স বাধ্যমানঃ সততং জাত্রা জ্যেষ্ঠেন ভারত।
অর্থানুসৃজ্য দিবাসা বনবাসমবোয়ৎ।
এর মধ্যে বৃহস্পতির অবস্থার আরও উন্নতি হল। দেবগুরুর পদ পেলেন তিনি। ওদিকে মরু রাজার সঙ্গে স্বর্গের ইন্দ্রের তত ভাব-ভালবাসা ছিল না। ইন্দ্রের সঙ্গে স্পর্ধা করেই তিনি যজ্ঞ আরম্ভ করেছিলেন এবং সেই যজ্ঞের পুরোহিত হবার জন্য তিনি বৃহস্পতিকেই গিয়ে ধরলেন। দেবরাজ মরুত্তের অভিসন্ধি পূর্বাহ্নেই বুঝেছিলেন এবং বৃহস্পতিকে তিনি আগেই সাবধান করে বলে দিয়েছিলেন–দেখুন ব্রাহ্মণ! আমি দেবরাজ আর আপনি হলেন সেই দেবরাজের পুরোহিত। যে হাতে আপনি দেবরাজের যজ্ঞে আহুতি দেন, সেই হাতে যেন কোনও মর্ত্যরাজার যন্ত্রে আহুতি দেবেন না। ইন্দ্র এবার পরিষ্কার জানালেন-দেখুন, রাজা মরুন্তু এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছেন। আপনি যেন কোনওভাবেই তার পৌরোহিত্য করবেন না–বৃহস্পতে মরুত্তস্য মা কার্ষীঃ কথঞ্চন। এবার চরম সাবধানবাণী, হ্যাঁ, আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ, আপনার স্বাধীনতা নিশ্চয়ই আছে–তবে যদি মরুত্তের পৌরোহিত্য করতে হয় করুন; কিন্তু আমাকে বাদ দিতে হবে তাহলে। হয় আপনি মরুত্তকে স্বীকার করুন, নয় আমাকে, যে কোনও একটা–পরিত্যজ্য মরুং বা যথাযোষং ভজস্ব মাম্।
বৃহস্পতি কেমন যেন একটু থমকে গেলেন। একটু চুপ করেও গেলেন। ভেবে দেখলেন নিশ্চয়ই যে, দেবতাদের সামাজিক স্থিতি এবং আভিজাত্য মানুষের থেকে অনেক বড়। দেবতাদের সঙ্গে মিলে-মিশে চললে তারও মর্যাদা অনেক বাড়বে। আরও বুঝলেন যে, ব্রাহ্মণোচিত স্বাধীনতায় আজ যদি ইন্দ্রকে প্রত্যাখ্যান করার হঠকারিতা করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁকে মনুষ্যলোকের এ-রাজা-সে রাজার পৌরোহিত্য কুড়িয়ে দিন কাটাতে হবে। তার থেকে এই চিরকালের বাধা কাজ বৃহস্পতির মর্যাদা এবং সম্পত্তি–দুইই বাড়বে। ইন্দ্রকে তিনি সোজা বলেই দিলেন–আরে! কত অসুর-রাক্ষস বধ করে তুমি এই তিন ভুবনের অধিপতি হয়েছ, সমস্ত লোক তোমার ওপরেই নির্ভর করে আছে, সেই তোমার মতো বড় মানুষের পৌরোহিত্য করে আমি কি আর মানুষের পৌরোহিত্য করতে পারি। তুমি নিশ্চিন্ত থাক দেবরাজ; যে-আমি এর দেবযজ্ঞে আহুতি দেওয়ার সময় ঘিয়ের হাত ধরেছি, সেই আমি কখনও মানুষের যজ্ঞে ঘিয়ের হাত ধরব না
সমাসিহি দেবেন্দ্র নাহং মর্তস্য কহিচিং।
গ্রহীষ্যামি সুবং যজ্ঞে শৃণু চেদং বচো মম।
