বৈষ্ণবদের কথা স্বল্পমাত্র বলেই আমি শেষ করছি, বস্তুত রসিক শেখর কৃষ্ণের নিত্যসেবার। সুখ আর লীলা-মাধুর্য আস্বাদন করার জন্য বৈষ্ণবদের যে আকুতি আছে, তার বিবরণ দিতে গেলে মহাভারত-কথার অর্ধেকই তাতে চলে যাবে। বরং শাক্ত-শৈব-বৈষ্ণবের উদাহরণ দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইলাম, সেটা হল–সাধারণ দেবতার কথা ছেড়েই দিলাম, সাক্ষাৎ পরমেশ্বরের ক্ষেত্রেও মনুষ্যোচিত হাব-ভাব, রসবত্তা আমাদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। আমাদের দেশে সর্বশক্তিমান দেবতাপুরুষেরও জন্ম আছে, শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য এমন কি মৃত্যুও আছে এবং এই মনুষ্যোচিত রূপকার কিন্তু ব্যাস-বাল্মীকি এবং পৌরাণিকেরাই।
উপনিষদের মধ্যে যে অনাদি অনন্ত পরব্রহ্মের স্বরূপ আমরা জেনেছি, তাঁকে স্বরূপত সেই রকম জেনেও যে কোনও মুহূর্তে তাকে আমার রামচন্দ্র, কৃষ্ণ, শিব কিংবা উমা হৈমবতীর সাকার রূপ দিতে আমাদের অসুবিধে হয়নি এবং তাদের জন্ম-মরণের কল্পনা করতেও আমাদের হৃদয় কম্পিত হয়নি। তার কারণ, আমরা যতখানি দার্শনিক, তার চেয়েও বেশি ভাবুক-রসিক। রসবত্তা আর দার্শনিকতা একই হৃদয়ে থাকার ফলেই বেদব্যাস কিংবা বামীকিকে আমাদের অতি সূক্ষ্মদশী দার্শনিকেরাও কেউ চাবুক মারার সাহস দেখাননি। আবার অন্যদিকে মহাকাব্যের কবিকেও দার্শনিকদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলতে হয়নি-বাপু হে! তোমরা যা করছ, এ শুধুই তর্ক, শুধুই যুক্তি, হৃদয়ের কাছে এর কোনও আবেদন নেই। বলতে হয়নি এসব কথা। আর বলতে হবেই বা কেন? আমাদের কবিরা মূলত দার্শনিক, আবার দার্শনিকেরাও মূলত কবি। এই পারস্পরিক পরিপূরণ এমনি-এমনিই তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এবং তার কারণ, আমাদের চরম সূক্ষ্ম যে ব্রহ্মতত্ত্ব–তিনি একদিকে অদ্বৈত এবং বিজ্ঞানস্বরূপ অন্যদিকে তিনি রসস্বরূপ এবং আনন্দস্বরূপ। একদিকে তাকে বলতে হয়-অশব্দম্ অস্পর্শ অরূপ অব্যয়’অন্যদিকে তাকে বলতে হয়-”এষ আত্মা সর্বগন্ধঃ সৰ্বরসঃ’ ইত্যাদি। এ দেশে একদিকে আপনারা যেমন শঙ্করের মতো সূক্ষ্মদর্শী দার্শনিকের মুখে হরিহর-ভবানীর স্তোত্র শুনবেন, অন্যদিকে দেবতার গল্প-বলা বেদব্যাসের মুখে অদ্ভুত এক কবিতা শুনবেন।
কবিতাটা মহাভারতে নেই, তবে বেদব্যাসের নামেই এ কবিতা চলে, যেমন চলে শঙ্করাচার্যের মুখে হরিহর-ভবানীর স্তোত্র। ব্যাস বলছেন, ক্ষমা কোরো প্রভু! ক্ষমা কোরো আমাকে। আমি তিনটে বড় দোষের কাজ করে ফেলেছি, প্রভু! তুমি আমায় ক্ষমা করে দিয়ে–ক্ষন্তব্যং জগদীশ ত-বিকলতা-দোষত্ৰয়ং মক্তৃতম্। মুনি-কুলের তিলক বেদব্যাস, তিনি কী দোষ করেছেন এমন, যার জন্য শেষ জীবনে এসে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে তাকে? ব্যাস বলছেন, দোষ করেছি তিনটে। প্রথম দোষ-তুমি নীরূপ, নিরাকার। মানুষের