বৃহস্পতির পত্নী বাড়ি ফেরার নামও করলেন না। উদ্যান-বিলাসের দিন শেষ হলে চন্দ্র তারাকে একেবারে নিজের বাড়িতে নিয়ে তুললেন। সুন্দরী তারার সাহচর্য-সুখ এমনই যে চন্দ্রের তৃপ্তি কখনও শান্তির পর্যায়ে আসে না-বিধুগৃহীত্বা স্বগৃহং ততোপিন তৃপ্তিরাসীচ্চ গৃহেপি তস্য।
অন্য একটি পুরাণে দেখা যায়–চন্দ্রের বিলাসোদ্যানে তারার সঙ্গে তার দেখা হয়নি। এখানে বৃহস্পতি স্বয়ং নিজের কপাল নিজে পুড়িয়েছিলেন। বৃহস্পতি দেবগুরু, ফলে দেবতারা সকলেই তার যজমান। চন্দ্রও তাই। কোনও কারণে সেদিন বৃহস্পতির স্ত্রী তারা যজমান শিষ্যের বাড়িতে এসেছিলেন–গতৈকদা বিধোধাম যজমানস্য ভামিনী। সেই প্রথম চারিচক্ষুর মিলন হল এবং দুজনেই দুজনকে দেখে রবিষ্ট হলেন। তারা আর শিষ্যবাড়ি থেকে ফিরে যাননি। চন্দ্রও তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও উদ্যোগ করেননি। এদিকে নিজের বাড়িতে বসে দিনরাত তারার চিন্তায় বৃহস্পতির দিন কাটতে লাগল। তিনি কিছু বলতেও পারছেন না, কিছু করতেও পারছেন না। ভাবলেন–বামুন-ঘরের বউ, কিছুদিন গেলেই সুমতি হবে, তারা ফিরে আসবেন। কিন্তু বৃহস্পতির গণনা মিথ্যা হল, তারা ফিরলেন না।
অনেক দিন চলে গেল। বৃহস্পতি এবার এক শিষ্যকে চন্দ্রের বাড়িতে পাঠালেন তারাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তারা ফিরলেন না, চন্দ্রও তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার নামও করলেন না। একবার নয়, বৃহস্পতির শিষ্য বারবার গেলেন চন্দ্রের বাড়িতে বার্তাবহ হয়ে। বারবার বিফলতায় ক্রুদ্ধ হয়ে বৃহস্পতি নিজেই এবার উপস্থিত হলেন শিষ্যবাড়িতে। চন্দ্রের বাড়িতে। হুংকার দিয়ে চন্দ্রের উদ্দেশে বললেন–ব্যাপারটা কী হচ্ছে? আমার সুন্দরী স্ত্রীটিকে তুমি নিজের ঘরে আটকে রেখেছ? তুমি কি জান না–আমি দেবগুরু, আর তুমি আমার শিষ্য, যজমান?
প্রথমে একটু ভালভাবেই বলেছিলেন বৃহস্পতি। একটু রেখে ঢেকে। কিন্তু চন্দ্রের মুখে অবহেলার হাসি দেখে বৃহস্পতি বললেন-লজ্জা করে না তোর? গুরুর স্ত্রীকে ভোগ করে যাচ্ছিস? তাকে আটকে রেখেছিস বাড়িতে? গুরুপত্নীগামী পুরুষ যে কত বড় মহাপাতকী–সে কি তুই জানিস না? তুই যদি সত্যিসত্যিই তাকে ভোগ করে থাকি, তাহলে তুই এই দেবস্থানে থাকার যোগ্য নোস একটুওন দেবদনাহাঁসি যদি ভূক্তেয়মঙ্গনা। বৃহস্পতি এবার আসল কথাটা বললেন। বললেন-কালো চোখের সুন্দরী আমার বউটি। আহা! তাকে তুই এই মুহূর্তে ছেড়ে দে, নইলে অভিশাপ দেব এবার। বৃহস্পতি বোঝাতে চাইলেন–তার স্ত্রীর কোনও দোষই নেই, যত দোষ তার শিষ্যের।
