কিন্তু যক্ষনামের মধ্যে–বৃক্ষবাসী, অনিকেতঃ চীরবাসা–এগুলো কি কোনও নাম? নাকি ধনেশ্বর কুবেরের পার্ষদ হয়েও পাহাড়িয়াদের দৈন্যদশা ফুটে উঠেছে এখানে–গাছের কোটরে থাকে, বাড়ি-ঘর ভাল করে বানাতে পারে না এবং গাছের বাকল পরে। পাহাড়ে চলতে হয় বলেই এদের হাত-পা চলে তাড়াতাড়ি, নিরলস-বাতৈরিব মহাজবৈঃ। আবার আবহাওয়ার কারণে শরীর গরম রাখতে হয় বলেই কুবের-পার্ষদের উপাধি জুটেছে–ক্রব্যাদ, পিশাচ, রাক্ষস এবং এরা ভীষণ রকমের মাংসাশী–মেদোমাংসাশনৈরুগ্রৈঃ উগ্ৰধৰা মহাবল। বস্তুত আমি কুবেরের সভাতেও কোনও অলৌকিকতা দেখিনি। তার ওপরে হিমালয়, পারিযাত্র, বিন্ধ্য, মহেন্দ্র আর কৈলাস পর্বত-যেখানে কুবেরের উপাসনা করছে, সেই কুবের-সভা আমার কাছে খুব অপরিচিত নয়, অতিলৌকিক তো নয়ই।
সবার শেষে নারদের মুখে ব্রহ্ম-সভার বর্ণনা। সমস্ত দেবতা, রাক্ষস, গন্ধর্ব, কিন্নর পিতামহ ব্রহ্মার সভায় গতায়াত করছেন–সেটা আমার কাছে বড় কথা নয়। বড় কথা–সেই চেনা-পরিচিত ঋষি মুনি আর নারদের শেষ কথাটি। নারদ যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, তেমন সুন্দরসভা আমি কোথাও দেখিনি। লোক-দুর্লভ সেই সভা। কিন্তু একটাই তার উপমা আছে। এই তোমার সভাটি যেমন, ঠিক তেমনই সেই ব্ৰহ্ম-সভা-সভেয়ং রাজশার্দুল মনুষ্যেষু যথা তব। এই শেষ কথার পর ধরে নিতে পারি ব্রহ্মা, ইন্দ্র, যম, বরুণ–যিনি যত বড় দেবতাই হোন না কেন, তাদের বাড়ি-ঘর রাজসভা সব মানুষের আদলেই তৈরি হয়েছে, কারণ মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সভাটিই একেবারে ব্রহ্মসভার মতো–মনুষ্যেষু যথা তব।
.
১৩.
রাগ করবেন অনেকেই। এমন কি রাগ করার সঙ্গত কারণও আছে। এতদিন বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে রয়েছি-ইন্দ্র, যম, বরুণ, ব্রহ্ম–এত বড় বড় সব দেবতা। আর তাদের বাড়ি-ঘর নাকি সব আমাদের মতো। এসব অলক্ষুণে কথা বললে কার না রাগ হয়? রেগে গিয়ে বলতেই পারেন–এতক্ষণ বাড়িঘর দেখালে, এবার বলবে-দেবতাদের চেহারাও বুঝি বা আমাদের মতোই।
বলব, হয়তো এই কথাই বলব। কিন্তু আপনারা যে সব গ্রন্থ বা সাহিত্যকে শাস্ত্রের মূল্য দিয়ে থাকেন, তার প্রমাণ দিয়েই বলব। তবে কিনা রাগ আপনাদের হতেই পারে। আজকেই তো নয় শুধু, ব্যাস, বাল্মীকি আর যত পৌরাণিকের দল তাদেরও তো দেবতাদের ওপর শ্রদ্ধা-ভক্তি কিছু কম ছিল না, কিন্তু হাজার শ্রদ্ধা নিয়েও তারা দেবতাদের চেহারা, চরিত্র, ছলনা এমন কি চরিত্রহীনতাও যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তা কি কোনওভাবেই মনুষ্য-চরিত্রের বাইরে? আপনারা দেবতাদের করুণায় বিশ্বাস করবেন, তাদের অঘটনঘটনপটীয়সী শক্তিতে বিশ্বাস করবেন, তাদের ভক্তবশ্যতা স্বীকার করবেন–অথচ তাদের মনুষ্যোচিত চেহারা, ভাব-ভঙ্গি অথবা অন্য কোনও রসাবেশ স্বীকার করবেন না–এ কেমন একগুয়ে কথা!
