সাংখ্যের যুক্তিদীপিকার লেখক রীতিমতো বেদের প্রমাণ দিয়ে বলেছেন–জানেন, এই যে ইন্দ্র, তাঁর একবার প্রচণ্ড অনিদ্রা রোগ হয়েছিল। দিনে-রাতে কখনই তার ঘুম আসে না। তিন ভুবনে এমন বৈদ্য-চিকিৎসক ছিলেন না, যাঁরা ইন্দ্রের অনিদ্রা রোগ সারানোর জন্য চেষ্টা করেননি। দিন দিন তিনি রোগা হয়ে যেতে লাগলেন। শেষে ঋষিরা তাঁকে ‘ত্বাষ্ট্রীয়’ সামগান শোনাতে আরম্ভ করলেন। সামগানের মধুর শব্দের ইন্দ্রে অনিদ্রা রোগ সেরে গেল–ইং ক্ষামমপি ন সর্বভূতানি প্রস্বাপয়িতুং নাশকুব। তমেতেন সাম্না ত্বষ্ট্ৰীয়েণ অস্বাপয়ৎ।
আমরা বলব-বেদের প্রমাণ তো আর অস্বীকার করতে পারব না। কিন্তু ওই একটা উদাহরণ থেকে কীই বা বোঝা যায়? সাংখ্য-কারিকার টীকাকার বলবেন–শুধু কি ইন্দ্র! স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মর শরীর শুকিয়ে গিয়েছিল বায়ু-রোগে। আর চন্দ্র, তিন ভুবনকে স্নিগ্ধ আলোর জ্যোৎস্না-ধারায় স্নান করিয়ে দেন যিনি, তার যে কঠিন যক্ষ্মা হয়েছিল-প্রজাপতে বায়ু-রক্ষয়ীৎ, দক্ষাভিশাপাচ্চ সোমস্য ক্ষয়ঃ।
কথাটা শুনেই অবহিত হয়ে বসতে হবে আমাদের। দু’দণ্ড পরেই মহাভারতে শান্তনু, ভীষ্ম অথবা কুরু-পাণ্ডবের কত কাহিনী শুনব। কিন্তু কুরু-পাণ্ডবের বংশের নামই যে চন্দ্র-বংশ। মহামান্য দেবতাদের অন্যতম যে চন্দ্র, তিনিই তো কুরু-পাণ্ডবের বংশ-মূল, তার আবার যক্ষ্মা হল কবে? তিনি কি আমাদের মতো মানুষ নাকি, যে যক্ষ্মায় কাবু হবেন তিনি! দর্শনের টীকাকার বলবেন–আমাদের মতো সাধারণ মানুষ না হলেও স্বর্গভূমিতে বসে তার এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হয়নি। অর্থাৎ দেবতা হলেও রোগ-ভোগের কষ্ট থেকে তার পরিত্রাণ নেই। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, মানুষের তুলনায় তিনি কিছু বড়-মানুষ বটে, হ্যাঁ তার, জ্ঞান-ঐশ্বর্য মানুষের থেকে বেশ খানিকটা উঁচু স্তরের বটে, কিন্তু বোগ-শোক, জরা-মরণ তারও আছে।
আমরা চমকিত হয়ে বলব–কুরু-পাণ্ডব বংশের প্রথম জনক মহান চন্দ্র দেবতার এই গুরুতর অস্পৃশ্য অসুখের কথা কি মহাভারতের মধ্যে পাব? তাহলে তো আগে-ভাগে সেই অসুখের খবরটাই নেওয়া দরকার। একটি রোগগ্রস্ত অসুস্থ দেবতার খবর মহাভারতের মধ্যে পেলে একদিকে যেমন দেবতার মনুষ্য-ধর্মিতা জরা-মরণশীলতা আমাদের কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য হয়ে উঠবে, তেমনই অন্যদিকে কুরু-পাণ্ডব বংশের প্রথম প্রতিষ্ঠাতার প্রতি কিছু সমবেদনাও জানানো সম্ভব হবে এই সুযোগে। ঘটনাটা ছিল এইরকম।
প্রজাপতি দক্ষের সাতাশটি মেয়ে ছিল। অশ্বিনী, ভরণী, কৃত্তিকা–ইত্যাদি নামে যে সাতাশটি নক্ষত্রের নাম আমরা জানি, দক্ষের মেয়েরা হলেন এই সাতাশ নক্ষত্র-সুন্দরী। দক্ষ এই সাতাশটি মেয়েকে এক সঙ্গে চন্দ্রের হাতে সম্প্রদান করলেন- সপ্তবিংশতিং কন্যাং দক্ষঃ সোমায় বৈ দদৌ। দক্ষের সাতাশ মেয়ে সাতাশ জন নক্ষত্র সুন্দরীরূপে-গুণে তারা কেউ কম নন। কিন্তু এদের মধ্যে রোহিণী ছিলেন সবচেয়ে সুন্দরী–অত্যরিচ্যত তাসান্তু রোহিণী রূপ-সম্পদা। সে সৌন্দর্য এমনই অপ্রতিম যে, চন্দ্র তাঁর রূপের মোহে তার অন্য স্ত্রীদের অবহেলা করতে লাগলেন। সব সময় তিনি রোহিণীর ঘরেই পড়ে থাকেন, রোহিণীকেই ভালবাসেন, রোহিণী ছাড়া তিনি আর দ্বিতীয় কিছু জানেন না। চন্দ্রের এই আচরণে অন্য নক্ষত্র সুন্দরীরা সবাই ভীষণ রেগে গেলেন। নিজেদের সহোদরা বোনটি হলে কী হয়, স্বামীর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হতে কার ভাল লাগে!
