লোমহর্ষণ অবশ্য তখনও লোমহর্ষণ হননি, কারণ মহাভারত তখনও বলা হয়নি। এই যে জনমেজয়ের সর্প-যজ্ঞ মিটে গেল, সভাস্থ সকলের মন ভরে উঠল আনন্দে, তখনই সূচনা হল মহাভারত-কথার। জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞের আরম্ভেই মহামতি ব্যাস এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।
জনমেজয়ের বড় ইচ্ছা ছিল–অতিবৃদ্ধ এই প্রপিতামহের কাছে নিজের পূর্বজদের রাজকাহিনী শুনবেন। কিন্তু সর্পযজ্ঞের ব্যস্ততা আর প্রতিহিংসার তাড়নার মধ্যে সে কাহিনী শোনার অবসর হয়নি। আজ যখন মিলন আর সংহতির সূচনা করে যজ্ঞ শেষ হল, তখন অপার আনন্দে জনমেজয় অতিবৃদ্ধ-প্রপিতামহের জন্য সোনার আসন তৈরি করালেন রাজসভায়। জনমেজয়ের তৈরি সেই আসন আজও আছে মানুষের মনে। আজও ভাগবত-পাঠের আসরে যে মান্য ব্যক্তিটি বক্তার আসনে বসেন, সেই আসনটির নাম ব্যাসাসন।
ব্যাসাসনে উপবিষ্ট ব্যাসের কাছে জনমেজয় হাত জোড় করে অনুরোধ জানালেন পাণ্ডব-কৌরবের সমস্ত ঘটনাই আপনি সামনে থেকে দেখেছেন–ভবান প্রত্যক্ষদর্শিবান আপনি আমাদের কাছে তাদের সমস্ত ঘটনা এবং তাদের চরিত্র বর্ণনা করুন। শুধু তাই নয়, এই যে বিরাট কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ঘটে গেল, সেই যুদ্ধ কেন ঘটল, কেনই বা এত প্রাণ নষ্ট হয়ে গেল–আপনি শোনান আমাদের।
জনমেজয়ের প্রশ্নের মধ্যে কুরু-পাণ্ডবের রাজনৈতিক ইতিহাসের জিজ্ঞাসাই শুধু ছিল না, তার মধ্যে তৎকালীন ভারতবর্ষের সামগ্রিক রাজনীতির জিজ্ঞাসা ছিল। জনমেজয় শুধু কুরু-পাণ্ডবের জ্ঞাতিবিরোধটুকুই জেনে ক্ষান্ত হতে চান না, এই বিরাট যুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধ কত দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল, যাতে ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেন দুই পক্ষে এবং মারা গেলেন-জনমেজয় এই রাজনৈতিক বৃত্তান্ত আমূলান্ত জানতে চান–তচ্চ যুদ্ধং কথং বৃত্তং ভূতান্তকরণং মহৎ?
হায়! যে বালক এই মুহূর্তে ঠাকুরদাদার কাছে নাতিটির মতো প্রশ্ন করে বসল পাণ্ডব-কৌরবের গল্প বলুন–সেই পাণ্ডব-কৌরবের গল্প বলা কি অতই সহজ! ব্যাসের বয়স এবং সম্বন্ধের তুলনায় জনমেজয় একটি বালকমাত্র। জনমেজয় অর্জুনের নাতি। অতএব তার কাছে পাণ্ডব-বীর অর্জুন অথবা ভীমের বীরত্ব কিংবা যুধিষ্ঠির-কৃষ্ণের বিশাল ব্যক্তিত্বময় কাহিনীটুকুই সব চাইতে বড়। কিন্তু ব্যাস! তিনি যে স্বয়ং এই পাণ্ডব-কৌরব বংশের জন্মদাতা। এই বংশের ওপর যে তার অশেষ মায়া। সেই মহান বংশের জাতকেরা পরস্পর হানাহানি করে মরল–এক পক্ষ জিতল, এক পক্ষ হারল–এসব কথা কেমন করে নিজ মুখে বলবেন ব্যাস। তিনিও যে পাণ্ডব-কৌরবের পিতামহ। বলতে পারেন–মুনি-ঋষিদের আবার অত মায়া কী? তারা তো সুখ-দুঃখে, লাভালাভে সমান দৃষ্টি। তাদের আবার কীসের মায়া? আমি বলি-মুনি-ঋষি হলেও তারা আগে মানুষ। মহাভারতের পরবর্তী অংশে আমি মাঝে-মাঝেই দেখাব–এই নিষ্কাম সমাধি-লগ্ন মানুষটি কোন মায়ায়, কোন সুতোর টানে পাণ্ডব-কৌরবের মর্ম-কথায় জড়িয়ে গেছেন। কিন্তু আজ এই বালক জনমেজয়ের সামনে সেই মায়া, সেই একান্ত মনুষ্যোচিত ব্যক্তিসত্তার প্রথম উন্মোচন ঘটল।
