আসলে ইন্দ্র তার স্বর্গের সিংহাসন লাভ করার পরেও বলির প্রভাব ব্যাপ্ত দেখেছেন সর্বত্র। ব্রহ্মাকে তিনি বলেছেন যে মনে হচ্ছে, বলিই যেন বায়ু হয়ে চারদিকে বইছেন, বলিই যেন বরুশ হয়ে জলে আছেন, সূর্য-চন্দ্রের প্রখর-মৃদুল কিরণমালায় তারই জ্যোতি যেন ফুটে বেরচ্ছে–স বায়ুৰ্বরুশশ্চৈব স রবিঃ স চ চন্দ্রমা। এই যে অগ্নি, বায়ু, সূর্য-চন্দ্রের মধ্যে ইন্দ্র বলিকে দেখতে পেলেন এটাই দৈত্যরাজ বলির প্রভাব এবং ব্যাপ্তি। এই প্রভাব বলির সিংহাসনচ্যুতির পরেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে–অধিকারী শাসক হিসেবে তিনি এতটাই বড়। ইন্দ্র তাই ব্রহ্মার কাছে ছুটে এসেছেন–বলির ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে দিন তো, পিতামহ। তিনি এখন কোথায় কীভাবে রয়েছেন?
ব্ৰহ্ম বুঝতে পারলেন-বলির অবিচ্ছিন্ন প্রভাব-প্রতিপত্তির ব্যাপারে দেবরাজ ইন্দ্রের রীতিমতো ঈর্ষা আছে। উত্তর দেওয়ার সময় ইন্দ্রকে সে কথাটা না বুঝতে দিলেও ব্রহ্মা একটু কড়া করেই বলেন, কাজটা তুমি ভাল করলে না, দেবরাজ! বলি কোথায় কীভাবে রয়েছেন সেটা জিজ্ঞাসা করে তুমি ভাল কাজ করলে না–নৈতত্তে সাধু মঘব যদেমনুপৃচ্ছসি। যাই হোক, জিজ্ঞাসা যখন করেছ, তখন মিথ্যা বলব না। একটি শূন্য গৃহ যেখানে কেউ থাকে না, এমন জায়গায় বলি রয়েছেন। কিন্তু তার চেহারাটা আর দৈত্যরাজের মতো নেই। একটি খালি বাড়ির ভিতর তিনি উট, ষাঁড়, ঘোড়া অথবা গাধা-এদের যে কোনও একটির রূপ ধারণ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বলির করুণ অবস্থা শুনে ইন্দ্র বললেন, যদি কোনও রিক্ত-নির্জন বাড়িতে আমার সঙ্গে বলির দেখা হয়ে যায়, তবে আমি কি তাকে মেরে ফেলব পিতামহ? ব্রহ্মা এই আশঙ্কাই করছিলেন। তিনি বললেন, বলির ওপর একেবারেই কোনও হিংসা আচরণ কোরো না দেবরাজ! বলি কিন্তু হত্যার যোগ্য নন মোটেইমাম্ম শত্রু বলিং হিংসীন বলির্বধমতি। বরং যদি পার তো তার কাছে ন্যায়-নীতির উপদেশ শুনতে চেয়ে কিছু।
ইন্দ্র রাজকীয় মর্যাদায় ঐরাবতে চড়ে বলিকে খুঁজতে চললেন পৃথিবীতে। এক জায়গায় তার দেখাও মিলল, লোকপরিত্যক্ত এক শূন্য গৃহে বলি একটি গাধার রূপ ধারণ করে বাস করছেন। আমার মতে–এই গাধার ছদ্মবেশ কিছুই নয়। দৈত্যরাজ বলি স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। অতএব দেবতাদের ফাঁকি দেবার জন্য অত্যন্ত দীন-হীন বেশে মূর্খের ভাব-বিকার দেখিয়ে একটি লোক পরিত্যক্ত গৃহে বাস করছিলেন বলি। ইন্দ্রের সঙ্গে তার দেখা হল একান্ত অনাড়ম্বর পরিবেশে।
ইন্দ্র খোটা দিলেন প্রথমেই। বললেন, দানবরাজ! আপনি যে পুরো গাধা হয়ে রয়েছেন, আর গাধারা যেমন তুষ খায়, আপনিও তো তেমন তুষই খাচ্ছেন। সত্যি করে বলুন তো, আপনার খারাপ লাগে না? কষ্ট হয় না–ইয়ং তে যোনিরধমা শোস্যথ ন শোচসি? আর এ কী জঘন্য অবস্থা হয়েছে আপনার? কী দূরদৃষ্ট? শত্রুরা এখন আপনার মাথার ওপর। রাজলক্ষ্মী অন্যের কণ্ঠলগ্ন। বন্ধু-বান্ধব সহায় কেউ নেই। আপনার পরাক্রম এবং উৎসাহও কিছু দেখছি না।