আপন সৃষ্ট কোনও রূপের মধ্যে তোমাকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কিন্তু তবু আমি ধ্যানযোগে সেই অনন্ত-রূপ-নীরূপ ঈশ্বরের রূপ-কল্পনা করেছি–রূপং রূপবিবর্জিতস্য ভবতঃ ধ্যানেন যৎ কল্পিত। আমার দ্বিতীয় দোষ-তুমি সর্বব্যাপী, বিভূ। কিন্তু নানা তীর্থস্থানের মধ্যে তুমি জাগ্রত আছ–এই রকম তীর্থ-মাহাত্ম্য কল্পনা করে আমি তোমার সেই বিভূত্ব, ব্যাপি নষ্ট করে দিয়েছি। যিনি অগ্নিতে যিনি জলেতে যিনি তৃণ-তরুময় স্থলেতে, সেই বিশাল-ব্যাপ্ত সত্তাকে আমি সীমিত করে ফেলেছি কতগুলি তীর্থ স্থানের চতুঃসীমার মধ্যে। আর আমার শেষ এবং তৃতীয় দোষ-তুমি অনির্বচনীয়, অনির্দেশ্য-স্বরূপ। শব্দ-অর্থ-অলংকার, আর ভাষা ছন্দে তোমাকে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু পরম ঈশ্বরের স্তব-স্তুতি রচনা করে শব্দের গৌরব-সীমায় তোমাকে যে আমি বেঁধে ফেলেছি, এতে তোমার অনির্বচনীয়তা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আমার এই তিনটে দোষ তুমি ক্ষমা করে দিও, প্রভু।
দেখুন, অরূপ, অব্যয়, অসীম, অনির্দেশ্য ব্রহ্ম-স্বরূপকে কৃষ্ণের রূপে, শিবের রূপে, দুর্গার রূপে বেঁধে ফেলার জন্য পৌরাণিক ব্যাসকে যেমন ক্ষমা চাইতে হচ্ছে, তেমনই শঙ্করাচার্যেরও এমনই ক্ষমা চাওয়ার কথা–তিনি ওই একই কাজ জেনেশুনে করেছেন বলে। অথচ কার্যক্ষেত্রে ব্যাস এবং শঙ্কর পরস্পরের প্রতিপূরক। কারও সঙ্গে কোনও বিরোধই নেই। তবে ব্যাস যা করেছেন, বিভিন্ন পুরাণের মধ্যে কৃষ্ণ, শিব, দুর্গার জন্ম-মরণ পর্যন্ত দেখিয়ে তিনি যা করেছেন, তাতে অন্য কোনও দেশে জন্মালেও তার মহা-বিপদ হত।
প্রাক্-সক্রেটিস যুগের দার্শনিক জেনোফেনিস্ ছিলেন নিজের কালের মহান পণ্ডিত। ভগবানের সম্বন্ধে তার ধারণাটা প্রায় ঔপনিষদিক। ঈশ্বরের সম্বন্ধে তার অতি উচ্চ ধারণা ছিল এবং এই পৃথিবীর নানান সৃষ্টি-বিষয়ে ঈশ্বরের করুণা-স্পর্শ তাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করত। ঈশ্বরের প্রতি তার নির্ভরতা এতটাই যে, তিনি ভাবতেন-ভগবান যদি এই পৃথিবীতে মধু সৃষ্টি না করতেন, তাহলে লোকে ডুমুর গাছ কিংবা বটের ফলকেই অনেক বেশি মিষ্টি বলে ভাবত–If God had not made yellow honey, men would consider figs far sweeter. এ হেন জেনোফেনিস যখন দেখলেন– হোমার-হেসিয়ড অন্তরীক্ষ-লোকের দেবতাদের নানা কুকীর্তি, বঞ্চনা, ছলনার কথা লিখে মহাকাব্য রচনা করেছেন এবং সুধী-জনতা। সে লেখা পড়ে বিমলানন্দ লাভ করছেন, তখন তিনি আর থাকতে পারেননি। রাগে ক্ষোভে তিনি বলে উঠেছেন–এ কী অসভ্যতা? দেবতারা কি সব মানুষ নাকি? দেবতারা কি এতই ক্ষুদ্র-সত্ত্ব যে, মানুষের সমাজে যা লজ্জাকর এবং ঘৃণ্য–সেইসব চুরি-জোচ্চুরি, ধর্ষণ ইত্যাদি জঘন্য সব বৃত্তি দেবতাদের ওপর চাপিয়ে হোমার একটা মহাকাব্য লিখে ফেললেন। আর হেসিয়ড ‘থিওগনি’ লিখে খুব নাম কিনলেন?
