দেবতাদের শরীর আছে, কি নেই–এই নিয়ে যাস্কের সময়েই দু’রকম মত ছিল। এক পক্ষ বলতেন, দেবতাদের দেখতে হয়তো মানুষের মতোই–পুরুষবিধাঃ সুরিত্যেক। আর অন্যরা বলেন, মোটেই তা নয়। দেবতাদের শরীর-টরীর কিছু নেই। তারা সব আকাশস্থ অদৃষ্টির জীব। মানুষের মনোলোকেই তার প্রতিমা। যারা ভাবেন-দেবতার শরীর নেই, যাস্ক তাদেরকে ঠেলে ফেলে দেননি ঠিকই, কিন্তু তার নিজের পক্ষপাতটা যেন শরীরবাদীদের দিকেই, যদিও শেষ পর্যন্ত অশরীরবাদীদের কথা বলে তিনি দুই মতই স্বীকার করে নিয়েছেন–অপি বা উভয়বিধাঃ স্যুঃ। বৈদিক দেবতাদের শরীর এবং ক্রিয়াকাণ্ড মানুষের মতো বলেই যাঁরা ভাবেন, তাদের কতগুলি যুক্তি আছে। যুক্তিগুলি যাস্ক যেভাবে সাজিয়েছেন আমি তা এক এক করে বলছি।
প্রথম কথা হল, ঋষিরা সমস্ত বেদের মন্ত্রবর্ণের মধ্যে দেবতাদের এমন ভাবে স্তুতি করেছেন, যাতে মনে হবে দেবতাদের মানুষের মতোই চেতনা আছে। আর চেতনা যাঁদের আছে, তাদের শরীর থাকবে না? এও কি কোনও কথা? বলতে পারেন–চেতনা তো গোরু-ঘোড়রও আছে, তাহলে দেবতাদের গোরু-ঘোড়ার মতোও দেখতে হতে পারে। যাস্ক বললেন, বাবা! ওই জন্যই আগে বলেছি–দেবতাদের হয়তো মানুষের মতোই দেখতে হবে–পুরুষবিধাঃ স্যুরিতি। গোরু-ঘোড়ার তো আর হিতাহিত বোধ নেই, কাল কী হবে–বোধ নেই, কাজেই ওই রকম চেতনার কথা আমরা বলছিও না। মানুষের যেমন চেতনা, মানুষের যেমন কাজকর্ম দেবতাদেরও তেমনই হওয়া সম্ভব। নইলে দেবতাদের উদ্দেশে বেদের অর্ধেক স্তুতি-সূক্ত উন্মত্তের প্রলাপ বলে মনে হবে।
পরিচিত ব্যক্তি বাড়িতে এলে আমরা যেমন বলি–আসুন, বসুন, তামাক খান, তেমনই ঋষিদের মুখে শোনা যাবে-ইন্দ্র! তুমি এস এস। এই কুশের আসনে বস, সোমরস তৈরিই আছে–পান কর–আ যাহি সুষমাহিত ইন্দ্র সোমং পিবা ইম। এদং বহিঃসদে মম। স্তুতির ভাষায় এই অভিবাদন-অভিনন্দনের মাত্রাটা চেতন মানুষের প্রতিরূপ কোনও চেতন শরীরী দেবতার উদ্দেশেই ব্যবহার করা যায়। নইলে বলতে হয়–যিনি এই অভিবাদন করছেন, তিনি পাগল। ঋগবেদের প্রায় প্রতিটি সূক্তেই ঋষিরা ইন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, সূর্য ইত্যাদি দেবতার উদ্দেশে–এস’, যাও’, ‘খাও’, ‘পান কর’, ‘আমাদের শত্রু জবাই কর’, ‘আমাদের এটা দাও, সেটা দাও’–ইত্যাদি ভাব ব্যক্ত করে দেবতাদের চেতন সত্তা মেনে নিয়েছেন-চেতনাবদ্ভিঃ স্বতায়ো ভবন্তি।
