বলেছেন–আমরা নিজেদের কথা বলছি না, তত্তদশী ঋষিরাই এই কথা বলেন। তারা বলেন, মানুষের শরীর, আকার অথবা চেহারা যেমন, দেবতাদেরও প্রায় তাই
মানুষস্য শরীরস্য সন্নিবেশস্তু যাদৃশঃ।
তক্ষণন্তু দেবানা দৃশ্যতে তত্ত্বদর্শনাৎ৷৷
তবে কিনা মানুষের বুদ্ধি যত, দেবতাদের বুদ্ধি তার থেকে অনেক বেশি–বুদ্ধতিশয়যুক্ত দেবানাং কায়মুচ্যতে। লক্ষণীয় বিষয় হল, শুধু দেবতা নয়, বুদ্ধির আতিশয্য জিনিসটা অসুর-রাক্ষসদেরও যথেষ্ট পরিমাণ আছে এবং তা মানুষের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ অসুর-রাক্ষস-নাগরাও কিন্তু মানুষের চেয়ে উচ্চ স্তরের জীব। এই ধারাণাটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন সাংখ্য-দর্শনের প্রবক্তা ঈশ্বরকৃষ্ণ। পরে আসছি সে কথায়।
০১৫. ভীষ্ম তখনও শরশয্যায়
১৫.
ভবিষ্যতের কথা এখনই প্রসঙ্গত এসে গেল। পিতামহ ভীষ্ম তখনও শরশয্যায় শুয়ে আছেন। আর যুধিষ্ঠির তার ভাইদের সঙ্গে কৃষ্ণের সঙ্গে ঘিরে বসে আছেন। শরশয্যায় শুয়ে শুয়েই ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। রাজনীতি, ধর্মনীতি, দেবতা, অসুর–কত কথাই না আসছে। প্রশ্নের পর যুধিষ্ঠির হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা ঠাকুরদাদা! তুমি তো সব শাস্ত্রই জান। তো আমার একটা কথার উত্তর দাও। আমার প্রশ্ন–এ জগতে দৈবই বড়, না, পুরুষকার বড়?
পিতামহ ভীষ্ম কষ্ট-ক্লমহীন নীরোগ মানুষটির মতো বলে উঠলেন–আরে! ঠিক এই প্রশ্নই তো স্বয়ং বশিষ্ঠমুনি করেছিলেন পিতামহ ব্রহ্মাকে। ব্রহ্মা জ্ঞানী-গুণী মানুষ। চতুর্বেদ তার কণ্ঠভূষণ। সেখানে ব্ৰহ্ম যেমন করে প্রশ্নটার উত্তর দিয়েছিলেন, সেটাই তুমি শোনো। ব্রহ্মা বলেছিলেন-বীজ ছাড়া শস্য হয় না, বীজ ছাড়া ফলও হয় না। বীজ থেকেই বীজ। বীজ থেকেই ফল। একজন কৃষক ক্ষেতে যে ধরনের বীজ ছড়ায়, সেই রকমই শস্য পায়। খুব খানিকটা হাল চালিয়ে ক্ষেতটাকে বীজ ছড়ানোর উপযুক্ত করা হল, তারপর ধর, বীজটাই বপন করলাম না। তার ফল কী? জমিটা নিষ্ফলা যাবে। ঠিক তেমনই পুরুষকার ছাড়া দৈবও কিছু করতে পারে না। ক্ষেত হল দৈব, বীজ হল পুরুষকার।
ব্রহ্মা ক্ষেত্র-বীজের কথা বলেই মানুষের জীবনে চলে এলেন। বললেন–যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাল কাজ করো, ভাল ফল পাবে। পুণ্যের কাজ করো সুখ পাবে। পাপের কাজ করো, দুঃখ পাবে। যে লোক কাজ করে, খাটে, সে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবে না, ভাগ্য তাকে সহায়তা করবে না–এ হতেই পারে না-কৃতী সর্বত্র লভতে প্রতিষ্ঠাং ভাগ্যসংযুতা। তুমি কাজ করো, সৌভাগ্য তোমার হাতের মুঠোয়, শুধু দৈব নিয়ে বসে থাকলে হবে না। পুরুষকার প্রয়োগ করো, ভোগ, সুখ স্বর্গ–তুমি যা চাও তাই পাবে–প্রাপ্যতে কর্মর্ণা সর্বং ন দৈবাদকৃতত্মনা।
ব্রহ্মা জীবনের কথা ছেড়ে এবার বাস্তব উদাহরণে আসছেন। তিনি বললেন–এই যে চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা, এত সব দেবতা, নাগ, যক্ষ–এরা সবাই মানুষ ছিলেন, কিন্তু শুধু পুরুষকারের দ্বারা এঁরা দেব-পদবি লাভ করেছেন-সর্বে পুরুষকারেণ মানুষ্যাদেবতাং গতাঃ।