এদিকে মরুত্ত-রাজা বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করে পুরোহিত-বরণের জন্য বৃহস্পতির কাছে উপস্থিত হলেন। বললেন–আপনাকে আগে যে যজ্ঞের কথা বলেছিলাম, সেই যজ্ঞের আয়োজন সম্পূর্ণ হয়েছে। আপনি আমাদের কুলগুরু। অতএব চলুন, সেই যজ্ঞের পৌরোহিত্য গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করুন। বৃহস্পতি বললেন–আমার পক্ষে এই পৌরোহিত্য করা সম্ভব নয় রাজা। দেবরাজ ইন্দ্র আমাকে পৌরোহিত্যে বরণ করেছেন। আমিও তার প্রার্থনা স্বীকার করেছি। কাজেই এ কাজ সম্ভব নয়।
পদবিতে উঠলে যা হয়। এখনকার দিনের বড় মানুষের মুখে যেমন শুনি–সম্ভব নয়, আমার সময়-টময় নেই, তাছাড়া ওই সময়টায় সি এম-এর একটা প্রোজেক্ট প্ল্যান আমাকে দিতে হবে-বৃহস্পতির অবস্থাও একই রকম। মরুত্ত রাজা কত করে বললেন-সে কি ঠাকুর? আমি আপনার কতকালের যজমান। সেই বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে আপনি আমাদের ক্রিয়া-কর্ম সবই করছেন। আমাকে অস্বীকার করলে চলে কী করে? বৃহস্পতি বড় মানুষের। মতোই বলে দিলেন–সম্ভব নয়। মরণহীন দেবতাদের যাজন করে দিন কাটছে আমার। আমি কীভাবে তোমার মতো মরণশীল মানুষের যাজন করি–অমর্ত্যং যাজয়িত্বাহং যাজয়িয্যে কথং নরম্?
মরুত্ত ফিরে এলেন। পথে বিপত্তারণ নারদের সঙ্গে দেখা। রাজা সব ঘটনা তাকে আনুপূর্বিক জানালেন। নারদ বৃহস্পতিকেও চেনেন, তার ছোট ভাই সংবর্তকেও চেনেন। কলহের মনস্তত্ত্ব ডাল জানা থাকায় নারদ এও বুঝতে পারলেন যে একমাত্র সংবর্তকে পৌরোহিত্যে বরণ করলেই বৃহস্পতি যেমন জব্দ হবেন তেমনই তার রাগ হবে। নারদ বললেন–মহারাজ আপনার চিন্তার কোনও কারণই নেই। আপনি সোজা চলে যান মহর্ষি অঙ্গিরারই অন্য পুত্র সংবর্তের কাছে। তিনি বৃহস্পতির ছোট ভাই। তিনিই আপনার যজ্ঞ-কর্ম সম্পন্ন করবেন। নারদ সংবর্তের ঠিকানাও দিলেন মরুত্ত-রাজাকে। রাজা কাশীতে গিয়ে সংবর্তের দেখা পেলেন এবং যথাবিধি তাকে যজ্ঞের আমন্ত্রণও জানালেন।
সংবর্ত এই বিশাল যজ্ঞ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। বৃহস্পতির উৎপীড়নে তিনি ঘর-বাড়ি ছেড়ে দিগম্বর হয়ে কাশীতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। রাজার কাছে তিনি তার অক্ষমতার কথা লুকোলেন না। বললেন-দেখুন রাজা! মানসিক-শারীরিক নানা জ্বালা-যন্ত্রণায় আমার বায়ুরোগ ধরে গেছে, আর আমি চলি-ফিরিও নিজের ইচ্ছামতো-বাতপ্রধানেন ময়া স্বচিত্তবশবর্তিনা-স্বভাবটাও আমার বিকারগ্রস্ত। এ অবস্থায় আপনি আমায় যজ্ঞ সম্পাদনের। ভার দিয়ে ঠিক কাজ করছেন না বোধহয়। সংবর্ত এবার রাজাকে এড়ানোর জন্য তাকে বৃহস্পতির ঠিকানা দিয়ে বললেন–আমার দাদা হলেন বৃহস্পতি। এ সমস্ত বড় বড় যজ্ঞ তিনিই খুব ভাল করে করতে পারবেন। তাছাড়া তিনি স্বয়ং দেবরাজের পুরোহিত। তাকে দিয়ে। আপনার কাজ হবে ভাল–বর্ততে যাজনে চৈব তেন কর্মাণি কারয়।
