বলতে পারেন–এও কি কোনও গণতান্ত্রিক বিচার হল? নাকি এটার মধ্যে বিচারব্যবস্থার কোনও সমদৃষ্টি লক্ষিত হল? আমি বলব–যে গণতান্ত্রিকতায় আমার বুদ্ধি এবং সুনীতিবাবুর বুদ্ধিকে এক মাত্রায় ফেলে বিচার করা হবে অথবা যে বিচারব্যবস্থায় আমাকে এবং জ্যোতি বসু-নরসিমা রাও-এর শক্তিকে সমদৃষ্টিতে দেখা হবে–সেই গণতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়াই ভাল, তাতে সমাজের বিপদ বাড়বে। বিদ্যা-বুদ্ধি, শক্তি, নিপুণতা তাতে ধুলোয় মিশে যাবে। মনে রাখতে হবে–মানুষের চারিত্রিক এবং ইন্দ্রিয়জ ক্রটিগুলি একান্তই মনুষ্যোচিত। তার জন্য জন-সমাজে একজন বিরাট পুরুষের অবদান তুচ্ছ হয়ে যায় না। আদালতের ন্যায়াধীশও সেই বিচারটা মাথায় রাখতে পারেন বলেই তিনি ন্যায়াধীশ। বিচার-ব্যবস্থা আমার-আপনার হাতে থাকলে উত্তম-অধমের তুল্যমূল্যতা হত এবং ঠিক সেই কারণেই আমি-আপনি বিচারপতি হবার উপযুক্ত নই।
আমি যে বেশ বড়সড়ো একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেললাম তার কারণ একটাই, বৃহস্পতি কিংবা চন্দ্রকে আমরা যেন আমাদের সাধারণ বিচার-বুদ্ধিতে পরিমাপ না করি। তাছাড়া সমাজের বিধি-ব্যবস্থা তখন কেবল নতুন তৈরি হচ্ছে। ইন্দ্রিয়ের শিথিলতাকে মানুষ তখন কেবল সংযমের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে আরম্ভ করেছে। ফলত আমাদের আধুনিক পরিশীলিত বুদ্ধি দিয়ে যদি মহাভারতীয় চরিত্রগুলির বিচার করতে আরম্ভ করি, তাহলে সেটা সমীচীন তত হবেই না, বরং অন্যায় হবে।
মহাভারতে দেখবেন–দেবগুরু বৃহস্পতি চিত্রশিখণ্ডী’র শিষ্য। সৃষ্টির প্রথম কল্পে ব্রহ্মা যে মানস-পুত্রদের জন্ম দেন তাদের মধ্যে মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু এবং বশিষ্ঠ–এই সপ্তর্ষি চিত্রশিখণ্ডী’ নামে বিখ্যাত। এঁদের মধ্যে চন্দ্র অত্রির পুত্র। বৃহস্পতি আঙ্গিরার পুত্র। সমাজের ন্যায়-নীতি এবং রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন প্রথম তৈরি করেন ওই চিত্রশিখণ্ডী নামে পরিচিত সাতজন ঋষিই–আস্যৈঃ সপ্তভিরুগীর্ণং লোকধর্মমনুত্তমম্। এই সাত মুনির নিয়ম-কানুন এবং মনু মহারাজের ধর্মশাস্ত্র–যাঁরা প্রথম অধিগত করেন তারা হলেন বৃহস্পতি এবং শুক্রাচার্য। এক্ষেত্রে বৃহস্পতি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়সমাজে বৃহস্পতির মাধ্যমেই রাষ্ট্র এবং লোকধর্মের নীতিগুলি প্রথম প্রচারিত হয়–বৃহস্পতিসকাশাদ বৈ প্রান্সতে দ্বিজসত্তমাঃ। বৃহস্পতি তার সমস্ত বিদ্যা শিক্ষা চেদি বংশের রাজা উপরিচর বসুকে দান করেন, কিন্তু সে কথা পরে।
