অসুর-রাক্ষসেরা অবশ্য আগে মোর্টেই খারাপ ছিলেন না। প্রথম প্রথম এক বাপের দুই ছেলের যেমন ভাব-ভালবাসা থাকে, তেমনটি দেবতা এবং অসুরদের মধ্যেও ছিল-অসুরা যে পুরা হ্যাঁসন্ তেষাং দায়াদ-বান্ধবাঃ। তবে সমস্ত গোলমালের মূলে কিন্তু ওই পৃথিবীর অধিকার নিয়ে দুই পক্ষের বনিবনা না হওয়া। এমনকি অনেকে বলেন, অসুর-রাক্ষসেরা আগে দেবতাদের চেয়েও ভাল মানুষ ছিলেন এবং তারা খারাপ হয়েছেন দেবতাদের জন্যই। অবশ্য তারও কারণ কিন্তু সেই ভূমির অধিকার।
প্রায় বৈদিক যুগের অতি প্রামাণ্য গ্রন্থ শতপথ ব্রাহ্মণ, যেটিকে সকলে বেদ বলেই মানেন, সেই গ্রন্থে অসুর আর দেবতাদের সম্বন্ধে খুব প্রামাণিক একটা কথা পাওয়া যাবে। শতপথ বলছেন–প্রজাপতি যেমন দেবতাদের সৃষ্টি করেছেন, তেমনই অসুরদেরও সৃষ্টি করেছেন তিনিই–উভয়ে প্রাজাপত্যাঃ। তা এক সময় অসুররাই সমস্ত পৃথিবী দখল করে নিয়েছিলেন। অধিকার সম্পূর্ণ হবার পর অসুরেরা নিজেদের মধ্যে পৃথিবীটা ভাগাভাগি করে নেওয়ার কথাও ভাবলেন। নেতারা আপন আপন অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য মাপ-জোকও আরম্ভ করে দিলেন। বিতাড়িত দেবতারা আরও বিপন্ন হয়ে উপস্থিত হলেন যজ্ঞপতি বিষ্ণুর কাছে। তারা ঠিক করলেন–ভাগাভাগির সময়েই অসুরদের ধরতে হবে। নইলে একবার নিজেদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে আর কিছুই মিলবে না। দেবতারা বিষ্ণুকে সঙ্গে নিয়ে অসুরদের কাছে গিয়ে দেখলেন–মাপজোক, নকশা চলছে জমির অধিকার নিয়ে। দেবতারা বললেন–সব যে নিজেরাই ভাগ করে নিচ্ছ, আমাদের কী হবে? আমরা কি কিছুই পাব না? আমাদের ধারণা–অসুররা যদি দেবতাদের কাছে এসে বলতেন–আমাদের কী হবে, তবে তারা বধির হয়ে থাকতেন।
কিন্তু অসুরেরা কত ভাল মানুষ দেখুন। তারা বললেন–তাই তো তোমাদেরও কিছু পাওয়া উচিত বটে। তা বাপু, সবাইকে তো আর দিতে পারব না। বরং, তোমাদের নেতা ওই বিষ্ণুর শুতে যতটুকু জায়গা লাগে, সেটা দেব তোমাদের–যাব দেবৈষ বিষ্ণুরভিশেতে, তাববো দপ্ন ইতি। এরপরের কাহিনী পুরাণে বলি-রাজার উপাখ্যানে কীর্তিত হয়েছে। বিষ্ণু শুলেন। কিন্তু শুয়ে, ফুলে, ফেঁপে তিনি সমগ্র পৃথিবী দখল করে নিয়ে ফিরিয়ে দিলেন দেবতাদের।
এমন ঘটনা একবার নয়। বারবার ঘটেছে। অমৃত লাভের ক্ষেত্রেও ওই একই ঈর্ষা এবং ছলনা কাজ করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস। একটি পুরাণে আমরা অতি অদ্ভুত ব্যাপারও একটা দেখেছি। সেখানে বলা হয়েছে–অসুরেরা ধন্বন্তরির হাত থেকে অমৃত-কলস ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলেন, কিন্তু দেবতাদের প্রাপ্য ভাগ তারা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও অমৃত পান করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার আগেই মোহিনী মায়ার জালে আবদ্ধ হয়েছেন অসুরেরা। মহাভারতের কথায় এই প্রসঙ্গে আগে আমি বলেছি যে, অমৃত এবং লক্ষ্মী–এই দুটি বিষয় নিয়েই দেবতা আর অসুরদের দ্বন্দ্ব চিরতরে শাশ্বতিক এক রূপ নিল-অমৃতার্থে চ লক্ষ্মর্থে মহান্তং বৈরমাশ্রিতাঃ।
তবে অমৃত আর লক্ষ্মীরও আগে যেটা, সেটা হল-ভূমির অধিকার। স্বর্গের অধিকার। আমাদের জিজ্ঞাসা–সেই স্বর্গভূমি কোথায়? আমরা সেই স্বর্গের ঠিকানা চাই।
.
