পণ্ডিতেরা বলেন-মধ্য এশিয়ার পামির বা পূর্ব তুর্কিস্থানের মহাভারতীয় নাম হল ইলাবৃত-বর্ষ। এই উত্তর-কুরু সেই ইলাবৃত-বর্ষের আরও উত্তরে। গিরীন্দ্রশেখর বসু লিখেছেন–উত্তর-কুরু দেশেই ব্রহ্মলোক বা বিষ্ণুলোক। ঋকবেদে বিষ্ণুকে উন্নত’ অর্থাৎ উত্তরদেশবাসী বলা হয়েছে এবং সেই রাজ্যে প্রচুর শৃঙ্গী হরিণ পাওয়া যায়–ভূরিশঙ্গা গাবঃ। গিরীন্দ্রশেখরের নিজের ভাষায়–”পৌরাণিক নির্দেশ অনুসারে মনে হয় বিষ্ণুর রাজ্য ক্যাসপিয়ন সাগরের উত্তরে ছিল। হিন্দু তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসী ক্যাসপিয়ন সাগরের তীরে যাইতেন তাহার প্রমাণ আছে। (দ্রষ্টব্য : বাকুতে হিন্দুমন্দির’ নামক প্রবন্ধ : নূতন পত্রিকা, ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৬)। উত্তর কুরু সাইবেরিয়া বা রাশিয়ার কোনও স্থান বলিয়া মনে হয়। উপনিষদে ব্রহ্মলোক যাইবার পথে আর’ হ্রদ ও বিজরা নদীর উল্লেখ আছে। আর হ্রদ ও Lake Aral বোধহয় একই। বিজরা ও আধুনিক Pachora একই বলিয়া মনে হয়।”
ব্ৰহ্মলোক বা বিষ্ণুলোকের সামান্য একটা হদিশ পাওয়া গেল। এবারে স্বর্গ লোকের কথা বলি। বর্ষ মানে স্থান, জায়গা; যেমন ভারতবর্ষ– ভরত-বংশীয়দের জায়গা। এই রকমভাবে ভরত বংশীয়দেরও অতি-পূর্ব পুরুষ হলেন ‘ইল’। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি স্থান–যার নাম ইলাবৃত-বর্ষ। গিরীন্দ্রশেখর এই ইলাবৃত-বর্ষকেই স্বর্গভূমি বলে চিহ্নিত করেছেন এবং সে জায়গাটা মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত। সম্ভবত পামির বা পূর্ব তুর্কীস্থান ইলাবৃতবর্ষের অন্তর্গত। গিরীন্দ্রশেখরের ধারণা–এই জায়গার নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এই ইলাবৃত-বর্ষের সভ্যতা লুপ্ত হয় এবং নিতান্ত অলাভাবের জন্যই ইলাবৃত-বর্ষ থেকে ভারতের দিকে তারা আসতে থাকেন। কালবশে তারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। তখন একদলের নাম হয় দেব অন্য দলের নাম অসুর।
অসুর শব্দটা যথেষ্ট পুরনো। এক সময় ‘অসুর’ শব্দে লোকে দেবতাও বুঝত। ঋগবেদে বহু জায়গায় দেবতাদের অসুর বলা হয়েছে। অসুরদের মধ্যে যে অদেবত্ব কিছু ছিল না, তার সবচেয়ে বড় ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ আবেস্তার ‘আহুর’ শব্দে। ভাষাতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন সংস্কৃত ‘অসুর’ শব্দই আঁবেস্তার ‘আহুর’। এবং জে আবেস্তাতে আহুর মানেই দেবতা–যেমন আহুরা মাজদা। তাই ধরেই নেওয়া যায় যে, সুরাসুরে দ্বন্দ্ব যতই থাকুক, তাতে কারুরই মান্যতা নষ্ট হত না এবং পূর্বে তাদের ঠিকানাও ছিল এক–সেই ইলাবৃত-বর্ষ।
