স্বর্গারোহণের কথাটা এখন এমনই শুনতে লাগে, যেন সে স্বর্গ বুঝি মৃত পুণ্যাত্মাদের মরণোত্তর আশ্রয়ভূমি। আমাদের দেশে এই সেদিনও লোকে বুড়ো হয়ে গেলে জীবনের শেষ কদিন বিশ্বেশ্বরের সান্নিধ্যে কাটানোর জন্য কাশী যেতেন। আমরা পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্ৰৌপদীকেও মৃত্যুর ঠিক আগে নিজের জায়গা ছেড়ে স্বর্গে আরোহণ করতে দেখেছি। যদিও যুধিষ্ঠিরের স্বর্গ এবং তারও পূর্বে ইলাবৃত-বর্ষের স্বর্গ একেবারেই আলাদা। কিন্তু এই যে পুরাণে-ইতিহাসে সশরীরে স্বর্গে যাওয়ার কথাটা শোনেন, সেটা ছিল ওই মৃত্যুর পূর্বে কাশী যাওয়ার মতো।
স্বর্গ বলে যে জায়গাটা ছিল, সেখানে যেতে হলে পাহাড়-নদী পেরিয়ে বন্ধুর পথ বেয়ে ওপরে উঠতে হত। সেই জন্যেই স্বর্গে যাওয়াটা যাত্রামাত্র নয়, সে ছিল স্বর্গারোহণ। সেইজন্যই উত্তর আরও উত্তর দেশের উচ্চ ভূমি বা পর্বতই ছিল স্বর্গ। আর্যরা যতদিন ইলাবৃত-বর্ষে ছিলেন তখন সেটাই ছিল স্বর্গ। কিন্তু কাশ্মীর হয়ে তারা যখন আরও নীচে উত্তর প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন, তখন ইলাবৃত-বর্ষের পথ তাদের কাছে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। যুধিষ্ঠিরকে তাই বদরীনারায়ণ এবং মানস সরোবরের পথে স্বর্গারোহণ করতে হয়েছে। ইলাবৃত-বর্ষ যে দেবতাদের বাসভূমি সে তো আমরা পুরাণ থেকে শ্লোক উদ্ধার করে বলেইছি। গিরীন্দ্রশেখরের ধারণা–ইলাবৃত-বর্ষের মধ্যে যে মেরু-পর্বত (এই মেরু পৃথিবীর অক্ষপ্রান্ত মেরু নয়) সেইখানেই দেবতাদের বাস ছিল। বায়ুপুরাণে আছে–বেদ-বেদাঙ্গ জানা পণ্ডিতেরা নাকপৃষ্ঠ, দিব, স্বর্গ ইত্যাদি পর্যায়বাচক শব্দে মেরুমহিমা কীর্তন করেন। এই গিরিতেই দেবলোক বিরাজিত বলে সমস্ত শ্রুতি বা বেদে বলা আছে–দেবলোকে গিরৌ তস্মিন্ সর্বশ্রুতি গীয়তে।
ঠিক এই জায়গাটা থেকেই আবারও আমরা মহাভারতের অমৃত-মন্থনের প্রস্তাবে ফিরে যাব। আপনাদের মনে আছে কি–আমি সেই বলেছিলাম–অথবা আমার কথা মনে রাখার দরকার কী, আপনারা অমৃত-মন্থনের পূর্বে মহাভারতের সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করুন। সেই মেরুগিরি, যা উজ্জ্বল সুবর্ণপ্রভ, দেবতা-গন্ধর্বদের আনাগোনা যেখানে সব সময়। অধার্মিক লোকেরা যেখানে যেতে পারে না এবং যা নিজের উচ্চতায় স্বর্গকেও আবৃত করে রেখেছে-নামাবৃত্য তিষ্ঠতি। দেবতারা সেই মেরুপর্বতের শৃঙ্গে উঠে অমৃত আহরণ করার মন্ত্রণা আরম্ভ করলেন–তস্য শৃঙ্গমুপারুহ্য..তাসীনা দিবৌকসঃ।
