জেনোফেনিস্ হোমার-হেসিয়ডকে নিতান্ত মূর্থের পর্যায়ে নামিয়ে দিয়ে নাম না করে মন্তব্য করেছেন–সাধারণ লোকেরা ভাবে–দেবতাদের বুঝি জন্ম হয়, তারা বুঝি মানুষের মতোই জামা-কাপড় পরেন, অথবা দেবতার আকৃতি বা মুখের ভাব বুঝি মানুষের মতোই হবে। মানুষেরা কেন নিজেদের মতো করে দেব-কল্পনা করে তার একটা যুতসই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। জেনোফেনি। তিনি বলেছেন–এই যে ইথিওপিয়ানরা বলে–তাদের দেবতারা নাকি নাক-খাদা আর তাদের চেহারা নাকি কালো-কোলো, তার কারণ ওরা নিজেরাই নাক খাদা আর। কালো। আবার অন্যদিকে ব্রেসিয়ানরা যে বলে–তাদের দেবতাদের চক্ষু দুটি নাকি হালকা নীল আর চুলগুলি নাকি লাল–তার কারণ, ওদের নিজেদের চোখই নীল আর চুলগুলি লাল।
দুটি উদাহরণ দেওয়ার পর জেনোফেনি ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেছেন–তা ইথিওপিয়ান, আর ব্রেসিয়ানদের দোষ কী দেব? গোরুরা যদি আর্টিস্ট হত, আর মানুষ যা করে তা যদি গোরুরাও করতে পারত, তাহলে গোররা দেবতার ছবি আঁকত গোরর আদলেই। আর যদি ঘোড়া বা সিংহের মনুষ্যোচিত ক্ষমতা থাকত তাহলে ঘোড়ারা দেবতার ছবি আঁকত ঘোড়ার আদলে, আর সিংহেরা সিংহের আদলে—But if cattle and horses or lions had hands, or were able to draw with their hands and do the works that men can do, horses would draw the forms of the Gods like horses and cattle like cattle, and they would make their bodies such as they each had themselves.
আর বাকি কী রাখলেন জেনোফেনিস্? হোমার-হেসিয়ডকেও তিনি নিশ্চয় ওই গোরু-ঘোড়ার পর্যায়েই ফেলে দিয়েছেন। আমার ভয়–আমাদের ব্যাস-বাল্মীকি যদি এই গ্রিক-দেশীয় কঠিন মানুষটির হাতে পড়তেন, তা হলে তাদের কী বেগতিকই না হত! সে যাই হোক, জেনোফেনিস যত কড়া মন্তব্যই করুন, অন্তত দার্শনিক সূক্ষ্মতার ক্ষেত্রে আমাদের। সাংখ্য-বেদান্ত বৌদ্ধদের ধারেকাছে যে তিনি যেতে পারবেন না, সে কথা আমি হলফ করে বলতে পারি। এই হলফ-নামা করার পর আমার দায়িত্ব আছে যৎসামান্য। আমি ব্ৰহ্মা-পরমাত্মা-ভগবানের কঠিন তত্ত্বের মধ্যে আর একটুও যাব না এবং এই তত্ত্বকে কী চোখে আমরা দেখি তা আগেই সামান্য বলেছি। আমরা এখন শুধু ইন্দ্র-বায়ু ইত্যাদি দেবতা এবং অসুর-রাক্ষসদের সামাজিক স্থিতিটা সংক্ষেপে বলে দিয়েই জনমেজয়ের সভায় বসে মহাভারতের কথা শুনব। এ কথা আগেই বলব, কারণ পরবর্তী সময়ে সূর্য, ইন্দ্র, বায়ুর মতো। দেবতার ঔরস থেকেই আমরা পাণ্ডব-ধুরন্ধরদের জন্মলাভ করতে দেখব। আবার অসুর-রাক্ষসদের বিচারও একটু করব, কারণ আর্য-শক্তির গৌরবে ভীম-পুত্ৰ ঘটোৎকচের জম্মটাও আমাদের লক্ষ্য করতে হবে। অতএব আর সামান্যতম ধৈর্য ধরলেই–উপাখ্যান আর ইতিহাসে ডুবে যাব আমরা।
.