চন্দ্রের মাথা রাজার মতোই ঠান্ডা। বৃহস্পতির অনুযোগ একটুও গ্রাহ্য না করে তিনি ঠান্ডা মাথায় বলতে আরম্ভ করলেন–বামুন মানুষের অত কি রাগ করলে চলে, ঠাকুর! ক্রোধের মতো একটা রিপু থাকলে মানুষ কি ভক্তি-শ্রদ্ধা করতে পারে সেই ব্রাহ্মণ-গুরুকে-ক্রোধাত্তে। তু দুরারাধ্যা ব্রাহ্মণা ক্রোধবর্জিতাঃ। সামান্য দুটো কথা বলার পরেই চন্দ্র এবার বৃহস্পতির তর্ক-যুক্তিতে এলেন। অর্থাৎ বৃহস্পতি যে এতক্ষণ—‘আটকে রেখেছিস’, ‘ভোগ করেছিস, ‘ছেড়ে দে’–এসব কথা বলে বোঝাতে চাইছেন– তার স্ত্রীর কোনও দোষ নেই, চন্দ্রই জোর করে তার স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই অনর্থ ঘটিয়েছেন–সেই ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে চন্দ্র এবার আইনি কায়দায় কথা বলতে আরম্ভ করলেন। চন্দ্র বললেন-সময় হলে তিনি নিজেই ফিরে যাবেন আপনার বাড়ি। এখানে ক’দিন সুখে আছেন, ভালই আছেন, তাতে আপনার কী ক্ষতিটা হল শুনিকা তে হানিরিহানঘ? আর আমি কি তাকে জোর করে আটকে রেখেছি নাকি? এখানে তিনি নিজের ইচ্ছেয় আছেন এবং এখানে থাকতে ভালও লাগছে তার-ইচ্ছয়া সংস্থিতা চাত্ৰ সুখকমার্থিনী হি সা।
চন্দ্র একেবারে আধুনিক মতে ধর্ষণের দায় এড়িয়ে গেলেন। অর্থাৎ ইচ্ছার বিরুদ্ধে নয়, বরং স্বেচ্ছায় তিনি সুখে আছেন। তার ভাল লাগছে–সুখকামার্থিনী হি সা। সবার শেষে গুরুকে তিনি আশ্বস্ত করে দিলেন–এই তো, আর কিছুদিন থেকে তিনি হয়তো স্বেচ্ছাতেই আপনার বাড়ি যাবেন–দিনানি কতিচিৎ স্থিত্ব, স্বেচ্ছয়া চাগমিষ্যতি। ভাবটা এই-’মনের মধ্যে ভাবনা কিন্তু রেখো সারাক্ষণ’–ইচ্ছা না হলে কিন্তু যাবেন না।
ক্রুদ্ধ-ক্ষুব্ধ বৃহস্পতি বাড়ি ফিরলেন। পৌরাণিক বলেছেন–শুধু দুর্ভাবনায় চিন্তাতুর হয়ে নয়, কামাতুর হয়েও ফিরলেন বৃহস্পতি–জগাম স্বগৃহং তুর্ণং চিন্তাবিষ্টো স্মরাতুরঃ। পৌরাণিক বৃহস্পতির মনস্তত্ত্ব বুঝেই এই মন্তব্য করেছেন। ঘরে থাকতে দৈনন্দিন দাম্পত্য অবহেলায় যে স্ত্রীকে বৃহস্পতি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করেননি, সেই স্ত্রীকেই পুরুষাস্তরের শঙ্গার-সংসর্গ-লিপ্ত অবস্থায় কল্পনা করে বৃহস্পতি হয়তো কামাতুর হলেন। ঘরে ফিরে বেশিদিন তার থাকা হল না। আবার এলেন চন্দ্রের বাড়িতে। এবারে বাড়ির দারোয়ানরাই তাকে বাধা দিল। দ্বারপালেরাও প্রভুর ইচ্ছা বোঝে। বৃহস্পতি বাইরে থেকেই তর্জন গর্জন করতে লাগলেন। বললেন–দেবতারা অধম! ঘরে শুয়ে আছিস কী করতে–কিং শেষে ভবনে মন্দ পাপাচার সুরাধম? ভাল চাস তো আমার বউ আমায় ফিরিয়ে দে, নইলে তোর কপালে আমার অভিশাপ নাচছে–দেহি মে কামিনীং শীঘ্র নোচেচ্ছাপং দদাম্যহম্।