এখানে এই পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করার মধ্যে একটা রহস্য আছে বলে আমাদের ধারণা। আগেকার দিনে দূরস্থান নির্ণয় করার জন্য লোকে গাছে উঠে দেখত। পাহাড়ে উঠেও দেখত। যদি বিশ্বাস করি–দেবতাদের স্বর্গে খাদ্য-পানীয়ের অকুলান হলে, নদ-নদী শুকিয়ে গেলে তারা নতুন দেশ আবিষ্কারের প্রয়োজনে মেরুপর্বতের শৃঙ্গে আরোহণ করে মন্ত্রণা আরম্ভ করেছিলেন–তে মন্ত্রিতুমারব্ধাস্তাসীনা দিবৌকসঃ– তাহলে ব্যাপারটা সুধীজনের কাছে সমর্থনযোগ্য যতটাই হোক, বিশ্বাসযোগ্য হয় বটেই। অমৃত-মন্থনের শ্রেষ্ঠ ফল যদি শুক্রাচার্যের মৃতসঞ্জীবনীর মতো কোনও পরম ঔষধ হয়, তাহলে হস্তী, অশ্ব, সুরভি ইত্যাদি গৌণ ফল আর্যদের নূতন দেশ আবিষ্কারের সূত্রেই এসেছে। অমৃত-মন্থনের বাস্তব তাৎপর্য সেইখানেই। নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া, গাছের ফল শেষ হয়ে যাওয়া অথবা স্থায়ী আবাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আর্যদের যে নতুন করে দেশ খুজতে বেরতে হয়েছে–সে কথা পুরাণগুলি থেকে যথোপযুক্ত স্থানে প্রমাণ দেব। হয়তো এই প্রবন্ধে নয়, অন্যত্র।
দেবতা, অসুর, রাক্ষস–এঁদের পারস্পরিক স্থিতি নিয়ে বহু আলোচনার অবসর আছে। আমি তার মধ্যে যাচ্ছি না। শুধু মনে রাখুন–মানুষের সঙ্গে এঁদের বড় তফাত নেই। পুরাণ-কথা এবং দর্শন গ্রন্থগুলি থেকে এঁদের পারস্পরিক স্থিতি বোঝাতে গেলে যে সময় এবং জায়গা লাগবে তাতে আপাতত আমাদের মহাভারত-কথার ছন্দ নষ্ট হতে পারে। আপাতত তাই বিরতি।
অমৃত-মন্থনই যখন হয়ে গেল, তখনই আমাদের দায় আসল সৌতি উগ্রশ্রবার কাছে ফিরে যাওয়ার। অমৃত-মন্থনের কাহিনী বলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন–দেবতাদের মধ্যেও মানুষের মতোই লোভ, তৃষ্ণা, ছলনা এবং হিংসার বৃত্তিগুলিও আছে। বৈরোচন বলি এবং দেবরাজের কথোপকথনের অংশমাত্র দেখিয়ে দেবতাদের নশ্বরতার কথাও যে আমরা খানিকটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, তার কারণ আর কিছুই নয়, এতে প্রমাণ হবে–দেবতারা কেউই মনুষ্যবৃত্তির উর্ধ্বে নন–আকারে ইঙ্গিতে এবং ব্যবহারে এই কথাটাও অমৃত-মন্থন কাহিনীর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে আমরা মনে করি।
সৌতি উগ্রশ্রবার মুখে অমৃত-মন্থনের কাহিনী এসেছিল নাগদের প্রসঙ্গ থেকে। আরও স্পষ্ট করে বলা ভাল–তক্ষকের প্রসঙ্গ থেকে। নাগরা রক্ষা পেলেন তাদেরই পরমাত্মীয় আস্তীক মুনির করুণায় এবং মধ্যস্থতায়। জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ শেষ হয়ে গেল নাগ জন-জাতির সঙ্গে তৎকালীন ক্ষত্রিয়দের মিলন-যজ্ঞে।
একই সঙ্গে সৌতি উগ্রশ্রবার কাজও কিন্তু শেষ হয়ে গেছে। আধুনিক রাজার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও এবার জনমেজয়ের রাজসভার কাহিনীতে চলে যাবেন। জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞের সানন্দ সমাপনে সভাস্থলে আনন্দের কলতান উঠল। সমবেত ঋষি-মুনি থেকে আরম্ভ করে শিল্পী-স্থপতি, সূত-মাগধ কেউ জনমেজয়ের দান-মান থেকে বঞ্চিত রইলেন না। এই দান-গ্রহীতার তালিকায় আরও একটি নামের কথা আমি পূর্বে বলেছিলাম। তিনি হলেন এই সৌতি উগ্রশ্রবার পিতা লোমহর্ষণ। জনমেজয়ের সভায় ব্যাস-বৈশম্পায়নের সান্নিধ্যে মহাভারত শুনে লোমহর্ষণ মহাভারতে কথক-ঠাকুর হয়ে উঠবেন পরে।