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী ভারতবর্ষের উত্তরে হিমালয় পর্বত। হিমালয়ের উত্তরে এবং হেমকূট পর্বতমালার দক্ষিণে হল কিম্পূরুষ-ব। হেমকূটের উত্তরে হরিবর্ষ। হরিবর্ষের সীমা নিষধ পর্বত পর্যন্ত। আর ওই নিষধ পর্বতের উত্তরেই ইলাবৃত-বর্ষ। এটাই যে স্বর্গ তার কী প্রমাণ আছে? এবারে গিরীন্দ্রশেখর যা বলেননি, সে প্রমাণও দাখিল করছি। এক তো হল মহাভারতের সেই উত্তরে হিমবৎপার্শ্বের সেই সুখস্থানটি যাকে মহাভারত বলেছে–স স্বর্গসদৃশো দেশঃ। দ্বিতীয় প্রমাণ আছে পুরাণে। পুরাণ বলেছে-ইলাবৃত-বর্ষ জায়গাটা কী রকম? না, সেখানে দৈত্যরাজ বলির মহান যজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছিল–যে যজ্ঞে বিষ্ণু বামন হয়ে পৃথিবী ভিক্ষা করে বলির রাজ্যাধিকার নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন–সেটাই ইলাবৃত-বর্ষ। আমাদের পূর্বকথিত ত্রিপুর দুর্গও এইখানেই। জিজ্ঞাসা করতে পারি–জায়গাটার আর কোনও বিশেষত্ব আছে কি? আছে। দেবতারা যেখানে জম্মেছিলেন, দেবতারা যেখানে বিবাহাদি করেন, যেখানে দেবতাদের অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ-সব কাজ হয়, এমন কি কন্যা সম্প্রদান করতে গেলেও দেবতাদের যে জায়গাটা ব্যবহার করতে হয়–সেই জায়গাটাই হল ইলাবৃত বর্ষ–
দেবানাং জন্মভূমি র্যা ত্ৰিযু লোকেষু বিশ্রুতাঃ।
বিবাহাঃ কুতবশ্বৈব জাতকর্মাদিকাঃ ক্রিয়াঃ।
এবারে মহামতি গিরীন্দ্রশেখরের অনুমানটা জানাই–দেবতারা ইলাবৃত-বর্ষ অর্থাৎ আধুনিক তুর্কিস্থান থেকে কাশ্মীরের পথে প্রথম ভারতে আসেন। তারা কাশ্মীর থেকে পাঞ্জাব এবং পাঞ্জাব থেকে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত আস্তে আস্তে অধিকার করে নেন। তারপর বিন্ধ্যের দক্ষিণেও রাজ্যবিস্তার করেন। ভারতীয়দের পূর্বপুরুষেরা প্রথমে কাশ্মীর বা অন্তরীক্ষে এসে বসবাস শুরু করেন বলেই অন্তরীক্ষের অন্য নাম পিতৃলোক। অন্তরীক্ষ মানে মধ্যবর্তী দেশ। দেবলোক, পিতৃলোক এবং মর্ত্যলোক যথাক্রমে ইলাবৃতবর্ষ, কাশ্মীর এবং উত্তর ভারত।
গিরীন্দ্রশেখরের আরও বক্তব্য হল–দেবতারা যখন প্রথম ভারতে আসেন, তখন প্রথমে তারা ইন্দ্রের অধীন ছিলেন। স্বর্গ বা ইলাবৃত বর্ষের অধিপতির সাধারণ নাম ইন্দ্র। ভারতে তখন রাজা বলে কেউ ছিল না। ভারতে নেমে আসার পর দেবতারা মানব নামে পরিচিত হন কারণ ইন্দ্রের প্রতিভূ হলেন প্রজাপতি মনু–যাঁর নামে এই মানব জাতি। ইলাবৃত-বর্ষ ভারতীয়দের আদি বাসস্থান বলেই অতি পবিত্র তীর্থ বলে গণ্য হত। যুধিষ্ঠিরের সময়েও লোকে স্বর্গে তীর্থ করতে যেত। ক্রমে স্বর্গের পথ দুর্গম হয়ে পড়ে। কাশ্মীর থেকে তুর্কিস্থান যাওয়ার যে বণিকপথ এখনও আছে, সেটাই স্বর্গে যাওয়ার আদিপথ বা দেবযান-পথ বলে মনে হয়। উত্তরপ্রদেশের উচ্চ ভূমি এবং পর্বতও পরবর্তী কালে স্বর্গ নাম লাভ করেছিল।
