চন্দ্র বেরিয়ে এলেন হাসিমুখে। বিজয়ীর হাসি। পরের বউ স্বেচ্ছায় তার বাড়িতে এসে রয়েছে। বাড়ি যাচ্ছে না। তাই বিজয়ীর হাসি হেসে চন্দ্র বাড়ির বাইরে এসে বললেন–মেলা বকছেন কেন, ঠাকুর-কিমিদং বহু ভাষসে? যে অসামান্যা রূপসীটিকে আপনি বউ-বউ’ বলে স্বাধিকার ব্যক্ত করছেন, সে অন্তত আপনার উপযুক্ত নয়। আপনার যদি একান্তই স্ত্রীলাভের এত ইচ্ছা থাকে, তবে নিজের মতো চেহারার একটি খেদি-পেঁচি জোগাড় করে আনুন না, কে আটকাচ্ছে–কুরূপাঞ্চ স্বসদৃশীং গৃহাণান্যাং স্ত্রিয়ং দ্বিজ। টাকা নেই, পয়সা নেই, বউকে ভাল করে আরামে রাখার মুরোদ নেই; আপনার মতো ভিখারির ঘরে কি আর এত সুন্দরী একটি রমণীর মন টেকেভিক্ষুকস্য গৃহে যোগ্যা নেদৃশী বরবর্ণিনী। মেয়েরা নিজের সমান যোগ্য পুরুষকেই পছন্দ করে–এই সরল সত্যটা সম্বন্ধে যদি আপনার একটুও বোধ থাকত তা হলেও হত। চন্দ্র এবার শেষ এবং চরম কথাটা শুনিয়ে দিলেন। বললেন–আপনি এখন যেতে পারেন, গুরুঠাকুর! তারাকে আমি ফিরিয়ে দেব না। আপনার যা ইচ্ছে এবং যা পারেন করুন–যচ্ছক্যং কুরু তৎ কামং ন দেয়া বরবৰ্ণিনী।
দেবগুরু বৃহস্পতি মহা বিপদে পড়লেন। শাপ দিয়ে ভস্ম করে দেবেন তারও উপায় নেই কোনও। অভিশাপ মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়েই আসছিল–কিন্তু চন্দ্র সে অভিশাপের ভয় পাচ্ছেন না একটুও। একে তো তিনি পূর্ব তপস্যার বলে বলীয়ান; দ্বিতীয়ত বৃহস্পতির স্ত্রী স্বয়ং তার অনুরক্তা। এই অবস্থায় বৃহস্পতি বারংবার তার স্ত্রীর অধিকার চাওয়ায় চন্দ্র তাকে শুনিয়ে দিয়েছেন–আপনি নিজেই কামার্ত গুরুদেব নইলে পালিয়ে যাওয়া একটি স্ত্রীলোকের জন্য কেউ আপনার মতো এরকম করে না, কামাৰ্ত্তস্য চ তে শাপো ন মাং বাধিতুমহসি-অতএব আপনার শাপে আমার কিছুই হবে না
বৃহস্পতি কোনও শাপ উচ্চারণ করতে পারলেন না। তার নিজের স্ত্রী তার সঙ্গে বঞ্চনা করেছে, চন্দ্রকে অভিশাপ দিয়ে কী লাভ হবে তার। রাগে কাঁপতে কাঁপতে এবার তিনি আর নিজের বাড়ি ফিরে এলেন না। সোজা উপস্থিত হলেন ইন্দ্রালয়ে, ইন্দ্রের কাছে। ইন্দ্রের কাছে নালিশ জানিয়ে বৃহস্পতি বললেন–আমার সুন্দরী স্ত্রীটিকে চন্দ্র হরণ করেছে। বারবার তাকে বলছি, কিন্তু সে আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না। তুমি আমাকে একটু সাহায্য করবে এ ব্যাপারে?
ইন্দ্র দেবতাদের রাজার মতোই বৃহস্পতিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন–আমি অবশ্যই আপনার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনব আপনার কাছে। দরকার হলে যুদ্ধ করব। ইন্দ্র প্রথমে একটি দূত পাঠালেন চন্দ্রের কাছে। দূত গিয়ে প্রথমে ইন্দ্রের সদুপদেশ অনেক শোনাল-পরের স্ত্রী, বিশেষত গুরুপত্নীকে কি তোমার মতো নীতিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের ভোগ করা শোভা পায়? তাছাড়া ঘরে কি তোমার ভোগ্যা স্ত্রীর অভাব আছে? দক্ষের কন্যারা সকলেই তোমার স্ত্রী। এত নক্ষত্র-সুন্দরী থাকতে তোমার আবার গুরুপত্নীকে সম্ভোগ করার ইচ্ছে হল কেন–গুরুপত্নীং কথং ভোণ্ডুং ত্বমিচ্ছসি সুধানিধে?
