যাক এসব কথা, আমাদের দেশের ঠাকুর-দেবতার হাত-পা না থাকলে চলে না, ভাল করে মিষ্টি করে ডাকলে, তাদের বৈকুণ্ঠ কি স্বর্গ থেকে পড়িমরি করে ছুটে আসতে হয়। আর ভাব-ভালবাসার ক্ষেত্রে তো তাকে আমার যত প্রয়োজন, আমাকেও তার ঠিক ততটাই প্রয়োজন। পঙ্কজ মল্লিকের সানুনাসিক অনবদ্য কণ্ঠ প্রসঙ্গত স্মরণীয়–তাই তো তুমি রাজার রাজা হয়ে, তুমি তাই এসেছ নীচে ইত্যাদি। আমাদের দেশে চরম সাধনা করে কেউ যদি ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিয়ে যাবার বর লাভ করেন, অথবা কেউ যদি ঈশ্বরের সমান আকৃতি লাভ করার বর লাভ করেন, তাহলে সেই বর অনেকে নিতে চান না, তা জানেন? তারা বলেন, ধুচ্ছাই, মুক্তি দিয়ে আমি কী করব, ঠাকুরের সঙ্গে মিশে গিয়ে কী আনন্দটা হবে আমার?
মা গো! নির্বাণে কি আছে ফল,
জলেতে মিশায়ে জল,
চিনি হওয়া ভাল নয় মন,
তিনি খেতে ভালবাসি।
আমাদের ঠাকুর-দেবতা হলেন চিনি। স্পষ্ট গোটা গোটা পরিষ্কার চেহারা, রূপ আছে, রঙ আছে, স্বাদ আছে। হাত-পা-ওয়ালা রূপী, গুণী, রসিক ঠাকুর চাই আমাদের। ঘরের মধ্যে যোগে বসে জ্যোতিঃস্বরূপকে জেনে যাঁরা মুক্তি লাভ করছেন, করুন,-কিন্তু সে মুক্তি রামপ্রসাদ চান না–দেখলেনই তো। আবার বৈষ্ণবদের কথা বলুন, তারা আরও কড়া। চৈতন্যপীরা হেসে বলেন, আমাদের ঠাকুর আমাদের যদি সেধেও মুক্তির বর-দান করেন, তবে আমরা নিই না, আমরা ওই ধরনের বর সাধারণত প্রত্যাখ্যান করে থাকি। স্বয়ং ভগবানও এটা জানেন, তাই তিনি নাকি নিজেই ভাগবত পুরাণে কবুল করেছেন যে–ওদের মুক্তি দিতে চাইলেও ওরা নেবে না, কী সাংঘাতিক! ওরা খালি আমাকে চায়। আমাকে দেখতে চায়, আমাকে কাছে পেতে চায়, আর কাজ-কর্ম করে দিতে চায়–দীয়মানং ন গৃহৃত্তি বিনা মৎসেবনং জনাঃ।
শাক্ত গেল, বৈষ্ণব গেল, এবার শৈবের কথা শুনবেন? তাহলে একটা শ্লোক বলতে গিয়ে আমাকে রীতিমতো একটা ছোট্ট গল্প বলতে হবে–শ্লোকের গল্প। এই শ্লোকটি আছে মোটামুটি কঠিন একটি সংস্কৃত অলংকার গ্রন্থে। কাশ্মীরের প্রসিদ্ধ আলংকারিক মম্মটাচার্য তার কাব্যপ্রকাশের মধ্যে একটি অলংকারের উদাহরণ দিতে গিয়ে এক শৈব-ভক্তের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। শ্লোকটি বলার আগে জানাই–এই শিব-ভক্ত সাধুটি স্বাভাবিক কারণেই রুদ্রাক্ষমালা পরেন গলায়। গায়ে ভস্ম মাখেন, আর তার আরাধ্য দেবতা শিব যে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত, সেই শিব-মন্দিরের সিঁড়িগুলি তিনি সযত্নে মুছে দেন প্রতিদিন।
কিন্তু একদিন সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। আশুতোষ শিব তার ভক্তের সেবা-পরিচর্যায় তুষ্ট হয়ে তাকে মুক্তির-বর দান করে বসলেন। শিব সোজা-সরল ভোলেভালা মানুষ, তিনি জানেন-মোকের জন্যই লোকে এত সাধ্যি-সাধনা, উপাসনা করে। অতএব ভক্তটিকে তিনি কোনও প্রশ্ন-ট্রশ্ন না করে লোক-দুর্লভ মুক্তির বর দিয়ে পূর্বাহ্নেই আপ্লুত করে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু এ ভক্তটি সে-রকম নয়। মোক্ষ-লাভ করে সে পরমানন্দে ‘শিবোহং শিবো’হং’ করে মোটেই জলদ-গম্ভীর স্বরে কথা কয়ে উঠল না। উলটে সে একটু রেগেই গেল। যদিও পরমারাধ্য দেবতা তাকে বর দিয়েছেন এবং বরও লৌকিক দৃষ্টিতে বড় সুলভ নয়, অতএব ঠার ক্রোধ এবং ক্ষোভ অভিমানে পরিণত হল।