ছাব্বিশ নক্ষত্র-সুন্দরী স্বামীর ওপর অভিমান করে এক সঙ্গে দল বেঁধে বাপের বাড়ি চলে এলেন। পিতা দক্ষের কাছে সকলে মিলে নালিশ করলেন-দেখ বাবা এত তোড়জোড় করে তুমি চন্দ্রের সঙ্গে আমাদের বিয়ে দিলে, কিন্তু স্বামী আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। তারা যত সোহাগ সব ওই তোমার আদরের মেয়ে রূপেশ্বরী রোহিণীর ওপর। সব সময় তাঁর আঁচল ধরে ঘুরছে–সোমা বসতি নাস্পাসু রোহিণীং ভজতে সদা। দক্ষের ছাব্বিশটি মেয়ে বাপের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ল। বলল–কী হবে আর ওই স্বামীর বাড়ি থেকে। আমরা আজ থেকে এখানেই থাকব, নুন-ভাত যা জোটে খাব, দেখব–কবে তার সময় হয়-বৎস্যামো নিয়তাহারা স্তপশ্চরণতৎপরাঃ।
দক্ষ মনে মনে প্রমাদ গুণলেন। এত গুলি মেয়ে একসঙ্গে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে, এবং এসেছে তাদেরই এক ভগিনীর প্রতি নির্মম ঈর্ষায়। দক্ষ সোজা জামাই-বাড়ি গিয়ে চন্দ্রকে বললেন–এ তোমার কেমন ব্যবহার? আমার সাতাশটি মেয়েকে তুমি এক সঙ্গে বিয়ে করেছ অথচ সবার দিকে তুমি একরকম করে তাকাও না। এ তোমার কেমন ব্যবহার? সবাইকে তুমি সমানভাবে দেখ। সাতাশটি স্ত্রীর মধ্যে শুধু একতমার প্রতি এই নিদারুণ পক্ষপাত কি ধর্মে সইবে বলে মনে কর–সমং বর্তস্ব ভার্যাসু মা ত্বধর্মো মহান্ স্পৃশে। স্নেহময় পিতা ফিরে এসে মেয়েদের বললেন–এবার স্বামীর বাড়ি যাও, মা-জননীরা। আমি জামাইকে খুব শাসন করে এসেছি। সে এখন সবাইকে সমান দেখবে।
বাবার কথা শুনে দক্ষ-কন্যারা আবার হই-হই করে চন্দ্রের গৃহে উপস্থিত হল। কিন্তু কোথায় কী! চন্দ্র যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। সেই রোহিণী। সেই রোহিণী। তাকেই তিনি ভালবাসেন, তাঁকে নিয়েই তাঁর দিন-রাত কাটে। দক্ষকন্যারা আবার ফিরে এলেন বাপের বাড়ি। এবারে আর নতুন অভিমানে তারা কেঁদে বুক ভাসালেন না। বরং ঠান্ডা মাথায় তারা পিতা দক্ষকে বললেন-বাবা, তোমারও তো বয়স হয়েছে। জীবনের যে কটা দিন আছে, আমরা তোমার সেবা শুশ্রূষা করে কাটিয়ে দিতে চাই। আমরা এখানেই থাকব, বাবা–তব শুশ্রষণে যুক্তা বৎস্যামো হি তবাশ্রমে দক্ষ-কন্যারা এবার নিরুত্তেজিতভাবে বাবা দক্ষকে জানালেন–তুমি তো সেই এত করে বলে এলে। সে তোমার কথা শুনলে তো? সে যা হোক, আমরা আর ফিরে যাচ্ছি না।