যাস্ক তার দ্বিতীয় যুক্তি সাজিয়েছেন দেবতাদের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে। তিনি বলেছেন, বেদের মন্ত্রের মধ্যে দেবতাদের হাত, পা, চোখ, মুখ, কান-সব কিছুরই বর্ণনা আছে মানুষের মতো করেই। ইন্দ্রের বলিষ্ঠ বাহুর ওপর নির্ভর করে স্তুতিকারী ঋষিরা নির্ভয়ে জীবন কাটাতে চেয়েছেন-ঋম্বা ত ইন্দ্র স্থবিরস্য বাহু উপ স্বেয়াম শরণা বৃহন্তা। একই শরীরে বেদ-বর্ণিত আদিত্য সূর্যের ভাস্বর মুখ, সবিতা-সুর্যের হিরণ্যহস্ত আর মিত্রের চক্ষুকে সন্নিবেশ করলে যে দেব-পুরুষের রূপ বৈদিকদের হৃদয়গোচর হয়েছিল, বস্তুত সেই রূপই পরবর্তী কালে পাণ্ডবজননী কুন্তীরও নয়নগোচর হয়েছিল। ইন্দ্রের বজ্রমুষ্টির আশ্রয় গ্রহণ করাটাকে যদি একটা রূপকের মতো ধরে নিই–যদি ধরে নিই শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই তার বজ্রমুষ্ঠির কথাটা কল্পনা করেছেন ঋষিরা, তাহলে ইন্দ্রের হনু-দুটিকে নিশ্চয় শত্রুদমনে রূপক বলে ভাবা যাবে না। অথচ ইন্দ্রের মুষ্টির মতো তার হনুর প্রশংসাও তো কিছু কম নেই বেদে-মৎস্বা সুশি হরিবস্তদীমহে ত্বে আর ভূষন্তি বেধসঃ। আর শুধু, ইন্দ্র অথবা সূর্যই নয়, অগ্নি, অশ্বিনীকুমার, বায়ু–এই সব দেবতারই নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বর্ণনা থাকায় দেবতার শরীরবাদীরা বলেছেন দেবতার চেহারা মানুষের মতোই হবে।
দেবতাদের যান-বাহন, বাড়ি-ঘর, দুর্গের কথাও বেদের মধ্যে অনেক পাওয়া যাবে। পাওয়া। যাবে নানা ধরনের ক্রিয়া-কাণ্ড-খাওয়া, পান করা, যুদ্ধ করা, বধ করা, অশ্ব অথবা রথ-চালনা করা, বাঁশি বাজানো, গর্জন করা ইত্যাদি। এতগুলি মনুষ্যোচিত ক্রিয়াকলাপ দেখে বৈদিকরা অনেকেই দেবতার শরীরে বিশ্বাস করেছেন।
ভারি আশ্চর্য ব্যাপার হল, শুধু বৈদিকদের একাংশমাত্রই নয়, দেবতাদের বিশিষ্ট শরীরের অস্তিত্ব নিয়ে বৈদান্তিকরাও কম মাথা ঘামাননি। স্বয়ং শঙ্করাচার্য, যিনি নিরাকার-নির্বিশেষ ব্রহ্ম ছাড়া কিছুই মানেন না, তিনি পর্যন্ত বলেছেন, দেবতাদের রূপ আছে, শরীরও আছে। সেরকম না হলে আমরা একেকজন দেবতা সম্বন্ধে কোনও ধারণাই করতে পারতাম না–ন হি স্বরূপরহিতা ইন্দ্রাদয়ঃ চেতসি আরোপয়িতুং শক্যন্তে। আমাদের কাছে যেটা বড় প্রয়োজন, সেটা হল–দার্শনিক শঙ্কর দেবতার শরীর স্বীকার করে নেওয়ার জন্য যে উদাহরণটি দিয়েছেন, সেটা মহাভারতের উদাহরণ। কন্যাবস্থায় কুন্তীর সানন্দ সপ্রেম আহ্বান লাভ করে সূর্য যে তার বাহুপাশে ধরা দিয়েছিলেন, এই ঘটনাটাই দেবতার শরীর-প্রমাণে সাহায্য করেছে শঙ্করকে।
তবে মানুষের সঙ্গে দেবতাদের তুলনা দিতে গিয়ে শঙ্কর বলেছেন–দেবতারা মানুষের মতো জীবই বটে, তবে তারা উন্নত শ্রেণীর জীব। ক্ষমতায়, বুদ্ধিতে এবং ঐশ্বর্যে তারা মানুষের চেয়ে অনেক বড়। ঠিক এই কথাটাই অন্যভাবে বলেছেন পৌরাণিকেরা। পৌরাণিক
