.
১৭.
চন্দ্রবংশ। সুপ্রসিদ্ধ চন্দ্রবংশ। কৌরব, পাণ্ডব, ভীষ্ম, শান্তনু যে বংশের অধস্তন গৌরব-মূর্তি, সে বংশের প্রথম পুরুষ হলেন চন্দ্র। আমরা বংশমূল থেকেই মহাভারত-কথা আরম্ভ করব। তার কারণ, মহাভারত-কথা পাণ্ডব-কৌরবের যুদ্ধকাহিনীই শুধু নয়, সে শুধু একটামাত্র বংশের ইতিহাসও নয়, ভারতের ইতিহাস। আরও মনে রাখতে হবে- মহাভারত-কথায় আমরা শুধু অতি সংক্ষিপ্তভাবে অর্জুন-কৰ্ণ, ভীম-দুর্যোধন অথবা ভীষ্ম-যুধিষ্ঠিরের বীরত্ব, সাহস এবং মর্যাদায় মোহিত হই। কিন্তু এই বংশে এত বড় বড় সব রাজপুরুষ আছেন, যে, তাদের শৌর্য-বীর্য অথবা মহানুভবতা তাদের অধস্তনদের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। অপিচ তাঁদের কীর্তিকলাপ এবং বংশধারাগুলি পরিষ্কার ভাবে জানলে পরে দেখা যাবে–মহাভারতের যুদ্ধ মোটেই কুরু-পাণ্ডবের গৃহ-বিবাদমাত্র নয়, এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু আগেকার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত বিবাদও। আমরা তাই প্রথম থেকে আরম্ভ করছি।
প্রথমে চন্দ্র। সেকালের দিনে অনেক প্রসিদ্ধ বংশেরই মূল পুরুষকে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতাঁকে কল্পনা করা হত। প্রাচীন চীন-দেশেও এই রীতি ছিল। আমাদের দেশেও চন্দ্র-সূর্যের প্রতাঁকে দুটি বিখ্যাত বংশধারার কল্পনা। রাম-রঘু ইক্ষাকু বংশের মূলে আছেন সূর্য আর পাণ্ডব-কৌরব, ভীষ্ম-শান্তনুর মূল পুরুষ হলেন চন্দ্র।
আদি মানব-মানবী বলতে ওদেশে যেমন শুধু অ্যাডাম এবং ইভ, আমাদের দেশে তেমন ‘প্রোজেনিটর’ অন্তত দশজন আছেন। মহাভারত-পুরাণের মতে ব্রহ্ম তাঁর মন থেকে অন্তত দশটি পুত্র উৎপাদন করেন এবং সেই দশজনকেই তিনি পুত্র-সৃষ্টির কাজে নিযুক্ত করেন। এঁদের বলা হয় প্রজাপতি। এই প্রজাপতিদের অন্যতম হলেন মহর্ষি অত্রি।
ব্রহ্মার দ্বারা আদিষ্ট হয়ে মহর্ষি অত্রি পুত্র-সৃষ্টির তপস্যায় বসলেন। পরম আনন্দ-স্বরূপ ব্ৰহ্ম-জ্যোতিকে তিনি তাঁর দুই নয়নের মধ্যবর্তী স্থানে উদ্ভাসিত দেখতে পেলেন। ঠিক এই সময়ে দেবদেব শঙ্কর প্রিয়া পার্বতাঁকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন অত্রির সামনে। তাদের দেখে তপস্যারত অত্রির নয়ন বেয়ে এক বিন্দু আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল; আর সেই আনন্দের অশ্রুবিন্দু থেকেই জন্ম হল শিশু চন্দ্রের তস্মাৎ সোমো’ ভবচ্ছিন্নঃ তার স্নিগ্ধ আলোয় তিন ভুবন আলোয় আলো হয়ে গেল। দিদ্বধূরা শিশু-চন্দ্রকে ধারণ করলেন আপন গর্ভে।
