এতে কোনও সন্দেহই নেই যে, বৃহস্পতির নীতি-নিয়মগুলি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী অর্থাৎ কৌটিল্যের আবির্ভাবের আগেই যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। মহাভারতীয় চরিত্রগুলির মধ্যে যাঁরা জ্ঞানী-গুণী এবং পণ্ডিত বলে পরিচিত, তারা বৃহস্পতির রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেমন জানতেন, ঠিক তেমনই জানতেন শুক্রনীতি। আসল কথা, বৃহস্পতির শাস্ত্রের সঙ্গে শুক্রাচার্যের নীতি নিয়মের পার্থক্য ছিল। ভাল পড়ুয়ারা দুটোই জেনে ক্ষেত্রবিশেষে নিজের মত ব্যক্ত করতেন। মহাভারতে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন পিতামহ ভীষ্ম। তিনি বৃহস্পতি এবং শুক্র–দুজনের লেখা অর্থশাস্ত্রই খুব ভালভাবে রপ্ত করেছিলেন।
কিন্তু অনেকেই আবার এমন ছিলেন, যারা রাষ্ট্রের মঙ্গল বিধানে বৃহস্পতি অথবা শুক্র–একজনের মত বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতেন। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখব–পাঞ্চাল-যুবরাজ ধৃষ্টদ্যুম্নকে যখন বৃহস্পতি-নীতির পাঠ দিতেন অধ্যাপক, তখন সেই পাঠ শুনে-শুনেই বৃহস্পতির শাস্ত্র অধিগত করেছিলেন পাণ্ডব-ঘরণী দ্রৌপদী। রাষ্ট্র-বিষয়ক সেই সব চিন্তা সমস্ত জীবনে দ্রৌপদীর কত যে কাজে লেগেছে, সে সব আমরা পরে দেখব। এখন দেখতে হবে-বৃহস্পতি নিজে বই লিখে নিজের কী ক্ষতি করেছেন? কারণ, চন্দ্র বলেছেন–পরকে উপদেশ দেওয়ার সময় সবাই খুব দড়, কিন্তু নিজের বেলায় সে উপদেশ খাটে না মোটেই। অতএব সামান্য হলেও আমাদের জানতে হবে–কী সেই উপদেশ, যা পরকে দেওয়ার সময় বৃহস্পতির সমস্যা হয়নি, এবং যা কার্যক্ষেত্রে তার সমস্যা বাড়িয়েছে।
বস্তুত, রাষ্ট্র এবং সামাজিক নীতি নির্ধারণে বৃহস্পতির নির্দেশ খুব অল্প নয়। যুদ্ধের উদ্যোগ করা উচিত কিনা, অথবা যুদ্ধ আরম্ভ হলে কীভাবে কোন ব্যুহ অনুসারে সৈন্য সাজিয়ে রাজা যুদ্ধ করবেন–এইসব কূটনৈতিক বিষয়ে যেমন বৃহস্পতির সুস্পষ্ট মত আছে, তেমনই সামাজিক তর্কযুক্তির ক্ষেত্রেও বৃহস্পতির বহুত্তর বক্তব্য আছে এবং সেই বক্তব্যগুলিই এই মুহূর্তে চন্দ্রের অনুকূলে এসেছে।
স্বর্গের মতো একটা রাজ্যে, দেবতাদের মতো ভোগী সমাজে শুরু হয়ে বসার ফলে মেয়েদের ব্যাপারে বৃহস্পতির অভিজ্ঞতা কিছু কম ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তার নীতিশাস্ত্রে বিধান দিয়েছিলেন যে, কোনও রমণী যদি স্বেচ্ছায় পুরুষের সম্ভোগবাসনায় সম্মতি দেয়, তবে তাকে ভোগ করায় পুরুষের তত দোষ লাগে না। চন্দ্র বললেন–আমি তো তাই করছি। গুরুর পত্নী স্বয়ং আমার আসঙ্গ-লিপ্সা করছেন, আমি তার বাসনা পূরণ করছি তারই সম্মতিক্রমে। তবে এই নিয়ে দেবতাদের সঙ্গে আমার বিরোধের কোনও কারণই ঘটতে পারে না–কো বিরোধোত্র দেবেশ কাময়ানাং ভজ স্ক্রিয়। তারা বৃহস্পতির ধর্মপত্নী হতে পারেন, কিন্তু তিনি ভালবাসেন আমাকে, বৃহস্পতিকে তিনি ভালবাসেন না একটুও। তো বৃহস্পতি নিজের লেখা ধর্ম-নীতি অনুসারে কী করে এই অনুরক্তা রমণীটিকে আমি জেনে-বুঝে তার কাছে যেতে দিই–অনুরক্তা কথং ত্যাজ্য ধর্মতো ন্যায়তস্তথা।
