বুঝেছি, বেশ ঝামেলার কথা বলে ফেলেছি আমি। আসলে ‘দ্বন্দ’ শব্দের দ্বন্দটা ঘুচলেই সব দ্বন্দ্ব মিটে যাবে। এই যে দার্শনিক বললেন–”শীত উষ্ণ এসবের দ্বন্দ্ব’–এই দ্বন্দ্ব মানে জোড়া, আর এই জোড়াটা শুধু শীত-উষ্ণ বা ঠাণ্ডা গরমের নয়, দুঃখ-সুখ, লাভ-অলাভ, জয়-পরাজয়এই সবই দ্বন্দ্ব। ভগবদ্গীতায় দেখবেন–প্রথম দিকেই কৃষ্ণ বলেছেন–বাপু! নিদ্বন্দ্ব হতে হবে, দ্বন্দাতীত হতে হবে—শীতোষ্ণ-সুখদুঃখেষু লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ। মীমাংসক সেই কথাটাই বলেছেন অন্যভাবে, দুঃখ করে–জগতে এমন একটা জায়গা নেই, যেখানে এক মুহূর্তও দ্বন্দহীন নিরবচ্ছিন্ন সুখে কাটবে। অতএব নিরবচ্ছিন্ন সুখের জন্য একটা আলাদা জায়গা থাকবেই, আর সেটাই দেবলোক, মানে স্বর্গ।
মুশকিল হল–যে দার্শনিক-মীমাংসক এই মত ব্যক্ত করেছেন, তিনি এমনই বড় মানুষ যে তাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না মোটেই। আর ঠিক সেই জন্যই আর এক মীমাংসক-ধুরন্ধর দুদিক বাঁচিয়ে বললেন–শ্রুতি-স্মৃতি, ইতিহাস-পুরাণে স্বর্গ শব্দের দ্বারা যে অখণ্ড সুখের কথা বোঝানো হয়, সেই সুখ মর্ত্যলোকে সম্ভব নয়-এমন কথা বলে যদি স্বর্গভূমির মতো সুখের উপযোগী তেমন কোনও বিশেষ স্থান কল্পনাও করে নেওয়া যায়, তবুও কিন্তু এটা অপ্রমাণ হয় না যে–নিরতিশয় সুখই আসলে স্বর্গ। অর্থাৎ মীমাংসক মতে স্বর্গ বলে একটা নির্দিষ্ট সুখ-স্থানের কল্পনা করার প্রয়োজন কিছু নেই, সুখ কিংবা প্রীতিই স্বর্গ বলে মীমাংসকদের সাধারণ সিদ্ধান্ত।
আমরা যে পথে স্বর্গের ঠিকানা দেখাতে চাইছি, তাতে মীমাংসকদের বলা–মনের প্রীতিকর স্থানই স্বর্গ এবং সেটা এই পৃথিবীতেই–অত্রৈব নরক-স্বর্গেী–এই কথাটা আমার কাছে বড়ই জরুরি। তবে এই কল্পনার সুখস্থানের সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট জায়গাও পুরাণ-ইতিহাসের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায় কি না সেটাই এখন দেখবার। পরলোক দেব-দেহ লাভ করে স্বর্গসুখ ভোগ করার কথাটা নাই বা মিলল, কিন্তু হিন্দুস্থান-পাকিস্তানের মতো দেবস্থান বা স্বর্গ বলে এই পৃথিবীতেই কিছু ছিল কি না, সেটা পুরাণকারদের বর্ণনার আনুকুল্য থেকে বোঝাও যেতে পারে হয়তো।
মনে রাখতে হবে-মানুষের যেমন ঘরবাড়ি আছে, দেবতাদেরও তেমনই ঘরবাড়ি আছে। তবে হ্যাঁ, দেবতা বলে কথা, তাদের ঘরবাড়ি কি আর সাধারণ খড়ের চালায় কুঁড়ে-ঘরের মতো হবে? বরং ইন্দ্রাদি দেবতার বাসস্থান প্রাচীন কালের রাজা-মহারাজাদের রাজবাড়ির সঙ্গে খানিকটা তুলনীয় সুতে পারে।
স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র যেখানে থাকেন, সেই সুবিশাল জায়গাটার নাম অমরাবতী-স্বর্গের মধ্যে আরেক স্বর্গ। সেই অমরাবতীর মধ্যে আবার যে প্রাসাদ তার নাম বৈজয়ন্ত প্রাসাদ। তার একপাশে আছে নন্দনকানন, যেখানে পারিজাত ফুলের সমারোহ। সেই প্রাসাদের মধ্যে ইন্দ্র-সভার বর্ণনা খোদ মহাভারতেই পাওয়া যাবে, যদিও সে বর্ণনা কোনও কল্পিত স্বর্গের ছবি নয়, তার মধ্যে বাস্তবতাও আছে যথেষ্ট।
