মেয়েরা যাই বলুক। দক্ষের আত্মাভিমানে লাগল এসব কথা। তিনি আবারও গেলেন জামাই-বাড়ি এবং অভিশাপের ভয় দেখিয়ে সব মেয়েকে সমদৃষ্টিতে দেখার শাসন জারি করে ফিরে এলেন বাড়িতে। মেয়েরা তার কথায় আবার স্বামীর বাড়ি গেল এবং পুনরায় তার একই অপব্যবহার দেখে বাপের বাড়ি ফিরে এল। তাদের এবার রাগও হল খুব স্বামীর ওপরে তো বটেই, বাবার ওপরেও খানিকটা। বারবার স্বামীর ভালবাসা ভিক্ষা করে, বাপকে দিয়ে সালিশি করিয়ে এবং তাতেও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে কোন রমণীর ভাল লাগে! দক্ষ-কন্যারা এবার পিতাকে বললেন-তোমার সোনার চাঁদ জামাই এখনও রোহিণীর ঘরেই বসে আছেন। তোমার কথা শুনতে তার বয়ে গেছে, আমাদের ভালবাসার কোনও দায়ই তার নেই–ন তদ্বচো গণয়তি নাস্পাসু স্নেহমিচ্ছতি। তা তোমার যদি আমাদের বাঁচানোর এতই তাগিদ থাকে, তবে সেই ব্যবস্থা করো, যাতে আমাদের স্বামী আমাদের ভালবাসে।
দক্ষ রাগে দিগবিদিক্-জ্ঞানশূন্য হয়ে পুনরায় জামাতার ঘরে এলেন এবং মুখে কঠিন অভিশাপ উচ্চারণ করলেন তার উদ্দেশে। মহাভারত বলেছে–চন্দ্রকে শাস্তি দেবার জন্য দক্ষ ভয়ঙ্কর যক্ষ্মা রোগের সৃষ্টি করলেন এবং যক্ষ্মা চন্দ্রের শরীরে প্রবেশ করল।
চন্দ্রের যক্ষ্মা রোগের কাহিনী এইটুকুই। হয়তো এই কাহিনীর মধ্যে অন্যতর দুটি বিশ্বাস লুকোনো আছে এবং সেই বিশ্বাসই প্রতিপন্ন হয়েছে রোগগ্রস্ত চন্দ্রমার কাহিনীতে। প্রাচীনরা বিশ্বাস করতেন–অতিরিক্ত স্ত্রী-সম্ভোগের ফলে যক্ষ্মা হয় এবং এই ধারণা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও চালু ছিল। আমাদের ধারণা, এই চিরন্তনী ধারণাই উপাখ্যানের আশ্রয় নিয়েছে রোহিণী-চন্দ্রের নিবিড় সম্ভোগে। আরও একটা বিশ্বাস যা আছে, তা শুধু বিশ্বাস নয়, মাহাত্ম-খ্যাপন। চন্দ্র এই সাংঘাতিক রোগ থেকে পূর্ণ মুক্তি পাননি, কিন্তু খানিকটা যে তিনি সেরে উঠেছিলেন, তা শুধু সরস্বতীর তীরে প্রভাস তীর্থে স্নান করে।
আমাদের পূর্ব প্রস্তাব অনুসারে চন্দ্রের যক্ষ্মা রোগটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল–দেবতাদেরও মানুষের মতোই রোগ-শোক আছে, এমনকি রোগ যে সারে না, তাও দেখা। গেল ওই চন্দ্রের ক্ষেত্রে। অমাবস্যা থেকে চন্দ্রের যে একেকটি কলা বৃদ্ধি হতে থাকে, তার কারণ সরস্বতী-প্রভাসে অমাবস্যার দিন নাকি চন্দ্র তার রোগ মুক্তির জন্য স্নান করেছিলেন এবং সেইদিন থেকে পনেরো দিন তিনি ভাল থাকেন, তার শরীরটিও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু পূর্ণিমার দিন তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখা গেলেও আবার তার শরীর শুকোতে থাকে। ফলে পরের অমাবস্যায় আবার তাকে তীর্থ-স্নান করতে হয়। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি–সরস্বতীর তীর্থে স্নান করে চন্দ্র তার শরীরে দীপ্তি অর্থাৎ প্রভা ফিরে পেয়ে জগৎ আলো করেছিলেন বলেই ওই তীর্থের নাম প্রভাস।