১৬.
খুব সামান্য কথা। দেবতাদের শরীর মানুষের মতোই। তাদের আচার-ব্যবহার ভাব-ভঙ্গিও মানুষের মতো। তাদের বাড়ি-ঘর, বাগান, দুর্গ, রাজসভাও মানুষের মতো। সব কিছুই যখন মানুষের মতো, সেখানে তাদের বাসস্থান স্বর্গভূমিও যে মানুষের থাকবার মতোই একটা জায়গা হবে, সেটা খানিকটা অনুমানযোগ্য।
দেখুন, আমরা এর আগে দার্শনিক তথ্য দিয়ে জানিয়েছিলাম যে, স্বর্গ বলে একটা জায়গার কল্পনা করা হয়েছে বটে, তবে অনেকের মতে মনের প্রীতিকর জায়গাটাই হল স্বর্গ আর তার বিপরীত হল নরক। এ বিষয়ে মহাভারতও একমত হয়েছে। স্বয়ং ভৃগুমুনি সেখানে সদুপদেশ দিয়ে বলেছেন–দেখ, শারীরিক, মানসিক কোনও দুঃখই যেখানে নেই, সেই জিনিসটাকে বলে সুখ। আর সেই সুখ শুধু স্বর্গেই আছে, অন্যত্র নেই–নিত্যমেব সুখং স্বর্গঃ। উপদেশকামী ভরদ্বাজ বললেন, আমরা তো জানি–সেই রকম সুখ-স্বর্গ লাভ করতে হলে তো পরলোকে যেতে হবে। এখানে সেই পরলোক পাব কোথায়? সে পরলোকের কথা যে কেবল শুনেইছি, চোখে তো দেখিনি–অম্মাল্লোকাৎ পরো লোকঃ শায়তে ন তু দৃশ্যতে।
ভৃগুমুনি এবার জিজ্ঞাসু সুজনকে পরলোকের ঠিকানা বলছেন। তিনি বললেন–আছে, আছে। হিমালয় ছেড়ে আরও উত্তরে যাও, সেইখানে সেই পরলোকের সন্ধান পাবে–
উত্তরে হিমবৎপার্শ্বে পুণ্যে সর্বগুণান্বিতে।
পুণ্যঃ ক্ষেম্যশ্চ কাম্যশ্চ স পরে তোক উচ্যতে।
মুনি বললেন–সেখানে পাপী লোকের জায়গা নেই, লোভ নেই কারও, রোগ-শোক ব্যাধির বালাই নেই এবং সেখানে থাকেন যারা তারাও কিন্তু মানুষই–মানবা নিরুপদ্রবাঃ। স স্বর্গসদৃশশা দেশ স্তত্র স্থ্যক্তা শুভা গুণাঃ।
উত্তরে হিমাবৎপার্শ্বে–এই জায়গাটার সম্বন্ধে প্রাচীন ঋষি-মুনি-পৌরাণিকদের একটা নস্টালজিয়া’ আছে। মহাভারতের বিভিন্ন প্রসঙ্গে অনেকেই এই জায়গাটাকে মাঝে মাঝেই স্মরণে এনেছেন এবং তার কারণ নস্টালজিয়া। আমরা যখন এরপরে মহাভারতে মহারাজ পাণ্ডুর পুত্রলাভের প্রসঙ্গে পৌঁছব, তখন দেখব–পাণ্ডু অন্য পুরুষের সম্প্রয়োগে কুন্তীর গর্ভে পুত্রলাভ করতে চাইছেন। কুন্তী মানছেন না, পাণ্ডু তখন উদাহরণ দিয়ে বলছেন–উত্তর-কুরু দেশে এখনও এই নিয়ম আছে–উত্তরেষু চ রম্ভোরু কুরুযু অদ্যাপি পূজ্যতে।
