাঠাব না। সে তার স্বামীকে ভালবাসে না। সে ভালবাসে আমাকে, আর আমিও তাকে ভালবাসি। তুমি ইন্দ্র আর বৃহস্পতি, দুজনকেই বোলো-যদি ঘর বাঁধতে হয় তো ভালবাসার রমণীটিকে নিয়েই ঘর বাঁধা ভাল, অপছন্দের বউকে নিয়ে ঘর বাঁধা যায় না–গৃহারম্ভন্তু রক্তায়াং বিরক্তায়াং কথং ভবেৎ। যাও তুমি দূত। গিয়ে বলো তোমার ইন্দ্রকে–তার তো অনেক ক্ষমতা, তিনি যা ইচ্ছে করুন। আমি তারাকে ফেরত পাঠাব না–ন দাস্যেহং বরারোহাং গচ্ছ দূত বদ স্বয়ম্।
.
১৯.
বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে বৃহস্পতির কাছে ফিরিয়ে দিলেন না চন্দ্র। ইন্দ্রের দূত ইন্দ্রের কাছে ফিরে গেলেন। দেবসমাজে এই ঘটনা নিয়ে দারুণ হই-হই পড়ে গেল। দেবরাজ ইন্দ্র দেবগুরুর অবমাননায় অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন। তার নিজেরও অপমান কিছু কম হয়নি। তার সনির্বন্ধ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন চন্দ্র। অতএব আর সহ্য করা যায় না। ইন্দ্র দেবগুরু বৃহস্পতির সম্মানে যুদ্ধের উদ্যোগ নিলেন। দেবসৈন্যদের মধ্যে সাজ-সাজ রব পড়ে গেল।
বড় বড় যুদ্ধে যা হয়। কে কোন পক্ষ সমর্থন করবেন, কে কার পক্ষে যোগ দেবেন–এসব সিদ্ধান্ত খুব তাড়াতাড়িই হয়ে গেল। দেবতাদের যুদ্ধোদ্যোগ দেখামাত্র অসুর-গুরু শুক্রাচার্য। চন্দ্রের কাছে এলেন। দেবগুরু বৃহস্পতির সঙ্গে তার চির শত্রুতা। সেই শত্রুতাবশতই যেন ব্যাপারটা অন্যায় হলেও তিনি চন্দ্রের পক্ষ সমর্থন করে তাকে বললেন-বৃহস্পতির বউকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও দরকার নেই তোমার-মা দদস্বেতি তং বাক্যমুবাচ শশিনং প্রতি–আমি তোমাকে সাহায্য করব। দেবদেব শঙ্কর শুক্রাচার্যকে চন্দ্রের পক্ষপাতী দেখে ইন্দ্রের পক্ষে যোগ দিলেন। তিনি তার মস্ত আজগব ধনুক দিয়ে চন্দ্রকে শায়েস্তা করবেন বলে ঠিক করলেন। বৃহস্পতির স্ত্রীর সঙ্গে চন্দ্রের আচরণে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। রুদ্র-শিব যেহেতু এক সময়ে বৃহস্পতির পিতার শিষ্য ছিলেন,–স হি শিষ্যো মহাতেজাঃ পিতৃঃ পূর্বে বৃহস্পতেঃ–অতএব বৃহস্পতিকে সমর্থন করলেন স্বয়ং মহাদেব। দৈত্য-দানবেরা শুক্রাচার্যের নেতৃত্বে চন্দ্রের পক্ষে যোগ দিলেন।
বিশাল যুদ্ধ পাকিয়ে উঠল। মহাদেব ব্রহ্মশির অস্ত্র ছুঁড়ে দৈত্য-দানবদের অনেককে মেরে ফেললেন বটে, তবে চন্দ্রকে তিনি কিছু করতে পারলেন না। চন্দ্র বিষ্ণুর বর-পুষ্ট। অতএব দেবপক্ষেরও ক্ষয়ক্ষতি কিছু কম হল না। অনেক দেবতাও চন্দ্রের হাতে মারা গেলেন এবং বাকি যারা থাকলেন, তত্র শিষ্টান্তু যে দেবাঃ–তারা প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে গিয়ে আর্জি জানালেন–এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য। ব্রহ্মা এসে ইন্দ্র-পক্ষের রুদ্র-শিবকে এবং চন্দ্র-পক্ষের শুক্রাচার্যকে যুদ্ধের প্ররোচনা ছড়াতে নিষেধ করলেন–ততে নিবাৰ্য্যোশনসং রুদ্রং জ্যেষ্ঠঞ্চ শঙ্কর। শুক্রাচার্যকে তিনি ভর্ৎসনা করে বললেন–তোমার কি সঙ্গদোষে এমন অপকর্মে দুর্মতি হল–কিমন্যায়ে মতির্জাতা সঙ্গদোষান্মহামতে। আর চন্দ্রকে বললেন–গুরুর স্ত্রীকে এই মুহূর্তে ছেড়ে দাও, চন্দ্র! নইলে স্বয়ং বিষ্ণুকে ডেকে এনে তোমার সর্বনাশ করে ছাড়ব আমি–নো চেদ বিষ্ণুং সমাহয় করিষ্যামি তু সংক্ষয়ম।
