পুরাণ বলেছে–দক্ষ-কন্যাদের সঙ্গে বিবাহাদি সম্পন্ন হওয়ার পর চন্দ্র ভগবান বিষ্ণুর তপস্যা আরম্ভ করলেন। উগ্র তপস্যায় তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু যখন বর দিতে চাইলেন–তখন চন্দ্র। বললেন–আমি যেন ইন্দ্রলোক জয় করতে পারি–ততো বরে বরা সোমঃ শত্রুলোকং জয়ামহ্যম। সমস্ত দেবতাকে আমি যেন আমার গৃহে প্রত্যক্ষ দেখতে পাই। তার মানে, আমরা যারা এতদিন ইন্দ্রকেই দেবরাজ্যের অন্যতম নায়ক ভাবতাম, তা কিন্তু ঠিক নয়। চন্দ্র ইন্দ্রলোকের অধিকার চান এবং দেবতাদেরও তিনি স্বভবনে চোখের সামনে দেখতে চান। তিনি চান–দেবতারা তাঁর বাড়িতে নিত্য আহার করেন–প্রত্যক্ষমেব ভোক্তারো ভবন্তু মম মন্দিরে। এ ভাব যেন সেই নতুন এবং উঠতি বড়লোকের মতো–তিনি বড় একটি এস্টেট চান এবং চান–বড় বড় লোকেরা তাঁর বাড়িতে থানাপিনা করুন–এতে তিনি নিজে মর্যাদাসম্পন্ন বোধ করেন। অর্থাৎ চন্দ্র তার মহান পুণ্যবলে জনার্দন বিষ্ণুর বরে স্বর্গলোকের অধিকার পেতে চলেছেন, এবং দেবতা বলে কথিত মহামানবদের সঙ্গে এখন থেকে তার নিত্য ওঠা-বসা চলবে।
শুধু এইটুকুই নয়। ভগবান বিষ্ণুকে তিনি বলেছেনএকটি রাজসূয় যজ্ঞ করতে চাই আমি, এবং সেই যজ্ঞে ব্রাহ্মণ-পুরোহিতের কাজ করবেন স্বয়ং দেবতারা, আর শূলী শম্ভু সদা নিযুক্ত থাকবেন আমার রক্ষাকার্যে। ভগবান বিষ্ণু চন্দ্রের সমস্ত প্রার্থনা পূরণ করলেন। তার রাজসূয় যজ্ঞে সামগান করলেন স্বয়ং লোকপিতামহ ব্রহ্মা। অন্যান্য দেবতা সমস্ত যজ্ঞকার্য সমাধা করলেন সানন্দে। রাজসূয় যজ্ঞের পর কমনীয়, সুন্দর চন্দ্র আপন উজ্জ্বলতায় কমনীয়তর, সুন্দরতর হলেন।
অভাবনীয় ঘটনাগুলো ঘটতে লাগল ঠিক এর পর থেকেই। স্বর্গের অধিকার, দেবতাদের পৌরোহিত্য, রাজসূয় যজ্ঞ–এই সব কিছু মিলে চন্দ্রের শারীরিক উজ্জ্বলতা শুধু নয়, এসব তার মান-মর্যাদা এবং রাজকীয়তাও অনেক বাড়িয়ে তুলল। পুরাণ বলেছে–চন্দ্রের এই অলোক সামান্য মাহাত্ম্য লক্ষ করে দেব-রমণীরা চন্দ্রকে দেখে মুগ্ধ হতে লাগলেন, শারীরিক এবং মানসিক ভাবে। অন্তত ন’জন সুন্দরী দেব-স্ত্রী, যাঁদের নাম শুনলে অবাক হতে হবে–তারা তাদের স্বামী ছেড়ে চন্দ্রের সেবা করতে চাইলেন দাসীর মতো–কামবাণাভিতপ্তাস্যো নব দেব্যঃ সিষেবিরে। এঁদের সবাইকে সাধারণ জনে চিনবেন না–যেমন প্রজাপতি কর্দমের স্ত্রী সিনীবালী, কিংবা বিভাবসুর স্ত্রী দ্যুতি, অথবা জয়ন্তের স্ত্রী কীর্তি। এঁরা না হয় অচেনা, অথবা এঁদের নামের মধ্যে হয়তো রূপকের প্রশ্রয় আছে, কিন্তু স্বয়ং নারায়ণের স্ত্রী লক্ষ্মীও তার স্বামীকে ছেড়ে চন্দ্রের প্রেমে পড়লেন–লক্ষ্মী নারায়ণং তত্বা সিনীবালী চ কদম। সব চেয়ে বড় কথা–এঁরা না হয় স্বামী ছেড়ে চলে এলেন, কিন্তু চন্দ্র? চন্দ্রও সেই দেব-রমণীদের সঙ্গে আপন স্ত্রীর মতোই ব্যবহার করতে লাগলেন-স্বকীয়া ইব সোমোপি কাময়ামাস তাস্তদা।