১৪.
মহাভারতের শান্তিপর্বে দেখা যাবে–দৈত্যরাজ বলির সঙ্গে ইন্দ্রের দেখা হয়েছে। অবশ্য দেখাটা খুব সহজে হয়নি, অনেক কাঠ-খড় পোড়ানোর পরেই দেবতাদের রাজার সঙ্গে দৈত্যদের রাজার এই একান্ত শান্ত সাক্ষাৎকার ঘটেছে। দেবাসুরের যুদ্ধ নেই, অশান্তি নেই, পরস্পর ধেয়ে যাওয়া নেই, একেবারে শান্ত সাক্ষাৎকার। তবে এই কথার আগে দুটো কথা আছে। প্রথমেই জানাই, আবারও মনে রাখবেন–ইন্দ্র’ নামের মধ্যে যতখানি দেবত্ব আছে, তার থেকে বেশি আছে ‘রাজত্ব। অর্থাৎ ইন্দ্র একটা উপাধি মাত্র। ইহলৌকিক এবং প্রাক্তন পুণ্যবলেই ইন্দ্র’ হওয়া যায়। অসুর-রাক্ষসও এই ইন্দ্র হতে পারেন, মানুষও হতে পারেন ইন্দ্র। তবে কিনা একবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলে তার যেমন আর নাম থাকে না, শুধু পি এম’ আসছেন, পি এম’ বলছেন–এই রকম একটা ব্যাপার ঘটে যায়, অপিচ প্রধানমন্ত্রিত্ব চলে গেলেও যেমন তার পুরনো তকমাটা যায় না, ইন্দ্রের ব্যাপারও খানিকটা সেইরকম। এই মুহূর্তে যে দৈত্যকুলতিলক বলি-রাজার সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্রের দেখা হবে, সেই বলি-রাজার বংশে অন্তত তিনজন ইন্দ্র আছে। পৌরাণিকেরা জানিয়েছেন-দৈত্য-কুলে পরপর তিন পুরুষ ধরে যাঁদের ইন্দ্রত্ব লাভ করার ইতিহাস আছে, সেই বংশে এই বলি-রাজার জন্ম।
সেই দৈত্যরাজ বলির সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্রের সাক্ষাৎকারের পটভূমিকা এইরকম। দেবরাজ ইন্দ্র শক্তি লাভ করে তখন সমস্ত দৈত্যকে স্বর্গ থেকে হটিয়ে দিয়েছেন। স্বয়ং দৈত্যরাজ বলি স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। সিংহাসনে আসীন অবস্থায় বলির সঙ্গে দেবরাজের দু-একবার যে সাক্ষাৎ হয়নি, তা মোটেই নয়। কিন্তু দৈত্যরাজের ক্রিয়া-কর্ম, বৃত্তি তথা লোক-ব্যবহার সম্বন্ধে ইন্দ্রের যতটুকু বোঝা আছে, তার থেকে না-বোঝার অংশ বেশি এবং সেই কারণে বলির সম্বন্ধে কৌতূহলও তার কম নয়। তা ইন্দ্রের এখন সুখের সময়, তিনি প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে পৌঁছলেন, মনে ইচ্ছা–দুদণ্ড গল্পও করবেন, স্বর্গজয়ের সুখ-সংবাদও দেবেন, আর দৈত্যরাজ বলির সম্বন্ধে দুটো প্রশ্নও করবেন, কারণ, বলির সঙ্গে ব্রহ্মার যোগাযোগও কিছু কম ছিল না।
ইন্দ্র ব্রহ্মাকে বললেন, পিতামহ। এই দৈত্যরাজ বলিকে আমি ঠিক চিনতেও পারছি না, বুঝতেও পারছি না। ব্যাপারটা কী, একটু বুঝিয়ে বলুন তো-তং বলিং নাধিগচ্ছামি ব্ৰহ্মম্নাচক্ষব মে বলি। বলি এত দান-ধ্যান করত, এত তার সহায়-সম্পদ, অথচ এখন তার কী অবস্থা, তা কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন।