দেখা গেল–এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার পূর্ব-পরিচিত উপাসনার সাধনগুলির সঙ্গে সে সাভিমানে কথা বলতে আরম্ভ করেছে। গলার রুদ্রাক্ষ মালাটি–যা তাকে এতকাল শিব-সাধনার প্রেরণা জাগিয়েছে, সেই মালাটি সে খুলে ফেলেছে গলা থেকে। গায়ের যে ভস্মরাগ, সর্বাঙ্গে যে বিভূতি তাকে এতকাল বৈরাগ্যের অনুভূতি দিয়েছে, সেই অতি-পরিচিত অচেতন পদার্থটিকে সে বিদায় জানিয়ে বলে–ছাইভস্ম আমার! এতকাল কত ভক্তিতে প্রতিদিন তোমাকে গায়ে মেখেছি বৈরাগ্যের সাধন হিসেবে। কাল থেকে আর তোমার প্রয়োজন থাকবে না, বিদায় তোমাকে, চিরবিদায়। তোমার ভাল হোক। ভাই রুদ্রাক্ষ-মালা! এতকাল শিব-মন্ত্র জপ করার সময় কত শক্তি জুগিয়েছ তুমি, রুদ্রাক্ষ-মালা ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেন শিবের উদ্ভাস জেগে উঠত মনে–বিদায় ভাই, আর তোমার কোনও প্রয়োজন নেই আমার কাছে। তোমার মঙ্গল হোক। আমি মোক্ষলাভ করেছি–ভস্ম, মালা–এসব এখন মূল্যহীন, বৃথা। ভম্মোচূলন ভদ্রমস্তু ভবতে রুদ্রাক্ষমালে শুভ।
সবার শেষে শিবমন্দিরের শুভ্র-শীতল সোপানগুলি দেখে এই ভক্তের প্রাণ একেবারে কেঁদে উঠল। মনের গভীর থেকে তার আর্তি বেরিয়ে এল–হা সোপান-পরম্পরাং গিরি কান্তালয়ালংকৃতি। কী রকম সে সোপান–যা নাকি হিমালয়-দুহিতা পার্বতীর ভালবাসার ধন যে শিব, তার বাস-গৃহের অলংকারের মতো। হায় সেই সোপানাবলি! বিদায়, আর সেই শিব-মন্দিরের সোপানগুলিকে পরিমার্জনা করার কোনও দায়ই রইল না আমার।
যদি সেই ভস্ম, সেই সোপান-পংক্তি আর রুদ্রাক্ষমালা একযোগে প্রশ্ন করে বলে-কেন বাপু! আজ থেকে তোমার এই নির্বিকার ভাব কেন? শিবভক্ত শৈব তাতে রেগে যায়, ক্ষোভে সে বলে–এই দেখ না। প্রভু কত খুশি হয়েছেন আমার আরাধনায়, উপাসনায়। তিনি বড় সুখী হয়ে আমাকে মোলাভের বর দিয়েছেন। কী রকম সে মোক্ষ? শৈব বলে–অন্যের কাছে তা। যত বড়ই হোক আমার কাছে তা এক মহা অন্ধকারের নামান্তর। আরও এক মহামোহের প্রতিরূপ? আরও এক বিপন্ন বিস্ময়। কেন কেন? এমন বলছ কেন? মোক্ষকে কেউ কী অন্ধকার বলে? শৈব এবার আপন দুঃখের কথাটা বলে–হায়! যে শিবের সেবা করার জন্য আমি গায়ে ভস্ম মাখতাম, রুদ্রাক্ষ-মালা পরতাম, প্রতিদিন সযতনে মুছে দিতাম শ্বেত-শুভ্র মন্দিরের সোপান-পংক্তি, সেই তোমার সেবা করার আনন্দটুকু যে ছিন্নভিন্ন করে দিল এই মোক্ষের অন্ধকার–আমি এমনটি চাইনি। তুষ্ট হয়ে এ তুমি আমায় কী দিলে প্রভু যুৎ-সপৰ্যাসুখাল/লোকচ্ছেদিনি মোক্ষনামণি মহামোহে নিধীয়ামহে। এই শিবভক্তটি কী চায়, তা শুধু একটি পংক্তির ব্যঞ্জনায় এই কবিতার মধ্যে ফুটে উঠেছে। সোপানপংক্তির বর্ণনায় সে বলেছিল—গিরিসুকান্তালয়ালংকৃতিম–শৈলদুহিতা পার্বতীর ভালবাসার ধন যে শিব তার মন্দির সোপান। অর্থাৎ এই শৈব শিব-পার্বতী ভালবাসাটা বোঝে। সে এই ভালবাসা না চাইলেও শিবের ভৃত্য হওয়ার সুখটুকু চায়। মোক্ষ-লাভে সেই শিব-পরিচর্যা-সুখের সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শিবভক্ত এখন ক্ষুব্ধ, বিরক্ত।
