দানবরাজ বলি এবার তত্ত্বকথা বলতে আরম্ভ করলেন। সুখে স্পৃহা নেই, দুঃখে মন অনুদ্বিগ্ন, সমস্ত পার্থিব সুখেরই শেষ আছে-অতএব গাধার মতো জীবন যাপন করেও বলির মনে কোনও দুঃখ নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি। সুখ এবং দুঃখ-দু’য়েরই স্বরূপ তিনি জানেন। অতএব বলি দুঃখ পান না–যদেবমভিজানাসি কা ব্যথা মে বিজানতঃ! বলি বিরাট আলোচনা করলেন মহাকাল নিয়ে। মানুষের ভাল-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, সমৃদ্ধি-পতন, জয়-পরাজয়–সবই মহাকালের ছন্দে বাঁধা আছে। বলি বললেন, আজকে আমি গাধা হয়ে তুষ খাচ্ছি বলে আপনি পরিহাস করছেন, কিন্তু আপনিও বেশি পৌরুষ দেখাবেন না-মা কৃথাঃ শক্র পৌরুষম। আপনি যে আজকে ভাল অবস্থায় আছেন–এটা আপনি করেননি। আবার আমি যে এখানে গাধা হয়ে আছি–এটাও আমি করিনি–নৈতদস্মৎকৃতং শত্রু নৈতচ্ছ ত্বয়া কৃত। যে করেছে, সে হল মহাকাল, তার হাত থেকে রেহাই নেই কোনও।
বলি এবার একটা লৌকিক উপমা দিলেন। বললেন, কত সুন্দরী সুলক্ষণা রমণীকে দেখি, কী খারাপ ভাগ্য তাদের, কী কষ্টেই না তারা থাকে। আবার কুৎসিত কুরূপা কত মহিলা পরম সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তাও দেখি। মহাকালের কাজটাই এইরকম। সমস্ত চরাচরে প্রাণীরা যে গতি লাভ করে, সেই গতি আপনি এড়িয়ে যাবেন কোথায়–গতিং হি সর্বভূতানামগত্বা ক গমিষ্যতি?
বৈরোচন বলি ইন্দ্রকে ভালরকম চেনেন। অমৃত-মন্থন থেকে আরম্ভ করে অনেক ক্ষেত্রে তার সঙ্গে ইন্দ্রের দেখা হয়েছে। দুজনেই পৃথিবীকে দেখেছেন, চিনেছেন অনেক। কিন্তু ইন্দ্র যেভাবে যেচে বলিকে নানা কথায় পরিহাস করেছেন, বলি তার জবাব দিচ্ছেন একটু একটু করে। বলি বললেন, আগেও যেমন আপনার ছেলেমানুষি দেখেছি, এখনও দেখছি আপনি সেইরকমই ছেলেমানুষ আছেন–কৌমারমেব তে চিত্তং যথৈবাদ্য তথা পুরা। আরে, আমাকে তো আপনি এককালে দেখেছেন। দেবতা, গন্ধর্ব, রাক্ষস, নাগ, মানুষ, সকলেই আমার শাসনে ছিল। এমনকি আমি যে দিকে দাঁড়িয়ে থাকতাম, শুত্রুরা সে দিকটাকেই নমস্কার করে বলত–যে দিকে বৈরোচন বলি রয়েছেন, সেই দিককে নমস্কার–নমস্তস্যৈ দিশে’পস্তু যস্যাং বৈরোচনো বলিঃ।
বলি নিজের উদাহরণ দিয়ে ইন্দ্রকে বোঝালেন–আর আজকে আমার অবস্থা দেখছেন তো? বসে বসে তুষ খাচ্ছি। সেইরকম আপনিও যেমন আজকে রাজলক্ষ্মীর অধিকার লাভ করে ভাবছেন যে, তিনি আপনার কাছে আছেন–ও ধারণাটা মিথ্যে। সম্পূর্ণ মিথ্যে–স্থিতা ময়ীতি তস্মিথ্যা। বলি এবার কেটে কেটে বললেন, আরে! আপনার চেয়ে গুণী আরও হাজারটা ইন্দ্র আগে চলে গেছেন। এই রাজলক্ষ্মী তাদের কাছেও ছিলেন, তারপর আমার কাছেও ছিলেন, আবার এখন গেছেন আপনার কাছে, কাজেই মাথাটা বেশি গরম করবেন না, এত