ইন্দ্রের দূত কথাপ্রসঙ্গে একসময় একটু যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়েছিল। চন্দ্র সেকথা ছাড়েননি। নিজের দাপট দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন–যান, যান। বড় বড় কথা না বলাই ভাল। নিজের স্ত্রী, পরের স্ত্রী–এত উপদেশের কিছু দরকার নেই। আমার ক্ষমতা আছে আমি ভোগ করছি। যার ক্ষমতা আছে, সব কিছুই তার নিজের স্বকীয়ং বলিনাং সর্বং দুর্বলানাং ন কিঞ্চন–দুর্বল লোকের কিছুই নিজের নয়। চন্দ্র এবার দেবগুরুর উদ্দেশে বড় কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন এবং সে কথাটার মধ্যে বৃহস্পতির নিজস্ব ব্যর্থতার কথাও বড় প্রকট হয়ে উঠল। চন্দ্র বললেন–অনুরাগিণী স্ত্রীর সঙ্গেই লোকে ঘর বাঁধে, নতুন জীবন শুরু করে। কিন্তু স্ত্রী যদি একজনকে ভালই না বাসতে পারেন, তার সঙ্গে তবে থাকবেন কী করে? তারা বৃহস্পতির ঘরে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু যেদিন তিনি দেখলেন যে তার স্বামী তাকে ছেড়ে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রীর সঙ্গে শৃঙ্গার-রমণে মত্ত হচ্ছেন, সেদিন থেকেই সুন্দরী তারা আর বৃহস্পতিকে ভালবাসেন না। তিনি বিরক্ত হয়ে গেছেন বৃহস্পতির ওপর–বিরক্তেয়ং তদা জাতা চকমেনুজকামিনীম্। অতএব যাও দূত! তারাকে আমি ফেরত দেব না। ইন্দ্রর যা ইচ্ছে হয় করতে পারেন।
এই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ল। অবধারিতভাবে প্রশ্ন আসে-বৃহস্পতির অনুজ ভ্রাতাটি কে? তার সঙ্গে বৃহস্পতির সম্পর্কই বা কী? এই কথাগুলো অল্প হলেও বলতে হবে আমায়। যদিও মনে ভয় আছে–আপনারা ভাবতে পারেন–মহাভারতের কথারম্ভেই এসব। কী আরম্ভ হল? এর বউ পালাচ্ছে। তার বউ কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রেমলিন্দু। এসব কী হচ্ছে? সবিনয়ে জানাই–এগুলি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। কেন না প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে-বৃহস্পতি কিংবা চন্দ্র-এঁরা প্রত্যেকেই বিশাল ব্যক্তিত্ব। আমি একথা বলছি না যে, বিশাল ব্যক্তিত্ব মানেই সাত খুন মাপ। কিন্তু উলটো দিকে ভাবতে হবে–বিশাল ব্যক্তিত্ব হলে কিছু খুন তো মাপ হয় বটেই।
মনু রাজধর্মাধ্যায়ে বলেছিলেন-অন্যায়কারী ব্যক্তির শক্তি এবং বিদ্যা ভালমতো বিচার করে যতটুকু শাস্তি তার প্রাপ্য রাজা সেইটুকু দণ্ডই দেবেন-তং দেশকালৌ শক্তিঞ্চ বিদ্যাঞ্চাবেক্ষ্য তত্ত্বতঃ। আজ যদি মহামান্য সুনীতি চ্যাটার্জি এবং আমি চুরির দায়ে ধরা পড়ি, তাহলে একই অভিযোগে আমার যা শাস্তি হবার কথা সুনীতিবাবুরও তাই হবার কথা। কিন্তু শাস্তি দেবার সময় সুনীতিবাবুর মহতী বিদ্যাবত্তা তথা সাংস্কৃতিক জগতে তার মহান অবদানের কথা বিচার করে আদালত তাকে আমার চাইতে কম শাস্তি দেবেন, অথবা শাস্তি নাও দিতে পারেন। শুধু মৃদু তিরস্কার করেও ছেড়ে দিতে পারেন। একইভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মমতা ব্যানাজী বা মনমোহন সিং যদি আমার সঙ্গে একই অপরাধে অভিযুক্ত হন, তবে তাদের যা। শাস্তি হওয়া উচিত, আমারও তাই হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখবেন, একই শাস্তি হচ্ছে না। তার কারণ, এতদিন তারা যে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাদের পিছনে যে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন আছে, সেটা আদালতের বিচার-চর্যার মধ্যে আসবে এবং স্বভাবতই তখন তার শাস্তি আমার তুলনায় অনেক হালকা হয়ে যাবে। ইচ্ছা করলে কিছুদিন পূর্বেই অযযাধ্যাকাণ্ডের মামলায় বি জে পি নেতা কল্যাণ সিংহের সামান্য শাস্তির কথা স্মরণ করতে পারেন।