আমার বক্তব্য–বৃহস্পতি খুব কম লোক ছিলেন না। সমস্ত দেব সমাজের গুরু তো বটেই। এত বড় মর্যাদার জন্যই হোক, অথবা অন্য কোনও কারণে বৃহস্পতির চারিত্রিক শিথিলতা কিছু ছিল। তবে চন্দ্র যেমন বললেন–বৃহস্পতি তার কনিষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রীর প্রতি আসক্ত ছিলেন, সেটা মহাভারতে তেমন করে পাই না। বরং উলটো কথা পাই যে, তিনি কোনও এক সময় তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা উতথ্যের (কোনও মতে উশিজ) পত্নী মমতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে শারীরিক সংসর্গেও লিপ্ত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনার গতির ওপর বৃহস্পতির নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তিনি যেভাবে যা চেয়েছিলেন, ঘটনা সেভাবে ঘটেনি। বৃহস্পতির সেই চরিত্র-স্থলনের ফল ঋষি ভরদ্বাজ, এবং এর কথাও পরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে আমাদের কাছে।
কনিষ্ঠের স্ত্রীর সঙ্গে প্রণয়াসক্ত হওয়ার যে অবক্ষেপ আমরা চন্দ্রের মুখে শুনেছি, সে ব্যাপারে মহাভারত স্পষ্টভাবে কিছু না বললেও, কনিষ্ঠের সঙ্গে বৃহস্পতির সদ্ভাব ছিল না। মোটেই। বৃহস্পতির ছোট ভাই হলেন সংবর্ত। তিনিও ব্রাহ্মণ-প্রবর ঋষি ছিলেন, কিন্তু বৃহস্পতির সঙ্গে তার দুঃসম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তার পক্ষে বাড়িতে থাকাই সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, রাগে অভিমানে তিনি একদিন পরনের জামা-কাপড় পর্যন্ত খুলে রেখে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। ঘটনাটা ঠিক কী হয়েছিল, আমরা তা খানিকটা আন্দাজ করতে পারি।
একটি সম্পন্ন পরিবারে প্রায় সকলেই বিদ্যা-বলশালী হলেও যদি তাদের মধ্যে কেউ চরম সম্মানের পদবী লাভ করেন, তাহলে তার ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তির সঙ্গে সঙ্গে মেজাজও কিছু চড়া হয়। বৃহস্পতিকে দেবতারা তাদের গুরু হিসেবে বরণ করে নেওয়ার পর, আমাদের ধারণা–তার মধ্যেও এক ধরনের স্ফীতবোধ কাজ করছিল। কারণ, ইন্দ্র অসুরদের হারিয়ে দেওয়ার পর নিজে বৃহস্পতিকে পৌরোহিত্যে বরণ করেছেন–ইন্দ্ৰত্বং প্রাপ্য লোকেষু ততো বব্রে বৃহস্পতিম্।
মহাভারতে দেখছি–কুরু-পাণ্ডবদের পূর্বপুরুষ মরুত্ত রাজা একবার এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে কথা আরম্ভ হয়েছে বৃহস্পতি আর সংবর্তকে নিয়েই। দুজনেই মহর্ষি অঙ্গিরার পুত্র, তেজে-তপস্যায় দুজনেই পিতার তুল্য–পিতুস্তুল্যৌ বভূবতুঃ। দুজনের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আধুনিক পরিবারের দুরবস্থার মতোই তাদের ভাতের হাঁড়ি আলাদা হল–তাবতি স্পর্ধিনৌ রাজন্ পৃথগাস্তাং পরস্পর। কিন্তু হাঁড়ি আলাদা হলেই সব সময় পারিবারিক শান্তি সর্বাংশে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বৃহস্পতির তখন বাড়-বাড়ন্ত হচ্ছে। পৃথগান্ন হয়েও তিনি ছোটভাই সংবর্তকে যথেষ্ট অত্যাচার উৎপীড়ন করতে থাকলেন। মানসিক অত্যাচার শেষ বিন্দুতে পৌঁছোলে সংবর্ত পৈত্রিক এবং নিজের ধন-সম্পত্তি সব ছেড়ে-ছুঁড়ে–আমাদের মতো এক কাপড়েও নয়–একেবারে উলঙ্গ হয়ে বনে চলে গেলেন