যাই হোক, চন্দ্রের পুরো রোগ মুক্তি হল না। সাংখ্যকারিকার টীকাকার মন্তব্য করলেন–নৈনং যক্ষ্মাদমুঞ্চৎ–যক্ষ্মা চন্দ্রকে ছাড়েনি। ইন্দ্র, প্রজাপতি ব্রহ্মা, চন্দ্র–এই সমস্ত মহান দেবতা যেখানে সামান্য রোগ-শোকই এড়াতে পারছেন না, সেখানে মরণ যে তাদের হবেই সে কথা আর বেশি করে বলার কী আছে। দেবতাদের মরণকাল ঘনিয়ে এলে তাদের শরীরে কী কী দুর্লক্ষণ দেখা যায়–সাংখ্য দার্শনিকেরা তার একটা তালিকাও দিয়েছেন। বস্তুত, বিভিন্ন পুরাণেও আমরা দেখেছি যে, দেবলোক থেকে চ্যুত হওয়ার সময় দেবতাদের দিন বড় দুঃখে কাটে, এবং এই শেষের দিনটির কথা ভেবে তারা রীতিমতো ভয়ও পান।
দেবতাদের জরা-মরণ নিয়ে আর কোনও গভীর তত্ত্ব আমরা শোনাব না। কারণ আমাদের মতে তারা মানুষেরই নামান্তর। তবে একই সঙ্গে জানাই অসুর-রাক্ষস অথবা দৈত্য-দানবেরা কিন্তু দেবতাদেরই জাত ভাই। তারা একই বাপের ছেলে। বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে যেমন ছেলেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, মামলা চলে, দেবতা আর অসুরদের মধ্যে সম্বন্ধটাই ওই একইরকম। স্বর্গের সম্পত্তি নিয়ে দুই বৈমাত্রেয় ভাইদের ঝগড়া। মামলার দরকার হলে দুই পক্ষই ব্রহ্মাকে সাক্ষী মানতেন। এঁদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। হার-জিৎ দুই পক্ষেই প্রায় সমান। আর যদি কালচারের কথা তোলেন, তো বলি–সে জিনিসটা অসুর-রাক্ষসদের বড় কম ছিল না। এরা প্রত্যেকে ভাল রকম সংস্কৃত জানতেন। সমুদ্রমন্থনের সময় বাসুকির পৃচ্ছদেশ ধরবার প্রস্তাবে দৈত্যরাজ বলির প্রতিক্রিয়া স্মরণ করুন। অপিচ বাল্মীকি রামায়ণে স্বয়ং রাক্ষসরাজ রাবণের সংস্কৃত এবং বেদে অধিকার লক্ষ্য করুন ভাল করে।
তবে মুশকিল একটা ছিল। প্রজাপতি কশাপের এই দৈত্য-রাক্ষস পুত্রেরা যেহেতু স্বর্গের অধিকার ভাল করে কোনও দিনই পাননি, তাই হঠাৎ হঠাৎ লুটপাট, নরহত্যা, নারীহরণ, ধর্ষণ–এইসব বদগুণ তাদের মধ্যে বেশি এসে গিয়েছিল। মহামতি গিরীন্দ্রশেখর বসু তাই কুত্রাপি অসুর রাক্ষসদের ‘গুণ্ডা’ বা ‘ডাকাত’ বলে সম্বোধন করেছেন। আজকাল রাষ্ট্রীয় নেতারা যেমন অনেক অসামাজিক কাজ নিজে করতে পারেন না বলে গুণ্ডা লাগান, সেকালেও তেমন ছিল। স্বয়ং বিশ্বামিত্র মুনি রাক্ষস লাগিয়ে ব্যাস পিতা পরাশরের বাবা শক্ট্রিকে হত্যা করিয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মানতে হবে মহাভারত এবং পুরাণে অতি উৎকৃষ্ট গুণের অসুর-রাক্ষসেরও অভাব নেই কোনও।