ব্রহ্মা ইন্দ্রকে বলেছিলেন-বলিকে হিংসা কোরো না। তার কাছ থেকে বরং নীতিশাস্ত্রের উপদেশ শুনো। কিন্তু চিরকালের শত্রু যখন বিপদে পড়ে, তখন কি তাকে একটু কথা না শুনিয়ে পারা যায়, নাকি নিজের হর্ষোক্কাসই বা চেপে রাখা যায়। ইন্দ্রও তাই কথা শোনাচ্ছেন বলিকে। ইন্দ্র বললেন, এককালে আপনার আত্মীয়-স্বজনেরা হাতি-ঘোড়ায় চড়ত আর সব সময়েই আপনাকে ঘিরে রাখত। আপনি নিজের প্রতাপে সমস্ত লোককে অভিভূত করে রাখতেন, আর আমাদের তো গণনার মধ্যে আনতেন না-লোকান্ প্রতাপয় সর্বান্ যাস্যম্মা অবিতর্কয়। এসব কি আপনার মনে পড়ে? দৈত্য-দানবরা এক সময়–আপনি কখন কী আজ্ঞা করেন, তা পালন করার জন্য মুখিয়ে থাকত। আপনার রাজ্য পালন করার মর্যাদাও তো কিছু কম ছিল না। এমনই আপনার মহিমা যে, হাল চাষ না করলেও জমিতে শস্য ফলত আপনার প্রভাবে। সে সব এখন কোথায়? এখন এই সমুদ্রের পূর্বতীরে পরিত্যক্ত শূন্যগৃহে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনি তুষ খেয়ে যাচ্ছেন। আপনার কষ্ট হয় না বলিরাজ-শোচসি আহো ন শোচসি?
ইন্দ্র এবার দেবরাজ ইন্দ্রের প্রতি তুলনায় বলির মনে আঘাত দিয়ে বললেন, কী দিন ছিল আপনার। আপনি যখন আত্মীয়-স্বজনদের ধন দান করতেন, তারা যখন আপনাকে ধন্যধ্বনি দিত, তখন কেমন লাগত আপনার–তদাসীত্তে মনঃ কথম্? কেমন লাগত–যখন দারুণ সেজেগুজে স্বর্গের বিলাস-ভবনে গিয়ে বসতেন, আর শত শত স্বর্গসুন্দরীরা, সালংকারা দেবরমণীরা আপনার সামনে ঝুমুর নাচত– ননৃতু দেবযোষিতঃ–তখন কেমন লাগত আপনার? আচ্ছা, আপনার সেই সোনার ছাতাটাই বা কোথায় গেল, হিরা-পান্না খচিত সেই সোনার ছাতাটা, যেটা আপনার মাথার ওপর ধরা থাকত সব সময়? সেই সোনার পানপাত্র? ভৃঙ্গার-ভরা সুবাসিত বারি? সেই চামর দুটি? স্বয়ং ব্রহ্মার দেওয়া সেই মালাটা? কিছুই তো দেখছি না, বলিরাজ-ব্রহ্মদত্তাঞ্চ তে মালাং ন পশ্যামসুরাধিপ।
দানবরাজ বলি অনেকক্ষণ ধরে ইন্দ্রের পিত্তি-জ্বলানো কথাগুলি শুনলেন। সাময়িকভাবে একটু রাগও হল তার। একটু রাগের নিঃশ্বাসও পড়ল। কিন্তু বলি ধৈর্য হারালেন না। বরং একটু মজা করেই বললেন, আমার পানপাত্র, সোনার ছাতা, চামর-দুটি, এমনকি সেই ব্ৰহ্মদত্ত মালাটাও তুমি এখন দেখতে পাবে না, দেবরাজ। সব গোপন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি। সময় যখন আসবে, তখন টুক-টু করে সব বার করব, তখন দেখবে–যদা মে ভবিতা কালস্তদা ত্বং তানি দ্রক্ষ্যাসি। এখন আমার সৌভাগ্য-সমৃদ্ধি সব গেছে, আর আপনার হয়েছে বাড়-বাড়ন্ত, কিন্তু তাই বলে আপনি যেমন হামবড়াই করছেন–এটা আপনার বংশ এবং যশ-কোনওটার সঙ্গেই খাপ খাচ্ছে না।