ইন্দ্র দূতের মুখে এইটুকু জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। সুধাকর চন্দ্রের তৃপ্তির জন্য তিনি আরও কিছু ভাবনা-চিন্তাও করেছেন। দূতমুখে ইন্দ্র জানালেন–বেশ তো, তোমার নক্ষত্র-সুন্দরীদের যদি একান্তই ভাল না লাগে, তবে মনোহর এই স্বর্গভূমিতে সম্ভোগ-তৃপ্তির ব্যবস্থা কি কিছু কম আছে? অপ্সরা সুন্দরী মেনকা আছেন, রম্ভা আছেন, উর্বশী আছেন। তুমি ভোগ করো। কে না করেছে? গুরুপত্নী তারাকে তুমি ছেড়ে দাও বাপু-ভূঙ তাঃ স্বেচ্ছয়া কামং মুঞ্চ পত্নীং গুয়োরপি। তাছাড়া এই নিয়ে দেবতাদের মধ্যে অকারণ একটা ঝগড়াঝাটি পাকিয়ে উঠবে, সেটাও তত বাঞ্ছনীয় নয়। ইন্দ্র বোধহয় সামান্য যুদ্ধের ইঙ্গিত করলেন।
চন্দ্র অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে দূতের মুখে ইন্ত্রের কথা শুনলেন। এবার তার জবাব দেবার পালা। চন্দ্রের জবাবের মধ্যে শুরুর প্রতি ভক্তি বিশেষ প্রকাশ পেল না; কেঁচো খুঁড়তে সাপের মতো দেবগুরুর ব্যক্তিগত পূর্ব জীবনের এমন কতগুলি ঘটনা চন্দ্রের মুখে উচ্চারিত হল, যা ইন্দ্রদুতের কাছে তো বটেই, বৃহস্পতির কাছেও বড় কতিমধুর ছিল না। আসলে বৃহস্পতি নিজের জালে নিজেই ধরা পড়েছিলেন, অথবা বলা উচিত নিজের কপাল নিজেই পুড়িয়েছিলেন। কেমন করে তা বলি?
.
১৮.
ইন্দ্রের দূতকে শুনিয়ে স্বয়ং ইন্দ্রের উদ্দেশেই কথাটা বললেন চন্দ্র। চন্দ্র বললেন–যেমন দেবতাদের রাজা ইন্দ্র ঠাকুরটি, ঠিক তেমনই তার গুরুদেব এই বৃহস্পতি ঠাকুর। দুজনের বুদ্ধিই ঠিক এক রকম–পুরোধাপি চ তে তাক্ যুবয়োঃ সদৃশী মতিঃ। আরে, পরকে উপদেশ দেওয়ার সময় সবাই মস্ত বড় পণ্ডিত, কিন্তু কাজের বেলায় পণ্ডিতেরা নিজের উপদেশ নিজেই খেয়াল করতে পারেন না–পরাপদেশে কুশলা ভবন্তি বহুবো জনাঃ। এই যে বাক্যবাগীশ বৃহস্পতি, তোমাদের গুরু-ঠাকুর। তিনি না মানব-জাতির হিতের জন্য বিরাট শাস্ত্র লিখে ফেলেছেন! তো তার শাস্ত্রের বচন এখন কেমন লাগছে?
মনে রাখা দরকার সেকালের দিনে শুরু হয়ে বসাটা অত সহজ কাজ ছিল না। শুধু ব্রাহ্মণ্য নয়; বিদ্যা, শিক্ষা এবং তপস্যা–সব দিক দিয়েই শুরুদেবদের যথেষ্ট এলেম থাকার দরকার ছিল। বিশেষত যারা সম্পূর্ণ একটি সমাজের গুরু হতেন, অথবা বড় বড় রাজবংশের শুরু হতেন, তাদের রাজনীতির বোধও ছিল অতি উচ্চ মার্গের। বৃহস্পতি সমস্ত দেব-সমাজের গুরু। রাষ্ট্রনীতি এবং সমাজনীতি নিয়ে তিনি যে রীতিমতো পাণ্ডিত্যপূর্ণ একখানি গ্রন্থ লিখে ফেলেছিলেন–সে প্রমাণ মহাভারতের মধ্যে বারংবার আছে। সেকালের দিনে রাষ্ট্রনীতি এবং সমাজনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলি অর্থশাস্ত্রের অন্তর্গত ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র খুললেই সেটা বোঝা যায়। স্বয়ং কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রের মধ্যে দেব-সমাজের নীতিনির্ধারক বৃহস্পতি এবং অসুর-সমাজের নীতিকার শুক্রাচার্যের নানা মন্তব্য উদ্ধার করেছেন রাষ্ট্র এবং সমাজ-নীতির বিষয়গুলি পরিষ্কার করার জন্য।