ব্যাস ব্যাসাসনে বসেও নিজ মুখে মহাভারতের কাহিনী বলতে পারলেন না। নিজে বললে নানা কথায়, বিভিন্ন প্রসঙ্গের উপক্রমে তার পক্ষপাত–একতরের প্রতি পক্ষপাত, অন্যতরের প্রতি দোষদৃষ্টি প্রকাশ পেতে পারে। অতএব যে নৈর্ব্যক্তিকতায় কবি তার মর্মশায়ী ঘটনা বিবৃত করেন, যে রসবত্তায় এক প্রেমিক তার না-পাওয়া প্রেমিকার সঙ্গে aesthetic distance বজায় রেখেও তাকে ভালবেসে যান, তার গল্প বলেন, ঠিক সেই নৈর্ব্যক্তিকতায় সেই রসবত্তায় মহামতি ব্যাস মহাভারতের কাহিনী লিখে রেখেছেন। কিন্তু সে কাহিনী তিনি নিজে বলতে পারছেন না। তাই আপন বংশের জাতক বালক জনমেজয়ের মুখে পাণ্ডব-কৌরবের গল্প বলার অনুরোধ শুনেই তিনি তাঁর প্রিয়-শিষ্য বৈশম্পায়নকে আদেশ করলেন তার স্বলিখিত মহাভারতের কাহিনী শোনানোর জন্য–শশাশ শিষ্যমাসীনং বৈশম্পায়নমন্তিকে। ব্যাস বললেন-কুরু-পাণ্ডবের বিরোধ কেমন করে ঘটেছিল- যেমনটি তুমি আমার কাছে শুনেছ সব খুলে বলতদস্মৈ সর্মচক্ষু যম্মত্তঃ শ্রুতবানসি। বৈশম্পায়ন গুরুর আদেশ পেয়ে মহাভারতের অমৃত-কথা আরম্ভ করলেন-বৈশম্পায়ন উবাচ।
বৈশম্পায়ন। কথক ঠাকুরদের মধ্যে তাঁর মতো বক্তা আর নেই। স্বয়ং ব্যাস নিজের হাতে তাকে তৈরি করেছেন বিচিত্র মহাভারত-কথা জনসমক্ষে শোনানোর জন্য। অন্য কথক-ঠাকুরদের মতো তিনি সূত-জাতীয় নন। তিনি ব্রাহ্মণ। গুরুর আদেশ পাওয়া মাত্র তার যেটা কর্তব্য অথবা ইচ্ছে ছিল তা কিন্তু তিনি করতে পারলেন না। এবং এইখানেই তার বুদ্ধি। যে গুরুদেব তাকে হাতে ধরে মহাভারত কথা শিখিয়েছেন, যিনি নিজ মুখে নিজের প্রশংসা করতে পারবেন না–এই ভয়ে নিজে মহাভারতের কথা বললেন না, বৈশম্পায়নের ইচ্ছে ছিল সেই গুরুর প্রসঙ্গটাই আগে তোলার। কিন্তু বুদ্ধিশালী এই কথক-ঠাকুর রাজা জনমেজয়ের আগ্রহটা কোথায়–তা খেয়াল করেছেন। রাজা চান–তার পিতৃ-পিতামহের বীরত্ব-কাহিনী শুনতে। আর বৈশম্পায়ন চান–বিদ্যাদায়ী গুরুর মহিমা কীর্তন করতে। কিন্তু দুয়ের দ্বৈরথে শ্রোতার আগ্রহই যেহেতু বড় কথা, তাই বুদ্ধিশালী বৈশম্পায়ন আগে গোটা মহাভারতের সংক্ষিপ্তসার শুনিয়ে দিলেন রাজা জনমেজয়কে। এতে রাজার জিজ্ঞাসা শান্ত হল বটে, কিন্তু বিস্তারিত বিবরণের জন্য তার আগ্রহ হয়ে উঠল দ্বিগুণ। বৈশম্পায়ন এইটাই চাইছিলেন। এরপর রাজা যেই বিস্তারিত কাহিনী শুনতে চাইলেন, সঙ্গে সঙ্গে বৈশম্পায়ন আপন গুরু বেদব্যাসের জীবন-কথা শুনিয়েছেন জনমেজয়কে কিন্তু তাও বড় সংক্ষেপে। আমার কথা হল–জনমেজয়ের আগ্রহ সত্ত্বেও মহাভারতের কথক-ঠাকুর যেমন শেষ পর্যন্ত নিজের মতো করেই মহাভারতের কাহিনী বর্ণনা করেছেন, তেমনই আজকের দিনে মহাভারত-কথা শোনাতে হলে তার জটিল জায়গাগুলি আমাকে যে যথাসম্ভব সহজ পদ্ধতিতে বলতে হবে, সেই অঙ্গীকার নিয়েই আমাদের উপাখ্যান-ভাগ আরম্ভ হবে আগামীতে। অয়মারম্ভঃ শুভায় ভবতু।