মেজাজও দেখাবেন না–মৈবং শক্র পুনঃ কাষীঃ শাস্তো ভবিতুমহসি। শুধু মনে রাখবেন আপনার আগে আপনার মতো আরও হাজারটা ইন্দ্রের জমানা চলে গেছে এবং তারা কেউ শক্তি বা ক্ষমতায় আপনার চেয়ে কোনও অংশে কম ছিলেন না–
বহুনীসহস্রাণি সমতীতানি বাসব।
বলবীর্যোগপন্নানি যথৈব ত্বং শচীপতে।
মহাভারতে বলি-বাসব-সংবাদ যেমনটি আছে, আলোচনা বেশ বড়, তত্ত্বও অনেক গভীর। সম্পূর্ণ অধ্যায়টিকে ছোট করে আমি আপনাদের একটা ধারণা দিতে চেয়েছি এবং তার উদ্দেশ্য একটাই। দানবরাজ বলির জবানিতে আমি শুধু দেখাতে চাইলাম যে, দেবতারা বিষ্ণু-স্বরূপিনী মোহিনীর নবীন-নবনীনিন্দিত হস্ত থেকে যতই অমৃত পান করে থাকুন, দেবতারা কেউ অমর নন। এমনকি এই প্রসঙ্গে অমর শব্দটার গুঢ়ার্থও কিছু বোঝা যেতে পারে। পৌরাণিকেরা কথাত্তরে বলেছেন, আমাদের এই সংসার-যাত্রা কোনকালে আরম্ভ হয়েছে, তা যেহেতু জানি না, অতএব সংসারচক্রকে আমরা অনাদি বলি, কিন্তু দেহ আছে যাদের, তাদের দীর্ঘ জীবন কখনওই দেখি না–ন হ্যস্য জীবিতং দীর্ঘং দৃষ্টং দেহে তু কুচিৎ। কেউ বালক বয়সেই মরে যাচ্ছে, কেউ বা একশো বছর বেঁচেও থাকছে। কিন্তু একশো বছর যে বেঁচে আছে, তাকে যে লোকে ‘অনন্ত’জীবী বলে, তা কিন্তু অল্পজীবীদের তুলনায়। আর একশো বছর বেঁচেও যে মরল না, যাকে দেখে মনে হয়–কী দীর্ঘ আয়ু! আহা এঁর বুঝি মরণ নেই, ইনি বেঁচেই থাকবেন, তাকেই লোকে ‘অমর’ বলে–জীবিতো ন ম্রিয়ত্যগ্রে তস্মাদ অমর উচ্যতে। এই নিরিখে দেবতারাও কেউ অমর নন। তাদের জন্ম-মৃত্যু সবই প্রায় মানুষের মতোই।
বলা যেতে পারে–এ তো মানুষের কথা হল। মানুষের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী, তাদের কথাপ্রসঙ্গে আমরা অনেক সময় বলি–উনি অমর। স্বর্গের দেবতাদের কি ওরকম মানুষের মতো ভাবলে চলে? ধম্মে সইবে এসব কথা? তাহলে প্রশ্ন আসবে–দেবতাদের শরীর আছে কি না, অথবা তাদের আকৃতি-প্রকৃতিও বা মানুষের সঙ্গে মেলে কি না? যদি শরীর থাকে, আর মানুষের আচার-ব্যবহারের সঙ্গেও তাদের মিল থাকে, তবে তাদেরও জন্ম-মরণ থাকবে তাতে আশ্চর্য কী?
দেবতাদের শরীর আছে কি না-এ তর্ক আজ থেকে নয়, এ তর্ক বেদের আমল, মানে ধরুন অন্তত তিন-সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে এই তর্ক চলছে। কথাটা আমাদের ধরতে হবে যাস্ক মুনির অভিধান নিরুক্ত থাকে। যাস্কই বোধ হয় প্রথম লোক যিনি চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অর্থাৎ পাণিনিরও আগে শব্দের নিরুক্তি বিচার করে একটা অভিধান লিখেছিলেন। এই অভিধানের মধ্যে বৈদিক দেবতাদের নিয়ে একটা বড় সড় বিচার আছে। দেবতাদের শরীরের কথাটা আমাদের এখান থেকেই শুরু করতে হবে।