তবে ব্যাস-বাল্মীকির ভাগ্য ভাল, তারা এ দেশে জন্মেছেন। আরও ভাগ্য কেন না, হিন্দুধর্মের মতো এক বিরাট-বিশাল সর্বংসহ ধর্মের তারা প্রাণদাতা। আমাদের দেশে ব্যাস-বাল্মীকির প্রামাণ্য এবং শ্রদ্ধেয়তা এতই বেশি যে, যারা তাদের ধর্ম বা ঈশ্বরানুসন্ধান মানেন না, তারাও কিন্তু এই দুই মহাপুরুষকে সমালোচনার আগে এবং পরে শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারেন না। আমার ধারণা, এই দুই ঋষি যদি পৃথিবীর মধ্য-মরুভূমিতে জন্মাতেন, তবে তারা জীবৎকালেই মহাভারতের আদিপর্ব এবং রামায়ণের বালকাণ্ড লিখেই অকালে যমদণ্ড লাভ করতেন। আর যদি অন্য দুটি প্রাচীন দেশ গ্রিস কিংবা রোমে এঁদের জন্ম হত, তবে একেবারে প্রাণে না মারা পড়লেও এঁদের চড়-চাপাটি খেতে হত নির্ঘাত।
যদি বলেন–কী হলে কী হতে পারত–এসব কথা আমার প্রথমোক্ত দেশ সম্বন্ধে অনালোচ্য, তো ঠিক আছে, সেটা আলোচনার বাইরে থাকাই শ্রেয়। কারণ অনুমানযোগ্য। কিন্তু গ্রিস-দেশীয়দের সম্বন্ধে আমার অনুমান আমি ব্যাখ্যা করতে পারি। এসব কথা আমি অন্যত্র কিছু লিখেছি, কিন্তু পাঠকের একাংশ আমাকে সাভিমানে অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন–কোথায় কী লিখেছেন মশায়! ওসব রেফারেন্স জানতে চাই না, পাঠক হিসেবে আমরা কী এইটুকু একসঙ্গে পেতে পারি না? অতএব আমি নাচার।
তাছাড়া গ্রিস-দেশীয় সেই দার্শনিকের কথা আমায় আরও একবার তুলতেই হত, কারণ তার রাগও ঠিক আপনাদের মতোই। অর্থাৎ আপনাদের রাগ যে কারণে, তারও রাগ সেই কারণেই। পৃথিবীর অনবদ্য আরেক মহাকাব্য ইলিয়াড-ওডিসির নাম আপনাদের জানাই আছে। সেই মহাকাব্যের লেখক হোমার যেহেতু দেবতাদের চেহারা, চরিত্র, চরিত্রহীনতা, মহত্ত্ব, দাক্ষিণ্য এবং করুণা–সবই বর্ণনা করেছেন; অতএব দার্শনিকেরা অনেকেই তার ওপরে ক্ষিপ্ত হয়েছেন। গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন–ওসব বকানি, মকানি তাও কবিত্বের ভাব-মাখা; হোমার যা করেছেন, তার একমাত্র শান্তি তাকে বেতিয়ে সোজা করা। আর শুধু হোমারই নয়, তার ভাব-শিষ্য আর্চিলোকাসকেও ধরে বেত মারা উচিৎ–Homer should be whipped and Archilochus likewise.
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের দেশে যাঁরা পরম উপাস্য তত্ত্বকে কোনও সাকার সবিশেষ বাঁধনে বাঁধতে চান না, তারা পর্যন্ত কেউ ব্যাসদেবকে বেতিয়ে সোজা করার কথা বলেননি। এমন কি দার্শনিক স্থিতিতে যারা নিতান্ত বিরুদ্ধবাদী, তেমন বৌদ্ধ দার্শনিকেরা পর্যন্ত মহাভারতের কবিকে এমন হেনস্থা করেননি। আর যদি শঙ্করাচার্যের মতো অদ্বৈতবাদী। তার্কিক-ধুরন্ধরকে প্রশ্ন করেন, তবে তিনি হয়তো সেই পরম তত্ত্বকে নিরাকার, নির্বিশেষ, নির্গুণ বলে প্রায় বৌদ্ধদের শূন্যের পর্যায়ে ফেলে দেবেন, কিন্তু কদাপি ব্যাস-বাদবায়ণকে পেটানোর প্রস্তাব দেবেন না। নিন্দুকেরা বলে-শঙ্কর নাকি একদিকে ব্রহ্মকে নিরাকার নির্বিশেষ বলেছেন, আর আমজনতার সুখের জন্য ব্রহ্মের রূপ-কল্পনা করে লুকিয়ে লুকিয়ে হরি-হর-ভবানীর অপূর্ব স্তোত্র রচনা করেছেন। অধিকতর পণ্ডিতেরা অবশ্য বলেন–শারীরিক ভাষ্যকার শঙ্কর এক লোক, আর স্তোত্রকার শঙ্কর আরেক লোক। এসব অবশ্য সেই প্রক্ষিপ্তবাদীদের জ্ঞান-প্রপঞ্চ, যাঁদের পড়তে হয়েছে অনেক, কিন্তু বুঝতে হয়েছে কম।