দেখুন, দৈব কিংবা পুরুষকারের যে বিতণ্ডা, তাতে আমি একটুও আগ্রহী নই। আমার আগ্রহ শুধু একটা কথা নিয়ে–সবাই মনুষ্যভাব থেকে দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন–মানুষ্যা দেবতাং গতাঃ–শুধু এই কথাটুকুই আমার দরকার। উপরের শ্লোকটিতে দেবতা, নাগ, যক্ষের কথা বলা আছে, কিন্তু দৈত্য-দানবের কথা বলা নেই। নেই যে, তার বড় কারণ কিছু নেই। আসলে দেবতা, দৈত্য, দানব, যক্ষ, রাক্ষস নাগ–এঁরা সব এক পিতার পুত্র। মহাভারতের কবির বাঁধা কথাটা যেটা প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়, তা হল
দেব-দানব-গন্ধর্বা দৈত্যাসুর-মহোরগাঃ।
যক্ষ-রাক্ষস-নাগাশ্চ পিশাচা মনুজা স্তথা।
মহাভারতের কবি যে মোটামুটি একটা ক্রম দিলেন, এই ক্রমটাই পরবর্তীকালে দার্শনিক বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
সাংখ্য-দর্শনের প্রবক্তা ঈশ্বরকৃষ্ণ লিখেছেন–দেব-শরীর আট রকমের–অষ্টবিকল্লো দৈবঃ। তারা কারা? টীকাকার লিখলেন ব্রহ্মা, প্রজাপতি, ইন্দ্র, পিতৃগণ, গন্ধর্ব, নাগ, রাক্ষস এবং পিশাচ। পিশাচ থেকে ধরে একেবারে ব্রহ্মা পর্যন্ত– এঁরা পরপর উঁচু স্তরের জীব। এরা দেবযোনি, যেহেতু এঁদের মধ্যে সত্ত্বগুণ বেশি। কিন্তু এই সত্ত্বগুণটাও পিশাচের চেয়ে রাক্ষসের মধ্যে বেশি, রাক্ষসদের থেকে নাগদের মধ্যে বেশি। এইভাবে ব্রহ্মা পর্যন্ত,-যেটাকে শঙ্করাচার্য। বলেছেন–জ্ঞান এবং ঐশ্বর্যের প্রকাশটা এদের মধ্যে পরপর বেশি–পরেণ পরেণ ভূয়সী ভবতি।
কঠিন কথা বলে আরম্ভ করেছি, তাই বলে কঠিনভাবেই চালিয়ে যাব না। আমাদের কথাটা হল-ইন্দ্র এবং অন্যান্য দেবতারা তথা অসুর-রাক্ষস-নাগ-গন্ধর্বরা–এদের জন্ম-পদবি এক –এরা সকলেই দেবতা, দেবযোনি। এঁদের কেউ বেশি ভাল, কেউ একটু মন্দ। কিন্তু দেবতা হওয়া সত্তেও এরা যে মনুষ্যধৰ্ম অতিক্রম করে গেছেন, তা মোটেই নয়, সাংখ্যের দার্শনিক লিখেছেন-জরা-মরণের কষ্ট দেবতাদেরও আছে। তবে তা একটু অন্যরকম। মানুষের যেমন–গায়ের রং পুড়ে গেল, দাঁত পড়ে গেল, লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারি না–ঠিক এমনটা না হলেও দেবতাদেরও বার্ধক্য কিংবা মরে যাবার কষ্ট আছে–সচ দেবভূমাবপি ভবতি।
আমরা বলি–সে আবার কী? সারা জীবন কত শুনেছি–এই মর্ত্যভূমিতে জন্মেই যত কষ্ট! সেই মাতৃগর্ভে জন্ম থেকে কষ্ট আরম্ভ হয়, তারপর কিছুদিন ভালয়-মন্দে যেতে না যেতেই বার্ধক্য শুরু হয়ে গেল, আরম্ভ হল রোগ-ভোগ, তারপর মৃত্যু তো আছেই। দার্শনিক বললেন–স্বর্গের দেবতাদের যত সুখ ভাবছ, তত সুখ মোটেই নয়। হ্যাঁ, জন্মের ব্যাপারটায় দেবতাদের অত কষ্ট নেই সত্যি, কারণ দেবতাদের জন্ম নাকি-তড়িদবিলসিতবৎ-চক্ষের নিমেষে তারা জন্ম নিতে পারেন, কিন্তু তাই বলে দেবভূমিতে রোগ-শোক নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই–এমনটি মোটেই নয়।