বস্তুত, আকাশে চাঁদ ওঠে বলেই দিগবধূর কল্পনা। দিবধূদের গর্ভস্থ সন্তানকে ব্রহ্ম এক মনোহর যুবা-পুরুষে পরিণত করেন এবং সমস্ত ব্ৰহ্মর্ষি-দেবর্ষি তাঁকে বৈদিক সোম-মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করলেন। বেদে সোমরস কোনও ওষধির নির্যাসই হোক, অথবা লতার নির্যাস, ঋষিরা সোমের উদ্দেশে বহু স্তুতি-সূক্ত রচনা করেছেন। তাকে রাজা বলেও সম্বোধন করেছেন সোমং রাজানং হবামহে..ইত্যাদি। বেদে সোমের এই রাজকল্পনা থেকেই পুরাণে সোমকে দেবতা, পিতৃগণ এবং ওষধির আধিপত্য দেওয়া হয়েছে। ঋষিমুনিদের অহরহ স্তুতিতে তার শরীর আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল–স্তয়মানস্য তস্যাভূদ অধিকো ধামসম্ভব।
যুবা-পুরুষ চন্দ্রের চেহারাটি এমনই সুন্দর এবং কমনীয় হল যে অন্য আরেক প্রজাপতি দক্ষ তার সমস্ত নক্ষত্র-কন্যাকে সম্প্রদান করলেন চন্দ্রের হাতে। নক্ষত্রসুন্দরী রোহিণী এবং চন্দ্রের গভীর অনুরাগের কথা আমরা আগে বলেছি এবং সেই অনুরাগের ফলে দক্ষ-প্রজাপতির অন্য কন্যাগুলির কী দুরবস্থা হয়েছিল, তাও আমরা সবিশেষ কীর্তন করেছি। চান্দ্রের যক্ষ্মা-রোগের কাহিনীও আমরা মহাভারত থেকে শুনিয়েছি। শুধু যেটা বলিনি–সেটা হল চন্দ্রের একগুয়ে প্রকৃতির কথা, যদিও দক্ষ-প্রজাপতির সনির্বন্ধ অনুরোধ-উপরোধ প্রত্যাখ্যান করার ঘটনা থেকে চন্দ্রের স্ত্রৈণতা এবং একগুয়েমি–দুটোই বেশ ভালভাবেই প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করি।
মুশকিল হল–চন্দ্রের জীবন-কাহিনীর সব অংশ মহাভারতে নেই। কোথাও বা অনেক বড় কাহিনী সূত্রাকারে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু পাণ্ডব-কৌরব-বংশের মূল পুরুষকে আমরা এত সহজে ছেড়ে দিতে পারি না। তাই প্রচুর-পুষ্পমোদী মধুকরের মতো অনেক কাহিনীই আমাকে বিভিন্ন পুরাণ থেকে সংগ্রহ করে এনে এই ভারত-কথার মধুকোষে সঞ্চয় করতে হচ্ছে।
মহাভারতের কবি একেবারে অন্যপ্রসঙ্গে বনপর্বে একবার বলেছিলেন–দেবগুরু বৃহস্পতির যিনি স্ত্রী ছিলেন, তাকে চন্দ্রের স্ত্রীও বলা যায়–বৃহস্পতেশ্চান্দ্রমসী ভার্যাসী যা যশস্বিনী। এই সংক্ষিপ্ত পরিচয়টুকুর মধ্যে যে ব্যঞ্জনা আছে, সে ব্যঞ্জনা আর ভাষার স্থূলতায়। ব্যক্ত করেননি কবি। হয়তো সে প্রসঙ্গও আসেনি। অথবা হয়তো সেই গভীর কথাটা তাঁরও মনে ছিল–যা তিনি মহামতি বিদুরের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন উদ্যোগ-পর্বে। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন–মহা-মহা-ঋষি-মুনি আর বড় বড় কীর্তিশালী বংশের মূল খুঁজতে যেও না কখনও-কুলানাঞ্চ মহাত্মনাং… প্ৰভবো নাধিগন্তব্যঃ।
এই সাবধান-বাণী এই জন্য যে, মহৎ বংশের গায়ে কলঙ্কের চিহ্ন থাকলে অল্পস্বত্ত্ব লোকের মুখ বড় মুখর হয়ে ওঠে। যাদের ধারণ ক্ষমতা কম, তারা ওইটুকু দিয়েই বিশিষ্ট জনের বিচার করতে শুরু করে। মহাভারতের কবি তাই কুরু-পাণ্ডব বংশের মূল ব্যক্তিটির চরিত্র-চর্চার মধ্যে যাননি। আমরা অবশ্য সেই চর্চায় যাচ্ছি। যাচ্ছি পৌরাণিকদের হাত ধরে, যদিও খলস্বভাব দুর্মতিদের জন্য আমার দুর্ভাবনা এবং করুণা–দুইই রয়ে গেল।