ইন্দ্রসভার স্থপতি স্বয়ং বিশ্বকর্মা। অনেক জায়গা নিয়ে যে এই সভা তৈরি হয়েছে, কিংবা এটির চূড়া যে হবে খুব উঁচু, সেটা খুব বড় কথা নয়। বড় কথা হল–সভার দুপাশে অনেক ঘর এবং সভায় আসন আছে প্রচুর–বেশ্যাসনবতী রম্যা। এই সভার সু-উচ্চ আসনে ইন্দ্রের পাশে যে ইন্দ্রাণী শচী বসে থাকবেন, সেটা কিন্তু বড় কথা নয়। বড় কথা হল–এই সভার সভাসদদের মধ্যে আমরা সেইসব মানুষ, মুনি-ঋষিদের দেখছি, মর্ত্যলোকে যাদের সব সময় দেখি। পরাশর, পর্বত, দুর্বাসা, যাজ্ঞবল্ক্য–এ রকম বিশিষ্ট মুনির নাম দিয়েই মহাভারতের কবি ইন্দ্রসভার অধ্যায় প্রায় শেষ করে দিয়েছেন। মাঝখানে ক্ষণিকের অতিথির মতো কতগুলি অপ্সরা-গন্ধর্ব আর গায়েন কিন্নরদের কথা এসেছে এবং তা এসেছে নিতান্তই গৌণভাবে। মর্ত্য মুনি-ঋষিদের নামগুলি যেখানে সংখ্যায় এবং ভাস্বরতায় এতই বেশি উজ্জ্বল যে মহাভারতের কবির আশয়টা বেশ খায়। বোঝা যায়, তিনি কোনও অতিলৌকিক বর্ণনা করছেন না, ইন্দ্রসভার মাহাত্মে দিব্যভাব থাকতে পারে, কিন্তু মর্ত্যর মানুষের সঙ্গে তার বেশ যোগ আছে।
ইন্দ্রসভার পর মহাভারতে যম-সভ্যর বর্ণনা এবং তার বৈশিষ্ট্য হল প্রখ্যাতকীর্তি মর্তের রাজারা, যারা মৃত্যুর পর যম-সভার সদস্য হয়েছেন। যম যেহেতু মৃত্যুলোকের অধিপতি, অতএব তার রূপ-কল্পনা হয়েছে সেইভাবেই; কিন্তু মনুষ্যলোকের বেশিরভাগ রাজাদেরই সেই সভায় দেখতে পাচ্ছি বলে এটাকেও আমি অতিলোক বলে কিছু ভাবছি না। যম-সভার পরেই বরুণ-সভা এবং সবকিছু ছাপিয়ে এই সভার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে নদী-নামের মধ্যে। সিন্ধু, কাবেরী, গঙ্গা-সরস্বতীই শুধু নয়, ভারতের তাবৎ চেনা নদীগুলিকে যদি বরুণ-সভায় হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন–এমন দেখতে পাই, তবে আমি অন্তত সে সভাকে পৃথিবীর বাইরে কোনও স্থান বলে মানতে রাজি নই।
এরপর আছে কুবের সভা। ধনেশ্বর কুবেরের বাসস্থান কল্পনা করা হয় হিমালয়ে, কৈলাস পর্বতের পাশে। শিব তার সখা। শিবের জটালগ্ন চন্দ্র-শকলের জ্যোৎস্না-ছায়া পড়ে তার গৃহের প্রাঙ্গণে। কুবের-সভার বৈশিষ্ট্য হল সেখানকার লোকগুলি। সমভূমির মানুষের মতো তাদের চেহারা নয়। কবি তাদের যক্ষ বলেছেন, রাক্ষস বলেছেন–বলুন। কিন্তু ওই নামগুলি! হেমনেত্রঃ–যদি বলি কটা চোখ! পিঙ্গলকঃ–যদি বলি হলদেটে লালচে গায়ের রঙ। শোনিতোদঃ প্রবালকঃ-যাঁদের গায়ের রঙ কিছু লালচে। পাহাড়ি এলাকার লোক, অতএব মহাভারতের বর্ণনায়–শকর্ণ-মুখাঃ সর্বে। কান, মুখ সব পেরেকের মতো। উপমাটা পেরেকের চেহারায় নয়; সমভূমির মানুষের মতো নয় বলেই এই উপমা।