ধরে নিতে পারি–এই নয় জন দেবপত্নীর কথাটা পৌরাণিকের অতিশয়োক্তি। কেননা, দ্যুতি, কীর্তি, প্রভা, এমনকি লক্ষ্মী–এই স্ত্রীলিঙ্গ-নামগুলি পরিচিত দেবপত্নীদের নাম হিসেবে খুব যুৎসই নয়। প্রধানত চন্দ্রের শারীরিক সৌন্দর্য এবং দেবসমাজেও তার অতুল প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এই নামগুলি ব্যবহার করা হয়েছে-সোমঃ প্রাপ্যাথ দুষ্প্রাপ্য ঐশ্বর্যমৃষিসংস্কৃত-এবং তা করা হয়েছে একটু পরেই আসল সত্য ঘটনাটি বলার জন্য। রাজার প্রভাবে মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্মী নারায়ণকে ছেড়ে কৃতী রাজার আশ্রয় নিয়েছেন–এই রূপক পুরাণে এবং সংস্কৃত সাহিত্যে সহস্রবার লক্ষ্য করা গেছে।
লক্ষ্মী শব্দের অর্থ ঐশ্বর্য। রাজা ঐশ্বর্য এবং প্রতিপত্তিশালী হলেই কবিরা এই উৎপ্রেক্ষা করে, কবিত্ব করে বলেছেন যে, লক্ষ্মী নারায়ণকে ছেড়ে রাজার আশ্রয় নিয়েছেন। কাজেই দ্যুতি, কীর্তি, দ্যপ্রভা, লক্ষ্মীর মতো স্ত্রীরা চন্দ্রের সাহচর্য পাওয়ার জন্য অভিভূত হলেনল্গ–এ কথাটা খুব বড় কথা নয়। আসলে চন্দ্র যে আপন প্রভাবে রমণী-সমাজে কতটা কাম্য হয়ে উঠেছিলেন, এটা যেমন এই ঘটনায় প্রমাণিত হল, তেমনই স্ত্রৈণতার ব্যাপারে চন্দ্রেরও যে খুব গুরু-লঘু বোধ ছিল না, সেটাও একাধারে বলে দেওয়া গেল। মূল সত্যি ঘটনাটা কিন্তু এর পরে আসছে–যে ঘটনায় সাক্ষী শুধু পুরাণগুলি নয়, সাক্ষী আছে মহাভারতের সেই সংক্ষিপ্ত পংক্তিটি–বৃহস্পতির যিনি স্ত্রী, তিনি আসলে চন্দ্রেরই স্ত্রী-বৃহস্পশ্চান্দ্রমসী ভার্যাসী যা যশস্বিনী। ঘটনাটি এবার বলি।
চন্দ্রের তখন বিশাল ঐশ্বর্য, অগাধ প্রতিপত্তি। ত্রিভুবন তার কাছে খুবই ছোট কথা, সপ্ত লোকের আধিপত্য তার করতলগত-সপ্তলোকৈকনাথত্ব অবাপ তপসা সদা। এই রকমই এক স্বাধিকার আর সুখের সময়ে চন্দ্র তার ভবন-সংলগ্ন উদ্যানের মধ্যে পাচারে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎই সেখানে দেখতে পেলেন এক সুন্দরী রমণী। উদ্যানের ফুলের আভরণ তাঁর গায়ে। স্তন-জঘনের সৌন্দর্যে পরম আকর্ষণীয়া। কোমল শরীর, যেন ফুল ছিঁড়তে গেলেও তার আঙুলে ব্যথা লাগবে–পুষ্পস্য ভঙ্গে’ প্যতিদুর্বলাঙ্গীম্।
চন্দ্রে বিলাস-উদ্যানে যে রমণীটিকে এইমাত্র দেখা গেল ইনি দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী–তারা। নিসর্গ-সৌন্দর্যের মধ্যে সৌন্দর্যের আধারভূতা এই রমণীটিকে দেখে চন্দ্র মনের আবেগ রুদ্ধ করতে পারলেন না। নির্জন উদ্যানভূমির সমতলে দাঁড়িয়ে তিনি তারাকে আলিঙ্গন করলেন। তারার গ্রন্থিবদ্ধ কেশরাশি আলুলায়িত হল– কেশেষু জগ্রাহ বিবিক্তভূমৌ। বোঝ গেল, স্বয়ং দেবগুরুর পরিণীতা স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা চন্দ্রের রূপে এবং প্রতিপত্তিতে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন–তদরূপকাত্যা হৃতমানসেন–যে, এই বলাৎকারী রসিককে বাধা দেওয়া তো দূরের কথা, তিনি শরীরে ও মনে খুশি হলেন। অনেক দিন সেই উদ্যান-ভূমির মধ্যেই কেটে গেল রসে-রমণে। চন্দ্রের সঙ্গে তারার সাহচর্য ঘনীভূত হল।
